ভেনেজুয়েলায় গত সপ্তাহে আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে| সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৫৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে| অন্যদিকে, প্রায় ১৮ হাজার মানুষ এখনো গৃহহীন অবস্থায় রয়েছেন| গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারের সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা| প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনেজুয়েলার আইনপ্রণেতা হোর্হে রদ্রিগেজ গত সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ৭৮০ জন আহত হয়েছেন| এছাড়া প্রায় ১৭ হাজার ৮৫৪ জন মানুষ সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন| ভূমিকম্পে সবচেয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চল কারাকাস ও লা গুয়াইরার ৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত ১২ হাজার ৮০০ মানুষ অবস্থান করছেন|
গত সোমবার লা গুয়াইরায় ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এই অঞ্চলে বর্তমানে গণকবরের প্রস্তুতি চলছে| তারা ট্রাক ও ফরেনসিক কর্মীদের সারি সারি কফিন পরিবহন করতে দেখেছেন| সাদা ক্রুশ দিয়ে চিহ্নিত একটি খোলা জায়গায় ভারী খননযন্ত্র দিয়ে বড় গর্ত খনন করা হচ্ছিল, যেখানে কর্তৃপক্ষ মরদেহ দাফন করছে| গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভয়াবহ দুটি ভূমিকম্প কারাকাস ও লা গুয়াইরা এবং এর আশেপাশে এলাকায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানে| প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, প্রায় ৬০ হাজার বাড়িঘর ও বহুতল ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে| আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমিকম্পের পর এখন অন্যতম বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য| হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ভেনেজুয়েলান বিশুদ্ধ পানির অভাবের মধ্যে ভিড়াক্রান্ত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বা খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছেন| হাজার হাজার মানুষের আঘাতের চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি এবং তারা সংক্রামক রোগে ভুগছেন, যা মোকাবিলা করতে দেশটির স্বাস্থ্যসেবা খাত হিমশিম খাচ্ছে| কারাকাসের হোসে গ্রেগোরিও হার্নান্দেজ হাসপাতালের ট্রমা ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক ইউজেনিও কোভা সতর্ক করে বলেন, “আমরা শারীরিক ও মানসিক ট্রমার প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছি ঠিকই, কিন্তু এখন বড় বিপর্যয় হয়ে আসছে সংক্রমণ| দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকায় রোগীদের মাঝে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে|”
আল-জাজিরার প্রতিনিধি তেরেসা বো লা গুয়াইরার একটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে জানান, দুর্গত মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে| আশ্রয়প্রার্থীরা জরুরি ভিত্তিতে পোর্টেবল টয়লেট এবং ভিড় কমানোর জন্য সরকারি উদ্যোগের দাবি জানাচ্ছেন| এদিকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ভেনেজুয়েলা সরকারের ধীরগতি এবং সমন্বয়হীনতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে| অনেক এলাকাতেই সরকারের কোনো দেখা মেলেনি| ফলে সাধারণ নাগরিক, ¯ে^চ্ছাসেবী এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থাই এখন নিজ উদ্যোগে ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ উদ্ধার ও খাবার বিতরণের কাজ করছে| ওয়াশিংটন অফিস অন ল্যাটিন আমেরিকা নামক মানবাধিকার ও গবেষণা সংস্থার প্রেসিডেন্ট ক্যারোলিনা জিমেনেজ সরকারের এই ব্যর্থতার কড়া সমালোচনা করেছেন| জিমেনেজ বলেন, “যেকোনো স্বাভাবিক দেশে দুর্যোগের পর রাষ্ট্র সবার আগে এগিয়ে আসে| কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সবার শেষে সাড়া দিয়েছে| কাতিয়া লা মার-এর মতো অনেক দুর্গত এলাকায় এখনও প্রশাসনের কোনো অস্তিত্ব নেই| যা কিছু সাহায্য পৌঁছাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষ ও ¯ে^চ্ছাসেবকদের হাত ধরেই আসছে|”