প্রকাশক
কমলকান্তি দাস
জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ
প্রকাশকাল
ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দাম
৩৫০ টাকা
সাংবাদিক ও লেখক সাজিদ তৌহিদের ‘রাজনীতির ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যতের রাজনীতি’ বইটি কেবল একটি সাক্ষাৎকার সংকলন নয়, বরং এটি ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী অর্থাৎ ২০০৯ সালের একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রামাণ্য দলিল| লেখক সেই সময় সাপ্তাহিক ‘এখন’ পত্রিকায় কর্মরত অবস্থায় দেশের ১২ জন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদের যে সাক্ষাৎকারগুলো নিয়েছিলেন, তা আজ ১৬ বছর পর গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের গল্প শোনাচ্ছে| এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের এক ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল বলা যায়|
বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এর প্রতিটি পাতায় পাতায় উঠে এসছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রূপরেখা, যা ২০০৯ সালে অঙ্কিত হলেও আজ পর্যন্ত সমভাবে প্রাসঙ্গিক| জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত এবং মুস্তাফিজ কারিগরের নান্দনিক প্রচ্ছদে সজ্জিত ৩৫০ টাকা মূল্যের এই বইটি প্রডাকশনের দিক থেকে উন্নতমানের|
বইটিতে যাঁদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের কথায় উঠে এসেছে আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা এবং প্রতিটি আলোচনার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় এক সমৃদ্ধ চিন্তার জগৎ|
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বের ওপর সর্বাধিক জোর দিয়েছেন| তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মাইনাস রাজনীতির মাধ্যমে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, বরং সংস্কার বা ‘প্লাস রাজনীতির’ মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে| তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলোকে একে অপরের অস্তিত্ব মেনে নিয়ে গণতন্ত্রের গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে, অন্যথায় ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল মুখবদল হিসেবেই থেকে যাবে|
পরিবেশবিদ ড. একিউএম মাহবুব বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন| তিনি সতর্ক করেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ফোরাম গঠন করতে হবে এবং উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবি আরও জোরালো করতে হবে| একইসাথে তিনি অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক পানি সহযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষির উন্নয়নের এক টেকসই রূপরেখা তুলে ধরেছেন|
কথাসাহিত্যিক শওকত আলী বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন| তিনি মনে করেন, আধুনিকতার নামে আমরা আমাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জীবনমুখী সৃজনশীলতার অভাব প্রকট হচ্ছে| সমাজের শ্রেণিবৈষম্য এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের অভাব কীভাবে আমাদের জাতীয় ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করছে, তাঁর আলোচনায় সেই যন্ত্রণাদায়ক সত্যটিই ফুটে উঠেছে|
কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন তাঁর সাহিত্যে নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার সংগ্রামকে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছেন| তিনি ধর্ম ও জাতীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন এবং নারীর অধিকার রক্ষায় ‘জেন্ডার’ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছেন| তাঁর আলোচনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং উৎসবের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করার এক মানবিক রূপরেখা পাওয়া যায়|
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে কেবল বাজার তদারকি নয়, বরং নিম্নআয়ের মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন| তিনি দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সংগতি রেখে কীভাবে স্থানীয় বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যায়| কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পায়নের টেকসই পরিকল্পনাই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন|
দেশবরেণ্য কবি খন্দকার আশরাফ হোসেন পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের চেয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রাণবন্ত ও ˆবচিত্র্যময় রূপটি নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন| তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশ ও জীবন-সংগ্রাম এদেশের সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে যা সময়ের সাথে সাথে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে| কবি হিসেবে তিনি তরুণদের শিকড় সন্ধানী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং শব্দশৈলীর চেয়ে কবিতার জীবনবোধকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন|
