তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক
গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে রোদ যখন গাছে গাছে কোকিলের ডাক ছাপিয়ে এক চিলতে হাওয়া বয়, তখন বাঙালির মন ছুটে যায় এক চিলতে প্রশান্তির খোঁজে| কিন্তু ˆজ্যষ্ঠের এই খরতাপে যদি আপনি দাঁড়িয়ে থাকেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো এক আমবাগানে, তবে প্রশান্তির সংজ্ঞাটাই বদলে যাবে| চারদিকে শুধু সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলতে থাকা ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষীরসাপাতি আর আশ্বিনার মেলা| বাতাসে ভেসে বেড়ানো কাঁচা-পাকা আমের সেই চিরচেনা তীব্র, মিষ্টি সুবাস|
চাঁপাইনবাবগঞ্জ— যাকে বুক ফুলিয়ে বলা যায় বাংলাদেশের ‘আমের রাজধানী’| আম শুধু এ অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি ফল নয়; আম এখানকার অর্থনীতি, আম এখানকার সংস্কৃতি, আম এখানকার ইতিহাস| বছরের এই একটা সময়ে এসে পুরো জেলা যেন এক নতুন উৎসবে মেতে ওঠে| ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে দেশের সর্ববৃহৎ আমের বাজার কানসাট| ট্রলি, ভ্যান, রিকশা আর পিকআপের চাকার শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে রাস্তাঘাট| চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম মানেই এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া, এক পরম তৃপ্তি|
আমের ইতিহাস আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস যেন একই সুতোয় গাঁথা| লোকমুখে প্রচলিত আছে, গৌড়ের সুলতানদের আমল থেকেই এই অঞ্চলে উন্নত জাতের আমের চাষ হয়ে আসছে| এখানকার মাটি, আবহাওয়া আর ভৌগোলিক অবস্থান আম চাষের জন্য সৃষ্টিকর্তার এক বিশেষ আশীর্বাদ| মহানন্দা আর পদ্মার পলি বিধৌত এই অঞ্চলের মাটিতে যে বিশেষ গুণ রয়েছে, তা আমের স্বাদ ও সুগন্ধকে করে তোলে অনন্য|
এখানকার ক্ষীরশাপাতি (যা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে) ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ফজলি, আর আম্রপালি— প্রতিটি জাতের রয়েছে নিজ¯^ ˆবশিষ্ট্য| ক্ষীরশাপাতির সেই রাজকীয় মিষ্টি স্বাদ মুখে দিলে মিলিয়ে যায়, ল্যাংড়ার পাতলা খোসা আর তীব্র সুবাস অবশ করে দেয় ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে, আর ফজলি তার বিশাল আকৃতি আর টক-মিষ্টির যুগলবন্দী নিয়ে বাঙালির শেষ পাতের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে| চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের কাছে আমের জাত চেনাটা কোনো বিদ্যা নয়, এটি তাদের মজ্জাগত ডিএনএ| তারা আমের বোঁটা দেখেই বলে দিতে পারেন, এটি কোন জাতের আম|
বর্তমানে চলছে আমের ভরা মৌসুম| এই গ্রীষ্মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রূপ যেন আরো খোলতাই হয়েছে| শীতের শেষে যখন মুকুলের সমারোহ হয়েছিল, তখন থেকেই শুরু হয়েছিল অপেক্ষা| আর এখন সেই অপেক্ষার মধুর অবসান| বাগানগুলোতে চলছে আম পাড়ার ব্যস্ততা|
কানসাট বাজার, রহনপুর বাজার, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুরাতন বাজার বা ভোলাহাটের আমবাজারগুলোতে এখন পা ফেলার জায়গা নেই| দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকাররা ছুটে আসছেন| ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই হয়ে আম চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের আনাচে-কানাচে| আর ডিজিটাল যুগে এই উৎসবের রঙে লেগেছে এক নতুন হাওয়া| চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম এখন আর শুধু ফিজিক্যাল বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি পৌঁছে গেছে ফেসবুক, ইউটিউব আর ই-কমার্সের ওয়ালে ওয়ালে|
প্রশ্ন হলো, শুধু ব্র্যান্ডিং দিয়েই কি একটি শিল্প চিরকাল টিকে থাকতে পারে? ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমš^য়| জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাজারের অস্থিরতার কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমশিল্প আজ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি| ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই শিল্পকে লাভজনক ও টেকসই করতে আমাদের এখনই কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে|
ক. কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপন
আম একটি পচনশীল ফল| মৌসুমের শুরুতে বা মাঝামাঝিতে যখন একসঙ্গে প্রচুর আম বাজারে নামে, তখন দাম অনেক কমে যায়| আবার সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার টন আম নষ্ট হয়| চাঁপাইনবাবগঞ্জে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিশেষায়িত ‘ফ্রুট কোল্ড স্টোরেজ’ স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি| যেখানে আম ˆবজ্ঞানিক উপায়ে কয়েক মাস সংরক্ষণ করা যাবে, যাতে চাষিরা অফ-সিজনেও ভালো দামে আম বিক্রি করতে পারেন|
খ. প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা
সব আম দেখতে সুন্দর হয় না বা সরাসরি খাওয়ার উপযোগী থাকে না| সেই আমগুলো থেকে পাল্প (মণ্ড), জুস, জ্যাম, জেলি, আচার, এবং আমসত্ত্ব তৈরির জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জেই বড় বড় প্রসেসিং প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে| বিশেষ করে ‘আমসত্ত্ব’কে আধুনিক প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব| এতে একদিকে যেমন অপচয় কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে|
