শুক্রবার ২৪ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৯ই শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৮ সফর ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: July 24, 2026
July 24, 2026
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর

ঠিকানার খোঁজে দিশেহারা ৫০ হাজার মানুষ

Published: July 24, 2026 at 02:21 PM
ঠিকানার খোঁজে দিশেহারা ৫০ হাজার মানুষ

“কি আশায় বাঁধি খেলাঘর

বেদনার বালুচরে

নিয়তি আমার ভাগ্য লয়ে যে

নিশি দিন খেলা করে|”


গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথা, শ্যামল মিত্রর সুর এবং কিশোর কুমারের কণ্ঠে নিদারুণ এই গানটি গাওয়া হয়েছিল ১৯৭৪ সালে “অমানুষ” বাংলা সিনেমায়| অর্ধশতাব্দীর পরেও এ গান পদ্মাচরের মানুষের হৃদয়ে গুনগুন করে বেজে ওঠে প্রতিনিয়ত!

জন্মলগ্ন থেকেই পদ্মাচরের মানুষের ভাঙাগড়ার জীবন| পদ্মানদীর গর্ভে বারবার বিলীন হয় বসতভিটে ও আবাদি জমি| প্রকৃতপক্ষে জাতীয় পরিচয় পত্র বা জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী স্থায়ী ঠিকানায় বাস করতে পারেন না তারা| কয়েকবছরের ব্যবধানে ঠিকানার পরিবর্তন হয়ে যায়| তবুও নাড়ীর টানে এখনো মানুষ নিরাশায় বাঁধেন খেলাঘর বেদনার ঐ বালুচরেই| কিন্ত এদের স্থায়ী বাসস্থান ও স্থায়ী ঠিকানার ব্যবস্থা করা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? এদের জীবনমান কি দেশের সার্বিক উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখেনা?

ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশের পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে| এই পদ্মা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে পাঁচ শতাধিক বছর আগে জনবসতি গড়ে ওঠে| নদীর সাথে পাল্লা দিয়ে ভাঙা-গড়ার জীবন চলছে তাদের| কালের আবর্তে বিভিন্ন শাসনামলের আওতায় ছিল এ চরাঞ্চলটি| এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকেই বৃটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলের কথাও বলতে পারেন| সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৫৫ বছর| এখন ডিজিটাল শিল্পায়নের যুগ| আমরা বিশ্বব্যাপী এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেপড়ে লেগেছি| মধ্যম আয়ের সভ্য জাতিতে উন্নীত হওয়ার যুদ্ধ করছি| কিন্তু চরাঞ্চলের ৫০ হাজার মানুষের ভাগ্য নির্ভর করছে প্রকৃতির উপরই| নদী ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হবে হচ্ছে শুনতে শুনতে হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি পদ্মার বুকে হারিয়ে গেছে| প্রতিবছরই এলাকাছাড়া হচ্ছে মানুষ| ফলে চরাঞ্চলের ভৌগোলিক, সামাজিকসহ সার্বিক পরিবেশ তলানিতে নেমে যাচ্ছে!

এ পদ্মানদীর অববাহিকায় ৪টি ইউনিয়নের অবস্থান| সেগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়নপুর, শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর, পাঁকা ও দুর্লভপুর| ইতোমধ্যে উজিরপুর ইউনিয়নের ভূখণ্ড ৭০ শতাংশই পদ্মার গর্ভে বিলীন| ওই ইউনিয়নের মানুষ এখন বিভিন্ন ইউনিয়ন ও উপজেলা সদরে বাস করছেন| শুধু কাগজে কলমে ইউনিয়নে অস্তিত্ব দেখা যায় কিন্তু বাস্তবে তা ধু-ধু বালুচর|

সম্প্রতি জানা গেছে, উজিরপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ আবাদি জমি দীর্ঘদিন বালুচরে পরিণত হয়ে থাকায় কয়েক হাজার বিঘা জমির খাজনা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস| এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে জনমনে| মানববন্ধনও করেছেন তারা| তাতেও কোনো সুরাহা হয়নি|

উজিরপুর ইউনিয়নের সাবেক বাসিন্দা মুসলেমা বেগম (৪৫)| ওই ইউনিয়নের রাধাকান্তপুর এলাকায় বাস করতেন| একই এলাকায় বাবা ও শ্বশুর বাড়ি ছিল| আনুমানিক ২০ বছর আগে পদ্মানদীর গর্ভে এলাকাটি সম্পূর্ণ বিলীন হলে নিরুপায় হয়ে পড়েন দুই পরিবার| ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি তলিয়ে যায় পানির নিচে| নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধ মা, এক শিশু সন্তান ও স্বামীসহ আশ্রয় নেন পাঁকা ইউনিয়নের চরপাঁকা জামাইপাড়া গ্রামে| বাঁশ খড় দিয়ে ঘর বাঁধেন সেখানে|  মুসলেমা বেগমের স্বামী বাবুল আকতার দিনমজুরী করে সামান্য উপার্জন করেন| মুসলেমা বেগম অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ধর্মপ্রাণ নারী| তিনি সেলাইয়ের কাজ করা শুরু করেন ঘরে বসে| অল্প অল্প টাকা জমিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনে উপার্জন বাড়ান| ইতোমধ্যে পরিবারটি পাঁকা ইউনিয়নের ভোটার তালিকাভুক্ত হয়| ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান পরিবারটিকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন| পাঁকার চরাঞ্চলে এসে ২০ বছরের মধ্যে তিনবার বসতভিটা নদীগর্ভে পতিত হয়| সর্বশেষ ২০২৫ সালে ভাঙনের মুখোমুখি হন| বাড়ি করার মত এলাকায় জমি জায়গা ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হন| আবার নিরুপায় হয়ে ওই পরিবারটি পাঁকা ইউনিয়ন ছাড়তে বাধ্য হয়| অবশেষে আশ্রয় নিয়েছে এই জেলার রানীহাটি ইউনিয়নের সরকারি গুচ্ছগ্রাম সংলগ্ন একটি আম বাগানে|

মুসলেমা বেগম জানান, “রাধাকান্তপুরের প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন হারিয়ে পাঁকা ইউনিয়নে আশ্রয় নিয়েছিলাম| দীর্ঘদিন ওই এলাকায় বাস করতে লেগে সবাইকে আপন করে নিয়েছিলাম| কিন্তু নদীর ভাঙনে সে সুখ আর ঠিকলো না| আবার সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে| প্রতিবেশীদের ভালোবাসার কথা ভুলতে পারিনা| তারপরও মনে শান্তনা দিই যে আর বাড়িঘর ভাঙতে হবে না|” এরকমভাবে গত বছর কয়েকশো পরিবার ঠিকানা হারা হয়ে চরাঞ্চল ছেড়ে অন্যাত্র আশ্রয় নিয়েছেন|

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের ৯ ন¤^র ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আব্দুল মালেক বুদ্ধু| সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে এলাকায় তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে| সর্বশেষ বাস করছিলেন পাকাঁ ইউনিয়নের চরাঞ্চলে কদমতলা গ্রামে| গত বছর ব্যপক নদী ভাঙন শুরু হলে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি| বারবার বসত বাড়ি স্থানান্তর করতে করতে এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন| অবশেষে চরাঞ্চলের ঘরবাড়ির ভগ্নাংশ নিয়ে নাচোল উপজেলার পন্ডিতপুরে চলে যান| এলাকা থেকে বিদায় হওয়ার মুহুর্তে প্রতিবেশী ও পরিবারের মানুষ অশ্রুসিক্ত হন আবেগে ও আপনজন ছেড়ে যাওয়ার বেদনায়|

এলাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে আব্দুল খালেক বুদ্ধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অনুভূতি প্রকাশ করেন|

“প্রিয় এলাকাবাসী ও সম্মানিত আত্মীয়স্বজন, আসসালামু আলাইকুম| নদী ভাঙন ও পারিবারিক  কারণে আমি আমার বসতবাড়ি ভেঙে অন্যত্র চলে যাচ্ছি| এই সিদ্ধান্ত আমার জন্য খুবই কষ্টের| ১২নং পাঁকা ইউনিয়নের আপনাদের সবার সাথে কাটানো সময়, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা আমি কখনো ভুলতে পারব না| বিশেষ করে ৯ নং ওয়ার্ডের আপনাদের যে ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছি, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া| একজন সাবেক মে¤^ার হিসেবে সবসময় চেষ্টা করেছি আপনাদের পাশে থাকতে| যদি কোনো সময় কোনো ভুল বা কষ্ট দিয়ে থাকি, দয়া করে ক্ষমা করে দেবেন| আপনাদের সবার জন্য রইলো দোয়া ও ভালোবাসা| আমার জন্যও দোয়া করবেন, যেন নতুন জায়গায় ভালো থাকতে পারি|”

বিদায় মুহুর্তে তার বড় ছেলে শাহালাল জানান, “আজ আমার মনটা যেনো ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলো| সবাই থেকে গেলো আমি যেনো সবার মাঝ থেকে হারিয়ে গেলাম|” ˆপতৃক ভিটা বারবার নদীতে হারিয়ে নাচোল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হাজারেরও অধিক পরিবার বসবাস শুরু করেছেন|

