বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৮ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
গোমস্তাপুরে আইন শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা এবার রাজশাহীতে ডেঙ্গুতে মৃত্যু চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজনের : জেলায় নতুন আক্রান্ত ৬৬ জন শিবগঞ্জে ৬টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার, একজন আটক শিবগঞ্জে বন্যার্তদের মধ্যে চাল বিতরণ করলেন এমপি ড. কেরামত প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাস ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ মহাসচিবের স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বার্তা দেবেন প্রধানমন্ত্রী চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় ফিফা সংস্কারের প্রস্তাব দিলেন ইনফান্তিনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন মার্ক উড
Printed on: September 23, 2026
May 25, 2026
সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

নজরুলের সাম্যচেতনা ও বৈষম্যবিরোধী দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক এক দীপ্ত উচ্চারণ

Published: May 25, 2026 at 08:34 AM
নজরুলের সাম্যচেতনা ও বৈষম্যবিরোধী দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক এক দীপ্ত উচ্চারণ

তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক


বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক নাম, যিনি কেবল কবি হিসেবেই নন, বরং একটি চেতনা, একটি সংগ্রাম এবং একটি মানবিক দর্শনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত| তিনি ছিলেন বিদ্রোহের কবি, সাম্যের কবি, মানবতার কবি| তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি ফুটে উঠেছে নিপীড়িত মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা| তিনি সারাটি জীবন ˆবষম্য, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন| মানুষের মুক্তি, ন্যায়বিচার ও সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ গঠনের স্বপ্নই ছিল তাঁর সাহিত্য ও দর্শনের মূল ভিত্তি|

নজরুল এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, যখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে নিপীড়িত| সমাজব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে তখন বৈষম্য ছিল প্রকট| সামন্তবাদ, জমিদারি প্রথা, শ্রেণী শোষণ, ধর্মীয় কুসংস্কার ও জাতিগত বিভাজন সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল| এই বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন নজরুল| দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও অবহেলার অভিজ্ঞতা তাঁর ˆশশব থেকেই তাঁকে মানুষের দুঃখের সঙ্গে একাত্ম করে তোলে| ফলে তাঁর সাহিত্য নিছক কাব্যচর্চায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা|

নজরুল বিশ্বাস করতেন— যা কিছু মানুষের জন্য সুন্দর, মহৎ ও কল্যাণকর, তাই ধর্ম| তাঁর এই উপলব্ধি তাঁকে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে এনেছিল| তিনি কখনো ধর্মকে বিভেদের হাতিয়ার হিসেবে দেখেননি| বরং ধর্মকে দেখেছেন মানবকল্যাণের পথ হিসেবে| তাই তাঁর সাহিত্যজুড়ে আমরা মানবতাবাদী এক গভীর চেতনার পরিচয় পাই| তিনি লিখেছিলেন—

“গাহি সাম্যের গান—

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান|”


এই উচ্চারণ কেবল কবিতার পংক্তি নয়; এটি ছিল তাঁর জীবনদর্শনের সারকথা| তিনি এমন একটি সমাজ কল্পনা করেছিলেন, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না; ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী কিংবা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কেউ বঞ্চিত হবে না|

নজরুলের সাহিত্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর রচনার মূল সুর দুটি— একদিকে সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ, অন্যদিকে মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা| তাঁর কবিতা, গান, গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ কিংবা চিঠিপত্র— সবখানেই এই দুই চেতনার প্রতিফলন স্পষ্ট| তিনি নিপীড়িত মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করেছেন| তাই তাঁর সাহিত্য কখনো কেবল নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর|

তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি| সেখানে তিনি কেবল ব্যক্তিগত বিদ্রোহের কথা বলেননি; বরং যুগযুগান্তরের শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদকে তুলে ধরেছেন| তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—

“বল বীর—

বল উন্নত মম শির!”