গ. রপ্তানি বাজারের সম্প্রসারণ ও ফ্রুট ফ্লাই মুক্ত জোন
বাংলাদেশের আম এখন ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে, তবে তা পরিমাণের তুলনায় খুবই সামান্য| আম রপ্তানির প্রধান বাধা হলো ‘ফ্রুট ফ্লাই’ (ফল ছিদ্রকারী মাছি) এবং ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদ স্বাস্থ্য) সার্টিফিকেশনের অভাব| চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে ‘গ্যাপ’ (Good Agricultural Practices) এর আওতায় এনে ফ্রুট ফ্লাই মুক্ত জোন হিসেবে ঘোষণা করতে হবে| আধুনিক ‘ভেপর হিট ট্রিটমেন্ট’ প্ল্যান্ট স্থাপন করে আম জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা করলে বিশ্বের যে কোনো দেশের সুপারশপে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বুক ফুলিয়ে বিক্রি করা যাবে|
ঘ. মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস ও ই-কমার্স চেইন
চাষিরা রক্ত পানি করে আম ফলান, অথচ লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের পকেটে| এই সমস্যার সমাধানে কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা অলরেডি একটা পথ দেখিয়েছেন—সরাসরি বাগান থেকে ক্রেতার হাতে আম পৌঁছানো| এই 'F2C' (Farmer to Consumer) মডেলকে আরো শক্তিশালী করতে হবে| কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর সক্ষমতা ও সততা বাড়াতে হবে, যাতে কম খরচে এবং দ্রুততম সময়ে আম ঢাকা বা চট্টগ্রামে পৌঁছায়|
ঙ. আম পর্যটন বা ‘ম্যাংগো ট্যুরিজম’র বিকাশ
বিশ্বের অনেক দেশে আঙ্গুর বাগান বা আপেল বাগানকে কেন্দ্র করে ট্যুরিজম গড়ে ওঠে| চাঁপাইনবাবগঞ্জেও আমের মৌসুমে ‘ম্যাঙ্গো ট্যুরিজম’ চালু করা যেতে পারে| পর্যটকরা আসবেন, বাগানে থাকবেন, নিজে হাতে গাছ থেকে আম পেড়ে খাবেন, কানসাটের বাজারে রাতের ট্রেডিং দেখবেন| এর ফলে শুধু আম নয়, পুরো জেলার হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতের ব্যাপক উন্নয়ন হবে|
প্রযুক্তির এই যুগে শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে একটি অঞ্চলের ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব| আমের পরিচিতি দেশ ও বিদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে এবং এর বাণিজ্যিক মূল্য বহুগুণ বাড়াতে আমাদের প্রচলিত ভাবনার বাইরে এসে কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি|
চ. ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং ও ‘স্মার্ট ট্র্যাকিং’ (QR Code)
ভোক্তার আস্থা অর্জনের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সবচেয়ে জরুরি|
আমের জন্মপরিচয় : প্রতিটি আমের প্যাকেটে বা গায়ে একটি নির্দিষ্ট কিউআর কোড থাকবে| গ্রাহক সেটি স্ক্যান করলেই জানতে পারবেন আমটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোন বাগানের, চাষি কে এবং এটি সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত কিনা|
সেন্ট্রাল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম : জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি অফিশিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট থাকবে, যার মাধ্যমে দেশের যে কোনো প্রান্তের ক্রেতা সরাসরি নিবন্ধিত প্রকৃত চাষিদের কাছ থেকে আম কিনতে পারবেন| এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে|
জেলার মূল প্রবেশদ্বারে একটি দৃষ্টিনন্দন ‘আমচত্বর’ নির্মাণ এবং প্রতি বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক জেলা-উপজেলায় মাসব্যাপী আম মেলা উদযাপন নিঃসন্দেহে চমৎকার উদ্যোগ হতে পারে| তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এই উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি আরো কিছু আধুনিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে— আমের মৌসুমে (মে থেকে জুলাই) চাঁপাইনবাবগঞ্জকে কেন্দ্র করে দেশের প্রথম সুপরিকল্পিত ‘আম পর্যটন’ চালু করা যেতে পারে; শিবগঞ্জ বা কানসাটের বিশাল আমবাগানগুলোর মাঝে পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট এবং ‘ম্যাংগো ক্যাফে’ ˆতরি করা যেতে পারে, যেখানে বছরজুড়ে আমের ˆতরি বিভিন্ন উপাদেয় খাবার মিলবে|
ছ. ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ফিউশন (গম্ভীরা ও প্রচার)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিজস্ব সংস্কৃতি ‘গম্ভীরা’ গানকে আমের ব্র্যান্ডিংয়ের প্রধান হাতিয়ার করা যায়| নানা-নাতির রসাত্মক সংলাপের মাধ্যমে শত জাতের আমের গুণাগুণ, প্রসেসিং এবং সঠিক আম চেনার উপায় নিয়ে অ্যানিমেশন ও ওভিসি ˆতরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব|
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম কেবল আমাদের জিভের স্বদ মেটায় না, এটি আমাদের সংস্কৃতির অহংকার| সঠিক পরিচর্যা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিশ্বমানের ব্রান্ডিং নিশ্চিত করতে পারলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম শুধু বাংলাদেশের সেরা ফল হিসেবে নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক অনন্য ‘গ্রিন গোল্ড’ বা সবুজ সোনা হিসেবে নিজের নাম খোদাই করে নেবে| চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাতাসে আমের এই মিষ্টি ঘ্রাণ যুগ যুগ ধরে টিকে থাকুক, আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করুক— এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা|
তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক ও ব্যবসায়ী