পাঁকা ইউনিয়নের গমের চর গ্রামের কৃষক মো. একরামুল হক (৬৬) বলেন, “আমার মনে পড়তে কমপক্ষে ২০বার ঘরবাড়ি ভেঙেছে পদ্মার ভাঙনে| দুবছর হলো বাড়ি ভেঙেছে| এবার বর্ষার শুরুতেই নদী ভাঙনও শুরু হয়েছে| আবার বাড়িঘর ভাঙতে হলো| এখনো ঘর-দুয়ার ঠিক করতে পারিনি| আমার বড় ছেলে টুটুল নদীভাঙনে অতিষ্ঠ হয়ে উজিরপুর জলবাজার এলাকায় বাড়ি নিয়ে গেছে গত বছর| আমার এক বোন শাহিন বেগম তার পরিবার নিয়ে চলে গেছে তর্তিপুর শেখটোলায়| আমার আরেক ভাগনে পরিবারসহ শেখটোলায় বাড়ি করেছে| এরকম ভাবে যে যেদিকে সুযোগ পাচ্ছে সেদিকেই চলে যাচ্ছে| আবাদের মতো জোত-জমিও আর নাই| ফেরীআলা বা রাজমিস্ত্রীর কাজ করার জন্য মানুষ বেশি চলে যাচ্ছে|”

হলদিবোনা হাটের সুপরিচিত দোকানদার মো. ইব্রাহিম হোসেন সম্প্রতি বাড়িঘর স্থানান্তর করে নাচোল উপজেলার ভোলা মোড়ে নিয়ে গেছেন| তিনি বলেন, “চরে বাড়ি করার মতো আর জায়গা পাইনি| কি করবো, কতোবার বাড়ি ভাঙব? নিরুপায় হয়ে এলাকা ছাড়তে হল|”

স্থানীয় এক ছাত্র কবির হোসেন বলেন, “বিগত পাঁচ বছরে কয়েকবার ভরা বর্ষায় নদীভাঙনের মুহুর্তে অস্থায়ী জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হয়েছে| এতে সরকারের টাকা খরচ হয়েছে কিন্তু এলাকাবাসীর কোনো উপকার হয়নি| আমাদের বহুদিনে প্রত্যাশা নদীভাঙ্গন প্রতিরোধ করা হোক স্থায়ীভাবে|”

জানা গেছে, নারায়নপুর, পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়নের কয়েকশো পরিবার নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আমনুরা এলাকায় ঠাঁই নিয়েছেন| এর ফলে আমনুরা বাইপাস রেল স্টেশনের সামনে গড়ে উঠেছে কয়েকটি গ্রাম| এছাড়া আমনুরা কলেজ মোড়ের আশেপাশেও কিছু পরিবার বাস করছেন| চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জ পৌরসভার অধীনে সহস্রাধিক পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন| যারা মোটামুটি সচ্ছল তারা সাধারণত শহরের বাসিন্দা হয়েছেন| নারায়ণপুরের কিছু পরিবার বহু আগেই রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় বাড়ি করে বাস করছেন| দিনাজপুর জেলার বিরল ও কাহারোল উপজেলায় কয়েক হাজার মানুষ বাস করেন তাদের পুর্বপুরুষেরা ছিলেন চরাঞ্চলের বাসিন্দা| জীবিকার টানে গিয়ে খাগড়াছড়িতেও কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে| ১৯৪৫ সালের ভয়াবহ বন্যার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অন্তত পনেরো হাজার পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন| সে হিসেবে বলা যায় পদ্মা নদীর তীরবর্তী অধিকাংশ পরিবারই নিজ এলাকা ছেড়ে ভিন্ন উপজেলা ও জেলায় ঘর বেঁধেছেন|

এবার বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে| এতে হাজার হাজার মানুষ বসতভিটে হারানোর আতঙ্ক নিয়ে অনিশ্চিত দিন কাটাচ্ছেন| ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে দুই শতাধিক বাড়ি ও শতাধিক বিঘা আবাদি জমি|

স্থানীয় জরিপ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পদ্মানদীতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ নদীভাঙন হয়েছে| বিলীন হয়েছে হাজারো পরিবারের ঘরবাড়ি ও ফসলের মাঠ| এর মধ্যে অন্তত ৫শ পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন| তারা অধিকাংশই নাচোল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন| অনেকেই শিবগঞ্জ, রানীহাটি, বিনোদপুর, আটরশিয়া ও সদর উপজেলার আমনুরা, বাবুডাইং, সুন্দরপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাস করছেন| পদ্মার খরস্রোতে তলিয়ে গেছে দক্ষিণ পাঁকা, তেরো রশিয়া, ডুবাইপাডা, গমের চর, জামাই পাড়া, সরদার পাড়া, হাট পাড়া, মারাঙা পাড়া, হিন্দু পাড়াসহ প্রায় ১৫টি গ্রাম| নদীতে ভেঙে গেছে পাঁকা-নারায়নপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়, পাঁকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর পাঁকা সরদার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গমের চর প্রাথমিক বিদ্যালয় , হলদিবোনা হাট, তেলিখাড়ি হাট, গমের চর কবরস্থান, চর পাঁকা ঈদগাহসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ, মন্দির প্রভৃতি| বিলীন হওয়া আবাদি জমি পরিমাণ প্রায় এক হাজার হেক্টর| ৫ বছরে এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২শ কোটি টাকা| বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে প্রায় ৫০টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ৫টি বিজিবি ক্যাম্প, স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, ৪টি হাট-বাজার, ৩টি কবরস্থান ও কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি|

