চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট জনসংখ্যা ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৮ জন| এটি ২০২২ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য| গত কয়েক বছরে জনসংখ্যা আরো বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই| আর এই পরিমাণ জনসাধারণের জন্য¯^াস্থ্য সেবার প্রধান বাতিঘর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল| কিন্তু বর্তমানে কয়েকটি বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা|
জানা যায়, এই হাসপাতালে বর্তমানে ১৯টিরও বেশি সেবা চালু আছে| সেবাগুলো হচ্ছে— গাইনি ও প্রসূতি সেবা, নবজাতক ও শিশু সেবা, ডায়রিয়া ব্যবস্থপনা, দন্ত চিকিৎসা, নাক-কান-গলা সেবা, অপারেশন সার্ভিস (গাইনি, দন্ত, নাক-কান-গলা, সার্জারি, অর্থপেডিক), বহিঃবিভাগ ও জরুরি সেবা, মেডিসিন সেবা, সার্জারি, অর্থোর্পেডিক, এএনসি ও পিএনসি ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনেশান কর্নার, ল্যাব সেবা, এক্স-রে সেবা, আলট্রাসোনোগ্রাফি ও ডোপ টেস্ট উল্লেযোগ্য|
তবে এতগুলো সেবা পাবার কথা থাকলেও সব সেবা সবসময় পাওয়া যায় না| কোনো বিভাগে চিকিৎসকের পদ খালি থাকলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন| এই হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে সব ধরনের পরীক্ষাও করা যায় না| ফলে হাসপাতালের ডাক্তারকে ১০ টাকার টিকেটে দেখানো গেলেও নামীদামি পরীক্ষা (টেস্ট) বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে করতে হয়| কোনো টেস্ট স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিকে করতে পাওয়া যায়| আবার কিছু টেস্ট রাজশাহী থেকে করাতে হয়|
চিকিৎসক সংকট
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এই হাসপাতালে জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ হচ্ছে ১০টি, তার মধ্যে ২টি পদে কর্মরত আছেন আর বাকি ৮টি পদই শূন্য| এছাড়া কনিষ্ঠ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ হচ্ছে ১৭টি, কর্মরত আছেন ১১টিতে এবং শূন্য আছে ৬টি পদ| বিশেষ করে সার্জারি বিভাগে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক না থাকায় বড় অপারেশন বন্ধ হয়ে গেছে| এর ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষকে হয় স্থানীয় কোনো বেসরকারি ক্লিনিকে বা রাজশাহীতে গিয়ে অপারেশন করাতে হচ্ছে| এছাড়া সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসা| সেই মেডিসিন বিভাগেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, নেই চক্ষু বিশেষজ্ঞও|
অন্যদিকে মেডিকেল অফিসার, জরুরি মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, সহকারী রেজিস্ট্রার, ডেন্টাল সার্জন ও এমও হোমিওর জন্য মঞ্জুরিতকৃত পদ হচ্ছে ৫৫টি| তার মধ্যে ২৭টিতে কর্মরত থাকলেও ২৮টি পদই শূন্য রয়েছে| ফলে চিকিৎসা বো দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে।
প্যাথলোজি বিভাগ
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হচ্ছে প্যাথলজি বিভাগ| এই বিভাগে বর্তমানে আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, এক্স-রে, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয়| এর বাইরে হৃদরোগী সংক্রান্ত রোগীদের ইসিজি ছাড়া ইকো ও এনজিওগ্রাম করার সুযোগ নেই| কারণ, ইকো মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে| ফলে এই বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও কমমূল্যে ইকোটেস্টের সেবা থেকে রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন| এছাড়াও আরো নানা রোগের নানান ধরনের পরীক্ষা আছে, যেগুলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় করা যায় না|
হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা| হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীরা জানান, টয়লেটগুলোতে ঢোকা যায় না| ঠিকমত পরিষ্কার করা হয় না|
জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মাহবুব হাসান বলেন— রোগীরা অসচেতনতার কারণে যেখানে-সেখানে বিস্কুট বা ফাস্টফুডের খালি প্যাকেট ফেলে দেয়| রোগীদের কারণে টয়লেটগুলো নোংরা থাকে| রোগীরা না বুঝে আবর্জনা টয়লেটে ফেলে দেয়| ফলে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে পানি জমে, নোংরা হয়ে পড়ে|
তিনি বলেন— “কদিন আগেই নতুন কমোড লাগানো হয়েছিল, কয়েকদিন যেতে না যেতেই রোগীরা ভেঙে ফেলেছে| এছাড়া নিষেধ করা সত্ত্বেও সাধারণ টয়লেটে ময়লা আবর্জনা ফেলে নোংরা করে ফেলছে| তুবও চেষ্টা করছি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার|
হাসপাতাল সূত্র জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার রোগী আন্তঃবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন আর গড়ে ভর্তি থাকছেন প্রায় ৬ শতাধিক রোগী| রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের| এরই মধ্যে সম্প্রতি বেশ কয়েকজন চিকিৎসক বদলি হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে| সীমিত জনবল নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে| আর চিকিৎসাসেবা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের|
অন্যদিকে ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে একজন জানান, ডাক্তাররা নির্দিষ্ট সময়ে রাউন্ডে আসেন না| কখনো ১০টায় আসেন তো কখনো ১২টায় আসেন|
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার বলেন— এই হাসপাতালে কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসকসহ সবমিলিয়ে মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ৩৯৬টি| তার মধ্যে ৩০২টিতে জনবল থাকলেও ৯৫টি পদ শূন্য রয়েছে| শূন্যপদগুলো বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদগুলো পূরণের চেষ্টা চলছে| আর প্যাথলজি বিভাগের মেশিনপত্রগুলোর জন্যও চেষ্টা চলছে| আশা করছি, দ্রুতই সমাধান হবে|