এই উচ্চারণ ছিল আত্মমর্যাদার ঘোষণা| পরাধীন মানুষের আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তিনি ভাষা দিয়েছিলেন| নজরুলের বিদ্রোহ ধ্বংসের জন্য ছিল না; তাঁর বিদ্রোহ ছিল মানবমুক্তির জন্য|

নজরুল ছিলেন স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবতা ও সুবিচারের কবি| তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির কথাও বলেছেন| তিনি বুঝেছিলেন, কেবল শাসকের পরিবর্তন মানুষের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না; প্রয়োজন ˆবষম্যহীন সমাজব্যবস্থা| তাই তিনি বুর্জোয়া ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন| তাঁর কাব্যে বারবার উঠে এসেছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম| ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—

“দেখিনু সেদিন রেলে

কুলি বলে এক বাবুসাব তারে টেনে দিল নিচে ফেলে

চোখ ফেটে এলো জল

এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল|”


এই কয়েকটি পংক্তিতেই ফুটে উঠেছে তাঁর মানবিকতা ও শ্রেণীবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ| তিনি সমাজের সেই মানুষদের কথা বলেছেন, যাদের কণ্ঠস্বর কেউ শুনতে চায় না| কুলি, মজুর, কৃষক, শ্রমিক, অবহেলিত নারী— এদের জীবনসংগ্রামই তাঁকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল|

নজরুল মানুষকে জাতির ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন| তিনি বুঝেছিলেন, মানুষকে বিভক্ত করে রাখা শাসকগোষ্ঠীর অন্যতম কৌশল| তাই তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ঐক্যের কথা বলেছেন| তাঁর সাহিত্যজুড়ে অসাম্প্রদায়িকতার এক শক্তিশালী বার্তা রয়েছে| তিনি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমানভাবে গ্রহণ করেছিলেন| তাঁর ইসলামী গান যেমন জনপ্রিয়, তেমনি শ্যামাসংগীতও সমানভাবে সমাদৃত| এই ˆবচিত্র্যের মধ্য দিয়েই তিনি প্রমাণ করেছেন— মানবতা ধর্মের চেয়েও বড়|

নজরুলের সময় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছিল| ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী “ভাগ করো এবং শাসন করো” নীতির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনকে উসকে দিচ্ছিল| কিন্তু নজরুল এই বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন| তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভাজন সৃষ্টি করা মানবতার পরিপন্থী| তাই তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন| তাঁর সাহিত্য আজও আমাদের সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়|

নারী স্বাধীনতা ও নারীর মর্যাদার প্রশ্নেও নজরুল ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল| সে সময়ের সমাজে নারীরা ছিল অবহেলিত ও বঞ্চিত| কিন্তু নজরুল নারীকে কখনো দুর্বল বা গৌণ হিসেবে দেখেননি| বরং তিনি নারীকে সমাজের সমান অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন| তার ‘নারী’ কবিতার বিখ্যাত পংক্তি—

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর|”


এই উচ্চারণ ছিল নারী-পুরুষ সমতার এক যুগান্তকারী ঘোষণা| তিনি বুঝেছিলেন, সমাজে প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি|

নজরুলের সাহিত্যচর্চা ছিল মানবমুক্তির আন্দোলনের অংশ| তিনি কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে ছিলেন| তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মন মুক্ত না হলে সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়| তাই তাঁর লেখায় যুক্তিবাদ, মুক্তচিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়|

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে নজরুলের চেতনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে| পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ˆবষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে বাঙালির যে সংগ্রাম, তা ছিল মূলত অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলন| নজরুলের সাম্যের ধারণা খুব সহজেই বাংলাদেশের মানুষের চেতনার সঙ্গে একাকার হয়ে যায়| তাঁর গান ও কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল| বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেতনায় অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও মানবমুক্তির যে মূল্যবোধ রয়েছে, নজরুল তাঁর অন্যতম প্রধান ধারক|

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়| এটি শুধু সাহিত্যিক সম্মান নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শের সঙ্গে তাঁর চেতনার মিলের স্বাকৃতি| কারণ তিনি যে সমাজের  স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই সমাজের ভিত্তি ছিল সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবতা|

কিন্তু প্রশ্ন হলো— আজ আমরা কতটা নজরুলের আদর্শ অনুসরণ করছি? স্বাধীনতার এত বছর পরও সমাজে ˆবষম্য রয়ে গেছে| অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে, ধনী-গরিবের ব্যবধান ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে| ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক বিভাজন ও সামাজিক অবিচার নতুন নতুন রূপে ফিরে আসছে| শ্রমজীবী মানুষ এখনো বঞ্চিত, নারী এখনো নির্যাতনের শিকার, দুর্বল মানুষ এখনো ক্ষমতাবানদের হাতে অপমানিত হচ্ছে|

এই বাস্তবতায় নজরুলের সাহিত্য আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়| তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন— মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়নই অর্থবহ নয়| কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে মানবিক সমাজ গড়া যায় না; প্রয়োজন ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতা|