স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে পদ্মা নদীর পুর্বপাড়ে তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়| পরবর্তীতে সরকার পূর্বপাড়ে ৭টি ‘আই’ সদৃশ বাঁধ নির্মাণ করেছিল| এরমধ্যে ১ ন¤^র বাঁধ বা স্পারের পার্শ্ববর্তী এলাকা নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায় কয়েক বছরের মধ্যেই| ওই এক ন¤^র বাঁধ এখন পদ্মানদী গর্ভে মধ্যভাগে দাঁড়িয়ে আছে| এরপর থেকে বহুবার নদীভাঙন প্রতিরোধে বাঁধ নির্মাণের জন্য  আবেদন জানিয়েছেন তারা|

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, এ অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারই অন্তত ২০ থেকে ২৫ বার নদীভাঙনে বসতভিটে হারিয়েছে| ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশের দুর্লভপুর ইউনিয়নের যে স্থানে পদ্মা নাম ধারণ করেছে সেই মোহনা স্থল থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ| ভারি বর্ষায় যখন পাহাড়ি ঢল নেমে আসে তখন ফারাক্কা বাঁধের শতাধিক গেট খুলে দেয়া হয়| তখন পদ্মা আরো বেশি খরস্রোতা হয়ে উঠে| শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন| তবে বিগত কয়েকবছরে নদীভাঙনের গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে| অতিরিক্ত বর্ষা ও বন্যা ছাড়াও আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত নদীভাঙন অনবরত চলছে| ফলে এলাকাবাসী হতাশ ও আতঙ্কিত|

পাঁকা ইউনিয়নের দুইবারের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান বলেন, “গত এক বছরের মধ্যে দুইবার আমার বসতভিটে নদীতে বিলীন হলো| গত কয়েক বছর থেকে যেরকম নদীভাঙন হচ্ছে এরকম ভাঙন এর আগে আমি কখনো দেখিনি| এখন চরাঞ্চলের কোনো এলাকা আর নিরাপদ না| সবাই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে| যেকোনো সময় যেকোনো এলাকা ভাঙনের কবলে পড়তে পারে| এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে হয়তো পাঁকা চর সম্পুর্ণ বিলীন হয়ে যাবে| তবে আমরা শুনছি নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে| প্রকল্পটি সঠিক সময়ে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হলে নদীভাঙনের কবল থেকে হাজার হাজার পরিবারের ঠিকানা স্থায়ী করা সম্ভব| এতে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হবে| এলাকায় সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি পাবে| কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে| দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে|”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম জানান, “শিবগঞ্জ উপজেলায় পাদ্মা নদীর পূর্বপাড়ের ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে পাস হয়েছে| টেন্ডারের কাজও প্রায় শেষ| ৭৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মাঠে নামবেন দুই সপ্তাহের মধ্যে| পরবর্তীতে নদীর পশ্চিম পাড়ে বাঁধ নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে| সরকার পদ্মানদীর দুই পাড়েই পর্যায়ক্রমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে জনগণের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করে দিবে|”

শিকড়ের সম্পর্ক ছেড়ে যাওয়ার যে বেদনা তা দূর থেকে উপলব্ধি করা যায়না শুধু অনুমান করা যায়| যারা এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন শুধু তারাই বুঝবেন এর যন্ত্রণা| তবে জন্মান্তরের মায়া ছাড়তে হলেও বড় সান্ত্বনা হলো, মৃত্যুর পর অন্তত কবরস্থানের চিহ্নটুকু স্মরণীয় হয়ে থাকবে স্বজনদের কাছে|

ঠিকানাহীন মানুষের সবচেয়ে বড় বেদনা শুধু ঘর হারানো নয়; হারিয়ে যায় শিকড়, স্মৃতি, পরিচয় আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা| পদ্মার ভাঙন কেবল মাটি কেড়ে নেয় না, মানুষের ইতিহাসও মুছে দেয়| স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যখন হাজারো মানুষ একটি স্থায়ী ঠিকানার নিশ্চয়তা পায় না, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়| উন্নয়নের মহাসড়কে তাদের জন্য কি সত্যিই কোনো জায়গা আছে?


আশফাকুর রহমান রাসেল, গণমাধ্যম ও সামাজিক কর্মী