আব্দুল্লাহ সাহেদ
চলছে জুলাই মাস| জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেশি থাকে| প্রতি বছর বর্ষার এই আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে প্রকৃতির রিমঝিম রূপ বদলের পাশাপাশি আমাদের জনজীবনে এক নীরব কিন্তু প্রলয়ঙ্করী আতঙ্কের নাম হয়ে দেখা দেয় এডিস মশাবাহিত ‘ডেঙ্গু জ্বর’। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিগত কয়েক বছরের বিস্তারিত পরিসংখ্যান ও মহামারী সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বার্ষিক মোট ডেঙ্গু সংক্রমণ ও এর ফলে ঘটা করুণ মৃত্যুর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই সংঘটিত হয় এই জুলাই ও আগস্টের আর্দ্র মৌসুমে| আষাঢ়ের অঝোর ধারায় কিংবা শ্রাবণের হঠাৎ বৃষ্টিতে শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের আনাচে-কানাচে জমতে থাকা স্বচ্ছ পানিই হয়ে ওঠে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির সবচেয়ে মোক্ষম ও আদর্শ প্রজননক্ষেত্র|
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বৈশ্বিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী ডেঙ্গুর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছে এবং প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৯ কোটি মানুষ এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে সংক্রমিত হয়, যার মধ্যে লাখ লাখ মানুষকে হাসপাতালে জটিল অবস্থায় ভর্তি হতে হয়| বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর মারাত্মক প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এই রোগটি এখন আর নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বছরের উদ্বেগে পরিণত হলেও জুলাই-আগস্টে এর রূপ চরম আকার ধারণ করে|
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পতঙ্গসংক্রান্ত নিবিড় গবেষণায় উঠে এসেছে, অনুকূল আর্দ্র আবহাওয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রায় এডিস মশার জীবনচক্র অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়; আগে যেখানে একটি ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে ১০ থেকে ১৪ দিন সময় লাগত, এখন বর্ষার আর্দ্রতায় মাত্র ৭ থেকে ৮ দিনেই তা পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়ে রক্ত চুষতে শুরু করে| এ সময় দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সাধারণ ওয়ার্ড থেকে শুরু করে মেঝের বারান্দা পর্যন্ত ছেয়ে যায় ডেঙ্গু রোগীর আকুল কান্নায়, আর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে স্বজনদের হাহাকার পরিবেশকে ভারী করে তোলে|
কিন্তু একটু ঠাণ্ডা মাথায় তলিয়ে দেখলে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারব, এই পরিস্থিতিতে কেবল ভয় পেয়ে, আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে কিংবা সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ওপর সব দায় চাপিয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে আমাদের কারো জীবনই নিরাপদ থাকবে না| সংকট যত বড়ই হোক, একজন দায়িত্বশীল ও সাধারণ সচেতন নাগরিক হিসেবে রোগটির আসল রূপ জানা, ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সঠিক সময়ে সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হতে পারে ডেঙ্গুর এই মহামারী রূপ রুখে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর পথ|
ডেঙ্গুর এই সংহারী রূপ থামিয়ে দিতে হলে প্রথম ধাপে আমাদের এই রোগের ভাইরাসভিত্তিক প্রকৃতি, এর শারীরিক উপসর্গ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত নিয়মাবলি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও দ্বিধাহীন ধারণার বিকাশ ঘটাতে হবে| আধুনিক বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ডেঙ্গু মূলত ‘ফ্লেভিভাইরাস’ (Flavivirus)গণের অন্তর্ভুক্ত চারটি ভিন্ন ও জিনগতভাবে স্বতন্ত্র সেমোটাইপ— যথা DEN-1 , DEN-2, DEN-3 এবং DEN-4 দ্বারা মানবদেহে সৃষ্টি হয়| এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, একজন মানুষ তার সমগ্র জীবদ্দশায় চারবার পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন সেমোটাইপ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন এবং প্রথমবার একটি সেমোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অর্জিত প্রতিরোধক্ষমতা অন্য সেমোটাইপের বিরুদ্ধে কাজ তো করেই না, বরং দ্বিতীয়বার অন্য ভিন্ন সেমোটাইপ দ্বারা সংক্রমিত হলে মানবদেহে ‘অ্যান্টিবডি-ডিপেন্ডেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট’ (ADE) প্রক্রিয়ায় ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’ বা ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’-এর মতো অতি-জটিল শারীরিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা মৃত্যুর হারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়| ডেঙ্গু ভাইরাসের মূল বাহক হলো ‘এডিস ইজিপ্টি’ (Aedes Aegypti) মশা; এই মশার গায়ে চিতা বাঘের মতো উজ্জ্বল সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ থাকার কারণে একে সচরাচর ‘টাইগার মশা’ বলা হয়| ডেঙ্গু রোগের লক্ষণগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভাইরাস প্রবেশের ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে হঠাৎ করে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শরীর ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে| জ্বরের পাশাপাশি চোখের ভেতরের দিকে বা চোখের মণি ঘোরাতে গেলে তীব্র যন্ত্রণা, শরীরে লালচে ছোপ ছোপ র্যাশ বা লাল দাগ ফুটে ওঠা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং হাড় ও পেশিতে অসহ্য কামড়ানি অনুভূতি হয়— যা এতই মারাত্মক যে চিকিৎসার ইতিহাসে একে একসময় ‘ব্রেক-বোন ফিভার’ বা হাড়ভাঙা জ্বর বলা হতো|
তবে আমাদের সমাজে ডেঙ্গু নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুলটি ঘটে চিকিৎসা শুরুর প্রাথমিক পদক্ষেপে| জ্বর আসার সাথে সাথেই অনেকে চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজের মনমতো ওষুধ কিনে সেবন করেন কিংবা ব্যথা কমানোর জন্য নাপ্রোক্সেন, আইবুপ্রোফেন, অ্যাস্পিরিন ও কিটোরোলাক জাতীয় পেইনকিলার খেয়ে ফেলেন| চিকিৎসা গবেষণায় এটি শতভাগ প্রমাণিত যে, এই জাতীয় পেইনকিলার ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেটের স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয় এবং রক্তের জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের (Hemorrhage) ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়, যা রোগীকে অকালেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়| ডেঙ্গু যেহেতু সম্পূর্ণরূপে একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এতে কোনো প্রকার অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না; ফলে জ্বর আসামাত্রই ফার্মেসির কথায় হুটহাট অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা শরীরকে আরো দুর্বল করে তোলে|
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ডেঙ্গুতে প্লাটিলেটের চেয়েও রক্তরসের উপাদান প্লাজমা তরল ক্ষরণ (Plasma Leakage) রোধ করা বেশি জরুরি; তাই জ্বর হলে শুরুতেই কোনো ভুল ওষুধ না খেয়ে প্রচুর পরিমাণে সাধারণ পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও সুপ সেবন করে শরীরকে সজল রাখা এবং প্রথম দিনেই এনএস-১ অ্যান্টিজেন (NS1 Antigen) ও রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে ˆবজ্ঞানিক ও নিরাপদ পথ| তবে যদি জ্বরের ২-৩ দিন পর জ্বর কমতে শুরু করে কিন্তু সেই সাথে তীব্র পেটে ব্যথা, অনবরত বমি ভাব বা বমি হওয়া, নাক, মাড়ি বা ত্বকের নিচ থেকে রক্তপাত, প্রস্রাব কমে যাওয়া, প্রচণ্ড অস্থিরতা বা হঠাৎ শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে রক্তচাপ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ার মতো ‘ওয়ার্নিং সাইন’ বা বিপদচিহ্ন দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে রোগী অত্যন্ত স্পর্শকাতর ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’-এ প্রবেশ করেছে এবং তখন রোগীকে আর এক মুহূর্তও ঘরে না রেখে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি করানো জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়|
চিকিৎসাবিজ্ঞানের চিরন্তন সত্য হলো— রোগ নিরাময়ের চেয়ে রোগ প্রতিরোধ সর্বদা শ্রেয়; আর ডেঙ্গুর জন্য কোনো সর্বজনীন ও শতভাগ কার্যকর টিকা বা ভাইরাস ধ্বংসকারী সরাসরি ওষুধ এখনো আমাদের হাতে না থাকায় বাহক এডিস মশার প্রজনন উৎস ধ্বংস করাই হলো ডেঙ্গু থামানোর একমাত্র বাস্তবসম্মত ও কার্যকর প্রতিষেধক| আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা কাজ করে যে, ডেঙ্গুর মশা হয়তো ড্রেন, নর্দমা, ডোবা বা ময়লা পচা পানিতে জন্মায়— যা ˆবজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন| জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পতঙ্গতাত্ত্বিক গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, এডিস মশা অপরিচ্ছন্ন বা দূষিত পানিতে মোটেও ডিম পাড়তে পারে না; এদের প্রজননের জন্য প্রয়োজন পড়ে একদম পরিষ্কার, স্বচ্ছ ও স্থির পানি| এমনকি গবেষকরা জমানো মাত্র এক চা চামচ পরিষ্কার পানিতেও এডিস মশার ডিম ও লার্ভার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন| এই মশার ডিমের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও এটি মাসের পর মাস শুকনো অবস্থায় জীবিত থাকতে পারে এবং বহু দিন পর সেখানে সামান্য বৃষ্টির পানি স্পর্শ করলেই ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়ে আসে| এই কারণেই প্রতি বছর বর্ষার বৃষ্টি শুরু হতেই ঘরের আশপাশে পড়ে থাকা শুকনো পাত্রগুলোতে জমানো পানিতে হুহু করে এডিস মশার জন্ম হয়| ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ঘরোয়া হাতিয়ার হিসেবে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে ‘৩ দিনের নিয়ম’ অত্যন্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে|
এই নিয়মের মূল কথা হলো— আমাদের বসতবাড়ির ভেতরে বা বাইরে ছাদের টবের নিচের ডিশ, এয়ার কন্ডিশনার ও ফ্রিজের নিচের পানির ট্রে, বাথরুমের বালতি, অ্যাকুরিয়াম বা যে কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি কোনো অবস্থাতেই যেন টানা ৩ দিনের বেশি একই জায়গায় জমে না থাকে| প্রতি ৩ দিন পর পর পাত্রের পানি ফেলে দিয়ে পাত্রটির ভেতরের দেয়াল ভালো করে ঘষে মেজে পরিষ্কার করতে হবে, যাতে গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম নষ্ট হয়ে যায়| বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন বাড়ির ছাদ বা উঠানে ফেলে রাখা ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের কাপ, চিপসের খালি প্যাকেট, ডাবের খোসা, কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল এবং পরিত্যক্ত টায়ার বা ভাঙা হাঁড়ি-পাতিলে বৃষ্টির পানি জমে, তখন তা এডিস মশার জন্য প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়; তাই এই জাতীয় বর্জ্যদ্রব্য উন্মুক্ত স্থানে না ফেলে সঠিক উপায়ে ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিনে ফেলার অভ্যাস গড়তে হবে| এডিস মশার প্রজনন রোধের পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার দিকটিতেও সর্বোচ্চ সতর্কতা নিশ্চিত করতে হবে| পূর্বে ধারণা করা হতো যে, এডিস মশা কেবল সূর্যোদয়ের ঠিক পর বা সূর্যাস্তের সামান্য আগে কামড়ায়; কিন্তু আধুনিক পতঙ্গবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম গবেষণায় পরিষ্কার উঠে এসেছে যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এডিস মশা তাদের ¯^ভাব বদলে ফেলেছে— এখন ঘরের ভেতরের কৃত্রিম টিউবলাইট বা এলইডি আলোর উপস্থিতিতে এরা দিন বা রাত যে কোনো সময় মানুষকে কামড়াতে পারে| সেই কারণে দিনে কিংবা রাতে— যে সময়েই আমরা ঘুমাই না কেন, বিছানায় টাঙানো মশারি ব্যবহার করা নিশ্চিত করতে হবে, যা শিশু, গর্ভবতী নারী ও প্রবীণদের সুরক্ষায় জাদুর মতো কাজ করে| বিশেষ করে শিশুরা যখন সকালে স্কুলে যায় বা বিকেলে খেলতে বের হয়, তখন তাদের শরীর ঢেকে রাখা ফুল হাতা জামা পরানো উচিত এবং বাইরে বের হওয়ার আগে উন্মুক্ত ত্বকে স্বাস্থ্যসম্মত মশা তাড়ানোর লোশন বা স্প্রে (Mosquito Repellent) ব্যবহার করা যেতে পারে| এছাড়া ঘরের দরজা-জানালায় সূক্ষ্ম মশার নেট লাগানো এবং ঘরে প্রচুর আলো-বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত ফলপ্রসূ, কারণ এডিস মশা সাধারণত ঘরের অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে কোণগুলোতেই আশ্রয় নিতে পছন্দ করে|