গবেষক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান দারিদ্র্য বিমোচন ও শিক্ষা খাতের মানোন্নয়নে সঠিক তথ্যের অপ্রতুলতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন| তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নে স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছেন| তাঁর মতে, কেবল স্কুল ভর্তির হার বাড়ানোই সাফল্য নয়, বরং গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাই প্রকৃত উন্নয়ন |
সাবেক মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট এবং দেশের রাজনীতিতে অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন| তিনি দেশের মৎস্য ও কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করতে উপকূলীয় অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন| একইসাথে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন |
প্রবীণ নেতা আব্দুল জলিল তাঁর কারাবন্দী জীবনের নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে রাজনীতিতে গোয়েন্দা হস্তক্ষেপের কালো অধ্যায়কে সবার সামনে উন্মোচিত করেছেন| তিনি রাজনীতির গুণগত মানোন্নয়নে দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন| তাঁর আলোচনায় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সঠিক নেতৃত্বের সাহসিকতা এবং গণতন্ত্রের মূল ভাবধারা অনুসরণের ওপর|
পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান আ ন হ আখতার হোসেন দেশের বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণগুলো কারিগরি ও নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন| তিনি দেখিয়েছেন যে, যথাযথ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জ্বালানি ˆবচিত্র্যের অভাব কীভাবে বিদ্যুৎ খাতকে স্থবির করে রেখেছে| ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খাতের নির্ভরতা অর্জনে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই বিনিয়োগের একটি রূপরেখা তিনি পেশ করেছেন|
শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খান শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন| তিনি বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিশ্বের সর্বনিম্ন মজুরি পাওয়ার বিষয়টিকে জাতীয় লজ্জা হিসেবে গণ্য করে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন| তাঁর মতে, শিল্প মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে ˆবষম্য দূর করতে না পারলে টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়|
গবেষক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম বাঙালি সংস্কৃতির বিবর্তন এবং হাজার বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, মৈত্রী ও সহনশীলতাই আমাদের মূল পরিচয়| তিনি পহেলা বৈশাখের মতো অসাম্প্রদায়িক উৎসবগুলোকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আরও ব্যাপকভাবে পালনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন| তাঁর স্বপ্ন হলো, একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ, যেখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মানবাধিকার হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার |
লেখকের মুন্সিয়ানার সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো তাঁর অসাধারণ দূরদর্শিতা ও পেশাদারিত্ব| একজন তরুণ সাংবাদিক হিসেবে তৎকালীন উত্তাল সময়ে তিনি যেভাবে দেশের দিকপাল ব্যক্তিত্বদের মুখোমুখি হয়ে তাঁদের চিন্তার গভীরতম স্তরে প্রবেশ করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর| আব্দুল জলিলের মতো জাঁদরেল নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তাঁর ব্যক্তিগত সংকুচিত হওয়ার কথা স্বীকার করা লেখকের বিনয় ও অকপটতারই বহিঃপ্রকাশ, যা পাঠককে তাঁর লেখনীর প্রতি আরও আস্থাশীল করে তোলে| বইটির নামকরণের সার্থকতা এখানেই যে, লেখক কেবল সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ লিপিবদ্ধ করেননি, বরং এমন ১২ জন মানুষকে নির্বাচন করেছেন যাঁদের দর্শন আগামীর বাংলাদেশের পথনির্দেশক| লেখক সার্থকভাবে প্রমাণ করেছেন যে, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা কীভাবে সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাসের এক অনন্য দলিলে রূপান্তরিত হতে পারে| এই সংকলনটি কেবল পুরনো সাক্ষাৎকারের সংগ্রহ নয়, বরং এটি প্রজ্ঞার এক বিশাল আধার যা সমকালীন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাঠকদের জন্য অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে|
বইটির ত্রুটিও চোখে পড়েছে| তবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি| সেটি হলো, প্রচ্ছদে বইয়ের নামকরণ ‘রাজনীতির ভবিষ্যৎ ভবিষ্যতের রাজনীতি’ থাকলেও ভেতরে ‘রাজনীতির ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যতের রাজনীতি’ আছে| হতে পড়ে এটি হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে|
কেন বইটি পড়বেন?
যদি আপনি বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে চান এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ভাবনাগুলোকে এক মলাটে পেতে চান, তবে এই বইটি আপনার জন্য অপরিহার্য| লেখকের বর্ণনায় পেশাদারিত্বের পাশাপাশি যে একনিষ্ঠতা ফুটে উঠেছে, তা পাঠককে শেষ পর্যন্ত বইটির সঙ্গে যুক্ত রাখবে| এটি কেবল পুরনো সাক্ষাৎকার নয়, বরং আগামী দিনের পথ চলার পাথেয়|
আব্দুল্লাহ& সাহেদ : ব্যাংকার, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক