একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খাতা আর রঙিন স্বপ্ন| কিন্তু বাংলাদেশের বহু শিশুর হাতে আজও উঠে আসে ইট, হাতুড়ি, বর্জ্যরে বস্তা কিংবা গৃহস্থালির ভারী কাজ| যে বয়সে তাদের শ্রেণীকক্ষে শেখার কথা, সে বয়সেই তারা জীবিকার কঠিন বাস্তবতায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে| এটি শুধু একটি শিশুর ˆশশব কেড়ে নেয় না; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়|
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু কোনো না কোনো ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত| এর মধ্যে ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শিশুশ্রমে এবং ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত| এসব কাজ তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে|
আরো উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে ইউনিসেফ ও বিবিএস পরিচালিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফলে| সেখানে দেখা যায়, ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার ২০১৯ সালের ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯.২ শতাংশে পৌঁছেছে| অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১২ লাখ নতুন শিশু শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে যুক্ত হয়েছে| এই প্রবণতা আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা|
শিশুশ্রমের পেছনে দারিদ্র্য সবচেয়ে বড় কারণ হলেও এটিই একমাত্র কারণ নয়| বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা, অভিভাবকত্বের দুর্বলতা, মাদকাসক্তি, অসৎসঙ্গ, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বিস্তার, দ্রুত নগরায়ন, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং সীমিত সামাজিক নিরাপত্তা— সব মিলিয়েই সমস্যাটি জটিল হয়েছে| ফলে অনেক পরিবার স্বল্পমেয়াদি আয়ের আশায় সন্তানের শিক্ষা বন্ধ করে কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়| কিন্তু এই সাময়িক আয়ের বিনিময়ে তারা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেই বিসর্জন দেয়|
সরকার শিশুশ্রম নিরসনে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে| বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২ অনুমোদন করেছে| শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে| পাশাপাশি শিক্ষা সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিদ্যালয়ে পুনঃভর্তির উদ্যোগও চলমান| তবে আইন ও প্রকল্পের পাশাপাশি সামাজিক ও ˆনতিক মূল্যবোধকে আরো কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা জরুরি| কারণ শিশুশ্রম কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক সংকটও|
এ ক্ষেত্রে ইউনিসেফ, আইএলও, ওয়ার্ল্ড ভিশন, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও দেশীয় বেসরকারি সংগঠন সরকারের সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে| তারা বিদ্যালয়ে পুনঃভর্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে শিশুদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে কাজ করছে| তবে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে আরো শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন|
শিশুশ্রম নির্মূল করতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সর্বজনীন সামাজিক আন্দোলন| দরিদ্র পরিবারের জন্য শিক্ষা ভাতা, শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়াতে হবে| বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি শিশুকে স্থানীয় পর্যায়ে শনাক্ত করে পুনরায় শিক্ষার আওতায় আনতে হবে| একই সঙ্গে বিদ্যালয়কে হতে হবে আরো আকর্ষণীয়— মানসম্মত শিক্ষা, জীবনদক্ষতা, কারিগরি শিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ পরিবেশ এবং নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমš^য়ে এমন একটি পরিবেশ ˆতরি করতে হবে, যেখানে শিশু ও অভিভাবক উভয়েই বিদ্যালয়কে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখবেন|
এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নাগরিক সংগঠনকে শিশুশ্রমবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে হবে| যে প্রতিষ্ঠান শিশুশ্রম ব্যবহার করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে| একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প আয়মুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি, যাতে তারা সন্তানের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল না থাকে|
২০২৫ সালে প্রকাশিত আইএলও-ইউনিসেফের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে এখনো প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শিশুশ্রমে এবং ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত| অর্থাৎ শিশুশ্রম কেবল বাংলাদেশের নয়; এটি ˆবশ্বিক উন্নয়ন ও মানবাধিকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ| তবে প্রতিটি দেশের মতো বাংলাদেশেরও দায়িত্ব— নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে কার্যকর সমাধান গড়ে তোলা|
প্রতিটি শিশুর অধিকার একটি নিরাপদ ˆশশব, মানসম্মত শিক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ| তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত— ‘শিশুশ্রমমুক্ত এলাকা’ গড়ে তোলা এবং এমন একটি সামাজিক অঙ্গীকার প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে প্রতিটি শিশুর স্থান হবে বিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে নয়| আজ যে শিশুকে আমরা বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে পারব, আগামীকাল সেই শিশুই হবে দক্ষ জনশক্তি, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নির্মাতা| শিশুশ্রম বন্ধ করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার পূর্বশর্ত|
মানুয়েল হাসদা : উন্নয়ন কর্মী