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তব্যে বিভাজনের যে সংস্কৃতি ˆতরি হয়েছে, তা নজরুলের আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত| তিনি কখনো ঘৃণার রাজনীতি সমর্থন করেননি| বরং তিনি ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মানবিক ঐক্যের কথা বলেছেন| তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়— ধর্ম কিংবা মতাদর্শের ভিন্নতা মানুষকে শত্রু বানায় না; বরং মানবিকতার অভাবই মানুষকে বিভক্ত করে|

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে নজরুলকে নতুনভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন| অনেক সময় তাঁকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবেই সীমাবদ্ধভাবে উপস্থাপন করা হয়| অথচ তাঁর সাহিত্যচেতনার বিস্তৃতি অনেক গভীর| তিনি ছিলেন প্রেমের কবি, মানবতার কবি, সাম্যের কবি, শ্রমজীবী মানুষের কবি| তাঁর সাহিত্য আমাদের কেবল প্রতিবাদ করতে শেখায় না; বরং মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়|

নজরুলের সাহিত্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব চাননি; তিনি চেয়েছিলেন মানুষের চিন্তার বিপ্লব| তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে এবং মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে| তাঁর সাহিত্য আমাদের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার শিক্ষা দেয়|

তাঁর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল| এজন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল| কিন্তু কারাগারেও তিনি মাথা নত করেননি| তার ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ স্বাধীনতা ও মানবমুক্তির এক ঐতিহাসিক দলিল| সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন— অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম কখনো থামবে না|

এই আপসহীনতা নজরুলকে অনন্য করে তুলেছে| তিনি ক্ষমতার কাছে নত হননি; বরং সবসময় নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন| তাঁর সাহিত্য আজও আমাদের সাহস জোগায়— সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে এবং মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখতে|

বর্তমান বিশ্বে যখন যুদ্ধ, বর্ণবাদ, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও অর্থনৈতিক শোষণ বেড়ে চলেছে, তখন নজরুলের সাম্যের বাণী আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে| পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনো মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিপীড়নের শিকার| প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটলেও মানবিক সংকট কাটেনি| এই পরিস্থিতিতে নজরুল আমাদের মনে করিয়ে দেন— মানুষের মুক্তি ছাড়া কোনো সভ্যতা সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে না|

নজরুলের সাহিত্য আমাদের কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশ| তাঁর আদর্শ নতুন প্রজন্মকে মানবিক হতে শেখায়, বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠতে শেখায় এবং ˆবষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে|

আমরা যদি সত্যিই নজরুলকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তবে কেবল তাঁর কবিতা আবৃত্তি করলেই হবে না; তাঁর আদর্শকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে| রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈবষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে| ধর্মের নামে বিভেদ নয়, মানবতার ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে|

নজরুল ছিলেন স্বাধীনতার কবি, গণতন্ত্রের কবি, ন্যায়বিচারের কবি| তিনি যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেখানে মানুষ মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে, শোষণের শিকার হবে না, ধর্মের কারণে বিভক্ত হবে না| সেই স্বপ্ন আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি| কিন্তু তাঁর সাহিত্য আমাদের আশাবাদী হতে শেখায়|

যতদিন সমাজে বৈষম্য থাকবে, যতদিন মানুষ শোষিত হবে, যতদিন অন্যায় থাকবে— ততদিন নজরুলের কবিতা ও সাম্যের বাণী আমাদের পথ দেখাবে| কারণ তিনি কেবল একটি সময়ের কবি নন; তিনি চিরকালীন মানবমুক্তির কবি|

‎২৪ মে ২০২৬, প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী| অবিভক্ত বাংলার (বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) বর্ধমান জেলার আসানসোলের জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের এ দিনে (১৮৯৯ সালের ২৫ মে) জন্মগ্রহণ করেন তিনি| তাঁর ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’| তিনি ছিলেন বাংলা কবিতার একমাত্র বিদ্রোহী ও গানের বুলবুল| তাঁর বাবার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন|

১৯৪১ সালের শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এ কবি| এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসা চলে লু¤ি^নী পার্ক ও রাচি মেন্টাল হাসপাতালে| পরে ১৯৫৩ সালে ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পাঠানো হয় তাঁকে| এই সময়ে একেবারেই বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি| ফলে ১৯৫৩ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় নীরবে-নিভৃতেই কাটে তাঁর জীবন| ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর| নজরুল তাঁর একটি গানে লিখেছেন, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই / যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”|

কবির এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তাঁর সমাধি রচিত হয়| সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম|


তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক : লেখক ও সম্পাদক, স্বর্ণালী সাহিত্য পরিষদ