দেশে কোনো সার সংকট নেই বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকমন্ত্রী আমিন উর রশিদ। সার নিয়ে বর্তমানে যেটুকু সমস্যা হচ্ছে তা আগামী এক মাসের মধ্যে সমাধান হবে।
বৃহস্পতিবার (০৫ নভেম্বর) চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের হোসেনডাইং এলাকায় এক কৃষকের টমেটো ক্ষেত এবং আরেক কৃষকের একটি আমবাগান ও আমবাগানের মধ্যে আদাচাষ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সারের সংকট ছিল না, এখনো সংকট নেই, আগামীতেও সংকট হওয়ার শূন্য দশমিক ১ শতাংশ সম্ভাবনাও নেই। এখানে কিছু শস্যের চাষাবাদ বেড়ে গেছে। যেমন এখন সব জমিতে ধান রয়েছে, ক’দিন পরেই কাটা হবে। ধান কাটার পরে অন্য ফসল চাষাবাদে সার প্রয়োজন হবে। তার মানে, এখন থেকে আরো ২৫ দিন থেকে এক মাস পর। এখন সার সংকট কেন হবে, তা বুঝতে পারছি না। তারপরেও তা জানার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, এই সরকার জনগণের সরকার, এই সরকার কৃষকের সরকার। সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য, কৃষিকে স্বাবলম্বী করা, উৎপাদন বাড়ানো ও রপ্তনিমুখী করা। সুতরাং, সারের যত প্রয়োজন হবে, ততই দেয়া হবে। এর মধ্যে নতুন সারের ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই মাসের জন্য গত মাসে যে পরিমাণ সার দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হবে। এমনটা হলে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে।
এসময় তিনি আরো বলেন, সারের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সাপ্লাই চেইনকেও আমরা বাড়াতে চাই। এখানে প্রতি ইউনিয়নে দুজন করে ডিলার ছিল, এখন তিনজন করা হয়েছে। যেন চাহিদা অনুযায়ী কৃষকরা সহজেই সার পেতে পারে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নীতিমালার বাইরে কোনো সার ডিলার লাইসেন্স পেয়ে থাকলে তা পুনরায় সরকার সিদ্ধান্ত নিবে। লাইসেন্সের ভেতরে একটি শর্ত দেয়া আছে, ৯০ দিন পর্যন্ত কোনোরকম অভিযোগ যদি আসে এবং তা যদি প্রমাণ হয়, তাহলে ডিলারের লাইসেন্স বাতিলও হতে পারে।
পরে মন্ত্রী সেখানে স্থানীয় কৃষকদের সাথে মতবিনিময় সভা করেন।
সভায় বিএনপি সরকার কৃষি ও কৃষকবান্ধব সরকার উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন— বছরে প্রায় দেড় লাখ টন আদা আমদানি করতে হয়, কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। কিন্তু আমাদের কৃষক ভাইদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশেই এবার প্রচুর পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ফলে এবার আর আমদানি করতে হয়নি। সরকার চেষ্টা করছে, কৃষিপণ্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে রপ্তানিমুখী দেশে পরিণত করতে। আমদানি করা হয় এমন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে আমদানি থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
মন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন— আমি মন্ত্রী, পাশাপাশি আমি নিজেও একজন কৃষক। তিনি বলেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলে আম উৎপাদনের পাশাপাশি ড্রাগন চাষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কৃষির সম্ভাবনা আরো কাজে লাগাতে আমবাগানের গাছের মধ্যবর্তী অব্যবহৃত জমিতে আদা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হেেয়ছে। আমি চাই, একটুকরো জমিও যেন পতিত না থাকে।
মন্ত্রী বলেন, আমবাগানের ফাঁকা জায়গায় আদা চাষ বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি কৃষকের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য মাটির উপযোগিতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন তিনি।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে সেচকাজে নদীর পানি ব্যবহারের উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে বলে জানিয়ে কৃষি মন্ত্রী বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ভূগর্ভের পানির ওপর চাপ কমাতে নদী-নালা ও খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। সেই কর্মসূচির কারণে দেশের কৃষক অনেক উপকৃত হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও কৃষকের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁদের উত্তরসূরি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কৃষিকে এগিয়ে নিতে কাজ চলছে।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে আম সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, আমের সংরক্ষণকাল বাড়ানো গেলে মৌসুমে দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হবে। এতে কৃষক তার উৎপাদিত আমের ন্যায্যমূল্য পাবেন।
আম উৎপাদনের উর্বর জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী আরো বলেন, আম রপ্তানি করার জন্য কিছু সিস্টেম ফলো করতে হয়। বিশেষ ধরনের কিছু মেশিন ক্রয় করতে হতো। মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করলে আম পোকামাকড় মুক্ত হবে। ওই মেশিন সরকার স্টোর করে ফেলেছে। আম পাকার আগেই ওই মেশিন চালু হবে। আম রপ্তানির জন্য তারেক রহমানের সরকার যা যা করা দরকার তাই করা হবে। আগামী সিজন থেকে আম রপ্তানি করতে ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলে আর প্রবলেম হবে না।
পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, আদা, রসুন ও বর্ষাকালীন টমেটোর উৎপাদন বাড়াতেও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আগামী মৌসুম থেকে বর্ষাকালীন টমেটো চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেয়া হবে। কৃষিপণ্য আমদানির পরিবর্তে বাংলাদেশকে রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য।
জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন— জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ, কৃষক আতিক উদ্দিন, মাসরুম চাষি কামরুন নাহার ইতি।
এসময় উপস্থিত ছিলেন— কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহপরিচালক আব্দুর রহিম, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়াসহ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।