সর্বোপরি, আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কেবল কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারি সংস্থার একা সামলানোর মতো সমস্যা নয়; বরং এটি একটি বহুমুখী সামাজিক ব্যাধি— যা মোকাবিলা করতে প্রয়োজন সর্বস্তরের ব্যক্তিসচেতনতা ও সামাজিক ঐক্যের সুদৃঢ় মেলবন্ধন| উদাহরণস্বরূপ, আপনি হয়তো নিজের ঘরবাড়ি ধুয়ে-মুছে শতভাগ পরিষ্কার ও পানিহীন রাখলেন, কিন্তু আপনার পাশের ঘরের প্রতিবেশী যদি তার ব্যালকনির টবে টানা ১০ দিন ধরে পানি জমিয়ে রাখেন কিংবা আপনার গলির মোড়ে নির্মাণাধীন ভবনের নিচে পানি জমে থাকে, তবে সেখানে জন্ম নেয়া এডিস মশা উড়ে এসে আপনার বা আপনার ছোট্ট সন্তানের দেহে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিতে এক সেকেন্ডও সময় নেবে না| জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, বড় বড় শহরগুলোতে মোট জন্ম নেয়া এডিস মশার লার্ভার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই পাওয়া যায় নির্মাণাধীন ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার ও ঢালাইয়ের পানিতে; তাই নির্মাণাধীন ভবনের মালিকদের এ বিষয়ে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা প্রতিবেশীদের নাগরিক দায়িত্ব|
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখতে পাবো সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো কেবল কীটনাশক ছিটিয়ে নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, ডিজিটালাইজড মনিটরিং এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ডেঙ্গুকে জয় করতে সমর্থ হয়েছে| সিঙ্গাপুরে যদি কোনো নাগরিকের বাড়ির ভেতরে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়, তবে তাকে ভারী জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়; এর ফলে সেখানকার সাধারণ মানুষ নিজেদের স্বার্থেই চারপাশ সবসময় পরিষ্কার রাখেন| আমাদের দেশেও প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ফ্ল্যাট মালিক সমিতি ও সামাজিক ক্লাবগুলোকে সাথে নিয়ে সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি| এর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের একদম ছোটবেলা থেকেই এডিস মশার জীবনচক্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব শেখাতে হবে| স্থানীয় সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মশা নিধন কর্মী যখন কাজ করতে আসেন, তখন তাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা একজন আদর্শ নাগরিকের কর্তব্য| মনে রাখতে হবে, কেবল সরকারি ফগিং বা ধোঁয়া প্রয়োগ করে উড়ন্ত মশা তাড়িয়ে লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব নয়; তাই প্রজনন উৎস ধ্বংস করাই হলো মশা দমনের আসল মূলমন্ত্র| আমরা যদি আমাদের দায়িত্ব বুঝতে ভুল করি কিংবা সাময়িক অলসতায় জমানো পানি পরিষ্কার না করি, তবে আমাদের সেই ছোট অবহেলাই হয়তো কাল পরিবারের প্রিয় কোনো মানুষের জীবন প্রদীপ চিরতরে নিভিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে| তাই আসুন, জুলাই-আগস্টের এই বৃষ্টিভেজা ও ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুমে হাত গুটিয়ে না বসে, আতঙ্কিত না হয়ে, আমরা প্রতিটি সাধারণ মানুষ একযোগে আওয়াজ তুলি এবং নিজ নিজ বাসস্থান ও কর্মক্ষেত্রকে এডিস মশামুক্ত রাখার শপথ নিই— কারণ আমাদের একতাবদ্ধ নাগরিক সচেতনতা ও সময়োচিত সামান্য সতর্কতাই পারে বাংলাদেশকে ডেঙ্গুমুক্ত একটি নিরাপদ, সুস্থ ও সুন্দর বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ উপহার দিতে|
আব্দুল্লাহ সাহেদ : ব্যাংকার, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক