তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক
প্রতি বছর ৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে| দেশজুড়ে চলে পরিবেশ রক্ষার নানা আয়োজন, সেমিনার আর চারা বিতরণের মহোৎসব| কিন্তু বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত ঘেঁষে থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষের কাছে পরিবেশের অবক্ষয় কোনো তাত্ত্বিক সংকট নয়; এটি তাদের প্রতিদিনের রুটি-রুজি, বেঁচে থাকা এবং অস্তিত্বের লড়াই| একসময়ের প্রমত্তা পদ্মা, মহানন্দা আর পুনর্ভবা নদীবেষ্টিত এই জেলা আজ মরুময়তার এক জ্বলন্ত প্রতীক| জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব এবং আমাদের স্থানীয় পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও তার সংলগ্ন বরেন্দ্র অঞ্চল আজ এক চরম পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি| বিশ্ব পরিবেশ দিবসে দাঁড়িয়ে তাই এই অঞ্চলের মাটি, পানি, নদী আর জীববৈচিত্র্যের বিপন্নতার দিকে নজর দেওয়া আমাদের অস্তিত্বেরই তাগিদ| ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ রূপ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভূপ্রকৃতিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—একদিকে প্লাবন ভূমি, অন্যদিকে উচুঁ-নিচু লাল মাটির কঠোর বরেন্দ্র অঞ্চল (নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাটের অংশবিশেষ)| এই বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির গঠন এমনিতেই পানি ধারণক্ষমতায় দুর্বল| তার ওপর বিগত কয়েক দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলের চিরচেনা ঋতুচক্র সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে গেছে| আগে যেখানে আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টির পানিতে মাঠ-ঘাট ভেসে যেত, এখন সেখানে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী খরা| শীতকালে পড়ছে হাড় কাঁপানো শীত ও ঘন কুয়াশা, আর গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা পার করছেন ৪২ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত| তীব্র দাবদাহ আর অনাবৃষ্টির কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি আজ ফেটে চৌচির, যা মরুময়তার স্পষ্ট পূর্বাভাস|
ভূগর্ভস্থ পানির মহাবিপর্যয়; পাতালে নামছে পানির স্তর
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত বিপর্যয়টি ঘটছে মাটির নিচে, যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী|
১. গভীর নলকূপ ও বোরো চাষের মরণকামড়: একসময় বরেন্দ্র অঞ্চল এক ফসলী ছিল| কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে বিগত কয়েক দশকে এখানে হাজার হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে| ভূগর্ভস্থ পানি তুলে দেদারসে চাষ করা হচ্ছে বোরো ধান| এক কেজি চাল উৎপাদন করতে প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার লিটার পানি লাগে| বরেন্দ্রের যে মাটির নিচে পুনর্ভরণের হার অত্যন্ত কম, সেখান থেকে এভাবে কোটি কোটি গ্যালন পানি তোলার ফলে প্রতি বছর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে|
২. সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার: নাচোল, গোমস্তাপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সাধারণ অগভীর নলকূপে এখন আর পানি উঠছে না| শুষ্ক মৌসুমে গ্রামীণ নারীদের মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে| অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে| পানি সংকটের এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে আগামী এক দশকে এই জেলা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে|
মহানন্দা ও পদ্মার মরণদশা
নদীমাতৃক জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রাণ বলা হতো মহানন্দা নদীকে| আর জেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পরাক্রমশালী পদ্মা| কিন্তু আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত করুণ|
মহানন্দার বুকজুড়ে বালুচর: ভারতের মালদহ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা মহানন্দা নদী আজ পলি জমে নব্যতা হারিয়েছে| শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একটি মরা খালে পরিণত হয়| মাইলের পর মাইল জেগে ওঠে ধু-ধু বালুচর| নদীতে পানি না থাকায় মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে পড়েছেন, বিলুপ্ত হয়েছে বহু দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদ|
পদ্মার ভাঙন ও চরাঞ্চলের সংকট: বর্ষায় পদ্মা নদী চাঁপাইনবাবগঞ্জের রানিহাটি, পাকা বা দুর্লভপুর ইউনিয়নে তীব্র ভাঙন সৃষ্টি করে হাজার হাজার মানুষকে গৃহহীন করে| আবার শুষ্ক মৌসুমে সেই পদ্মার বুকেই মাইলের পর মাইল চর জেগে ওঠে| এই চরাঞ্চলের তীব্র উত্তাপ পুরো জেলার তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে|
রবার ড্যাম ও কৃত্রিমতা: মহানন্দায় পানি ধরে রাখার জন্য 'রবার ড্যাম' নির্মাণ করা হলেও তা নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রের স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না| নদীকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার এই চেষ্টা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের কাছে প্রায়শই পরাস্ত হচ্ছে|
আমের রাজধানী বনাম জলবায়ুর ˆবরিতা
চাঁপাইনবাবগঞ্জকে বলা হয় ‘আমের রাজধানী’| কানসাট আমের বাজার এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি| কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি আঘাত হেনেছে জেলার এই প্রধান অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্তম্ভে|
মুকুল ঝরে পড়া ও অসময়ের আবহাওয়া: গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, আমের মুকুল আসার সময়ে হয় তীব্র কুয়াশা ও শীত থাকছে, না হয় হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক গরম পড়ছে| এর ফলে মুকুল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে|
তীব্র দাবদাহ ও গুটি ঝরা: বৈশাখ- জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন আম বড় হওয়ার কথা, তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে যায় তীব্র 'লু হাওয়া' বা হিটওয়েভ| পানির অভাবে এবং তীব্র গরমে গাছের আম বোঁটা শুকিয়ে মাটিতে ঝরে পড়ে|
কীটনাশকের অতি-ব্যবহার: পরিবর্তিত আবহাওয়ায় আমের রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ ঠেকাতে চাষিরা নির্বিচারে হরমোন ও রাসায়নিক কীটনাশক স্প্রে করছেন| এতে সাময়িক ফলন মিললেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে উপকারী কীটপতঙ্গ (যেমন মৌমাছি), এবং পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে|
অবৈজ্ঞানিক নগরায়ণ ও পাহাড়সম বর্জ্য
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা এবং অন্যান্য উপজেলা সহ সদরের দিকে তাকালে পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার আরেকটি ভয়ঙ্কর রূপ চোখে পড়ে|
জলাশয় ভরাট ও বিলুপ্তি: বিল, পুকুর ও নালাগুলো ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে| সামান্য বৃষ্টিতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের প্রধান সড়কগুলোতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়|
প্লাস্টিক ও বর্জ্য দূষণ: মহানন্দা নদীর তীরে কিংবা শহরের ফাঁকা জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে| পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেনগুলো জ্যাম করে দিচ্ছে এবং বৃষ্টির পানির সাথে মিশে সরাসরি মহানন্দা নদীকে দূষিত করছে|
চাঁপাইনবাবগঞ্জকে বাঁচাতে করণীয়
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে মরুময়তা এবং পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. ফসল বিন্যাসের পরিবর্তন : বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ধানের চাষ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে হবে| এর পরিবর্তে কম পানি লাগে এমন ফসল যেমন—গম, ভুট্টা, ডাল, সরিষা এবং লাভজনক ড্রাগন ফল বা মাল্টা চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে|
২. বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ: বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাস পুকুর ও দিঘিগুলো পুনঃখনন করতে হবে| বৃষ্টির পানিকে মাটির নিচে পাঠানোর জন্য 'আর্টিফিশিয়াল রিচার্জ' পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে স্থিতিশীল রাখবে|
৩. ব্যাপক হারে ফলদ ও বনজ বৃক্ষরোপণ: চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুধু আম গাছ নয়, এর পাশাপাশি নিম, বকুল, অর্জুন, বট এবং তাল গাছের মতো দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে| বিশেষ করে বজ্রপাত রোধে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বরেন্দ্রের উঁচু রাস্তাগুলোর দুই পাশে বিপুল পরিমাণ তালগাছ রোপণ করা জরুরি|
৪. নদী খনন ও সীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা: পদ্মা ও মহানন্দা নদীর নব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং বা খনন কাজ করতে হবে| নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কঠোর হস্তে দমন করতে হবে, কারণ অবৈধ বালু উত্তোলন নদীর পাড় ভাঙন ও নব্যতা হ্রাসের অন্যতম কারণ|
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি ও মানুষ মূলত এক আদিম সহনশীলতার গল্প বলে| বিস্তীর্ণ লাল মাটির বরেন্দ্র অঞ্চল আর পলি-গঠিত প্লাবন ভূমির ˆবপরীত্যের মাঝেই এ অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম গড়ে উঠেছে| শত খরা, অনাবৃষ্টি, তীব্র দাবদাহ আর প্রকৃতির রুক্ষতার বিরুদ্ধে লড়াই করেই এ অঞ্চলের মানুষ যুগ যুগ ধরে টিকে আছে| আজ আমরা তথাকথিত আধুনিকতা আর অপরিকল্পিত উন্নয়নের মোহে অন্ধ হয়ে সেই সীমানা প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করছি| উন্নয়ন আর অগ্রগতির নামে আমরা আমাদের জীবনদায়ী নদীগুলোকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলছি|
একই সাথে আমের ফলন বাড়ানোর অন্ধ প্রতিযোগিতায় নির্বিচারে মাটির বুক থেকে দেশীয় বনজ ও ভেষজ সবুজ ধ্বংস করা হচ্ছে| তালের গাছ, বট, পাকুড় আর নিমের মতো দীর্ঘজীবী গাছ কেটে ফেলার কারণে পুরো জেলার তাপমাত্রা আজ মরু অঞ্চলের মতো চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠছে, বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার| রাসায়নিক কীটনাশকের অতি-ব্যবহার মাটির অণুজীব ও উপকারী কীটপতঙ্গকে চিরতরে বিদায় করে দিচ্ছে| প্রকৃতিকে এভাবে ক্ষতবিক্ষত করার পর তার কাছ থেকে শুভ কিছু আশা করা যায় না; প্রকৃতি যখন প্রতিশোধ নিতে শুরু করবে, তখন মানুষের ˆতরি কোনো প্রযুক্তিই আমাদের রক্ষা করতে পারবে না|
তাই এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আপামর জনসাধারণের কাছে, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে এটাই হোক মূল আহ্বান—আসুন, আমরা আমাদের নদীকে ভালোবাসতে শিখি| নদীকে দখল ও বর্জ্যমুক্ত করে তার ¯^াভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দিই| প্লাস্টিক ও পলিথিনের মতো দীর্ঘস্থায়ী বিষকে বর্জন করি, যা আমাদের মাটির উর্বরতা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংস করছে| ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী হই এবং বোরো চাষের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কম পানি-গ্রাসী ও পরিবেশবান্ধব ফসলের দিকে ঝুঁকি| একই সাথে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রাচীন ও আধুনিক পদ্ধতির সংমিশ্রণ ঘটাই|
আসুন, এই বরেন্দ্র ভূমিকে আবার দেশীয় গাছের ছায়ায়, সবুজে-শ্যামলে ভরিয়ে তুলি| আমাদের মনে রাখতে হবে—চাঁপাইনবাবগঞ্জ যদি বাঁচে, তবেই বাঁচবে আমাদের হাজারো আমবাগান, বাঁচবে আমাদের আঞ্চলিক অর্থনীতি, সচল থাকবে আমাদের জীবন-জীবিকা এবং নিরাপদ থাকবে আমাদের আগামী প্রজন্ম| প্রকৃতি ধ্বংসের এই ধারা অব্যাহত থাকলে একদিন হয়তো বহুতল ভবন থাকবে, কিন্তু তা হবে এক মৃত ও পরিত্যক্ত বদ্বীপে| প্রকৃতিকে জড়িয়ে ধরেই আমাদের টিকে থাকতে হবে|
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আপামর জনসাধারণের কাছে এটাই হোক আহ্বান—আসুন, আমরা আমাদের নদীকে ভালোবাসি, প্লাস্টিক বর্জন করি, পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হই এবং এই বরেন্দ্র ভূমিকে আবার সবুজে শ্যামলে ভরিয়ে তুলি| চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাঁচলে, বাঁচবে আমাদের আমগাছ, আমাদের অর্থনীতি এবং আমাদের আগামী প্রজন্ম|
লেখক: তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক, সম্পাদক, স্বার্ণালী সাহিত্য পরিষদ, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক ও ব্যবসায়ী|