বৃহস্পতিবার ০৫ নভেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২০শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
Printed on: November 05, 2026
November 05, 2026
উপসম্পাদকীয়
উপসম্পাদকীয়

ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে করারোপ দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব রাখবে

Published: November 05, 2026 at 02:54 PM
ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে করারোপ দেশের  অর্থনীতিতে নেতিবাচক   প্রভাব রাখবে

মো. মোশাররফ হোসেন : 

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা/ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো দৃশ্যমান অবদান রেখে চলছে। ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রতিবেশ ও পরিবেশ উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, সামাজিক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রান্তিক কৃষক সহায়তা, অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, রেমিট্যান্স সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জেন্ডার ইস্যু ইত্যাদি। ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের পরিবর্তে অধিকতর মর্যাদাশীল বিকল্প স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আয় উপার্জন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।

বাংলাদেশের এনজিও সেক্টরকে সাবলীলভাবে কাজ করার জন্য সর্বপ্রথম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিদেশী অনুদান (স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম) নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮ জারি করেন। পরবর্তী সময়ে এনজিওগুলো ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৬ জুলাই ২০০৬ সালে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬ প্রণয়ন করেন। বর্তমানে এ আইনের অধীনে এনজিওগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমকে বেগবান করার লক্ষ্যে, আয়কর আইনে ক্ষুদ্র ঋণের আয়কে কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এ খাতের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম গতিশীল করেন।

ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ৪ দশমিক ৩৯ কোটি গ্রাহক আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং প্রত্যেকের স্ব-কর্মসংস্থান হয়েছে এবং তিন লাখ লোকবলের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ১৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ অবদান রাখছে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের মাধ্যমে অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে সেখানে অবদান প্রায় ২৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ৭৩ শতাংশের বেশি অর্থ জোগান দিচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ ঋণ কৃষি খাতে ও ৩১ শতাংশ ঋণ ক্ষুদ্র ব্যবসাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে তার ৭৩ শতাংশ ঋণগ্রহীতাই ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নে আটটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে চলছে।

কৃষি খাতে নেতিবাচক প্রভাব এবং খাদ্যনিরাপত্তা হ্রাস : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ঋণ খাত কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা এককভাবে কৃষি খাতে বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে সর্বাধিক। ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার গ্রাহকদের মধ্যে প্রতি তিনজনে একজন সরাসরি কৃষি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ গ্রাহকরা বর্গাচাষী বা প্রান্তিক কৃষক এবং এদের গ্রহণকৃত ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা বা তার নিচে। গ্রামীণ জনপদে অপর্যাপ্ত কৃষি ঋণ বিতরণে দেশে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে ও দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার যে লক্ষ্য সরকারের রয়েছে তা ব্যাহত হবে। এক্ষেত্রে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি ও একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়ে যাবে।

ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা ৩ কোটি ৩৭ লাখ গ্রাহককে ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর ধার্য করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর করারোপের কারণে সংস্থাগুলো কর্মী ছাঁটাই ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। ফলস্বরূপ ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানে কর্মী কমে যাওয়ায় ঋণ ও সঞ্চয় কার্যক্রম পরিবীক্ষণ ও তদারকির কাজ বাধাগ্রস্ত হবে এবং সংস্থাগুলো খেলাপি ঋণের ঝুঁকির পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে।

কর্মী স্বল্পতার কারণে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ জনপদে ঋণ বিতরণের চেয়ে বড় ঋণগ্রহীতাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বেড়ে যাবে। ফলে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রান্তিক ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ পরিবার ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এক্ষেত্রে দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি (ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন) প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ব্যাহত হবে এবং সমাজে আয়বৈষম্য বেড়ে যাবে।

নিভৃত পল্লী এলাকায় কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে : সেক্টরের সফলতা হচ্ছে ঋণী গ্রাহকদের সঙ্গে থেকে নিবিড় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ঋণ ব্যবহারকে নিশ্চিত করা। এ নিবিড় মনিটরিংয়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ব্যয়। এক্ষেত্রে কর ধার্য হলে খেলাপি সংস্কৃতি গড়ে উঠবে এবং নিভৃত পল্লী এলাকায় কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়বে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষুদ্র ঋণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে : প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্ষুদ্র ঋণ খাত। এজন্য এ খাতে উদ্বৃত্ত আয় দুর্যোগকালে এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও সামাজিক পুনর্বাসন কাজে ব্যবহার করা হয়। করারোপের ফলে এ কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের ঋণ সমন্বয় করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় প্রবণতা হ্রাস : ক্ষুদ্র ঋণ খাতে সঞ্চয় সংগ্রহ গ্রাহক/সদস্যদের অন্যতম আর্থিক সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। করারোপের ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় করার সক্ষমতা কমে যাবে। ফলে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা কমে যাবে। সঞ্চয় ব্যক্তি পুঁজি ও সম্পদ গঠনের অন্যতম নিয়ামক বিধায় করারোপ করা হলে পুঁজি ও সম্পদ গঠন ব্যাহত হবে এবং বিনিয়োগের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ভ্যাট সংগ্রহ থেকে সরকারি আয় কমে যাবে : ক্ষুদ্র ঋণ খাতে ৪২ শতাংশ গ্রাহক ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় আয় কমে যাবে ও প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের সক্ষমতা কমে যাবে। সাধারণ মানুষের ক্রয় সক্ষমতা কমে গেলে মানুষ পণ্য ক্রয় কম করবে ও সরকার বিভিন্ন পণ্য উৎপাদকের কাছ থেকে যে ভ্যাট/ট্যাক্স আদায় করত তাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সার্বিকভাবে সামাজিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে : ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আয় উদ্বৃত্তের প্রায় ২০ শতাংশ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সরাসরি ব্যয় করে থাকে। করারোপের ফলে ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসব সামাজিক কর্মসূচি কমে আসবে।

বেকারত্ব বৃদ্ধি : গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় ৭৩ শতাংশ অর্থের জোগান আসে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে, যা আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপার্জনের অন্যতম পথ। করারোপ করা হলে ক্ষুদ্র ঋণের প্রবাহ কমার ফলে বিনিয়োগ কমে যাবে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় কমবে এবং কর্মসংস্থান কমে যাবে।

নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে : ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার ৯০ শতাংশ গ্রাহকই নারী। করারোপের ফলে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ায় নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হ্রাস ও নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। এ পরিস্থিতিতে নতুন নারী উদ্যোক্তা নয়, বরং বিগত বছরজুড়ে ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার মাধ্যমে সৃষ্ট নারী উদ্যোক্তারা পুঁজির অভাবে তাদের ব্যবসা/কর্ম সক্ষমতা সংকুচিত করে ফেলবে।

সামাজিক খাত হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার আইনি বাধ্যবাধকতা : এমআরএ আইন ২০০৬-এর ধারা ৩১(১)-এ বলা আছে, ‘ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো লভ্যাংশ প্রদান করিতে পারিবে না।’ এবং ধারা ৩১(২)-এ বলা আছে, ‘উপধারা (১)-এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কর মওকুফ বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অন্য কোনো আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান কোনো লভ্যাংশ বিতরণ করিতে পারিবে না।’ সার্ভিস চার্জ আয়কর মুক্ত থাকায় এ খাত ব্যবসায়িক রূপ ধারণ করেনি। সামাজিক খাত হিসেবে এখনো এটা টিকে আছে এবং ব্যবসায়িক মনোভাবে গড়ে ওঠেনি।

ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকদের সঞ্চয়ের সুদের ওপর কর ধার্যের প্রভাব : ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকরা সঞ্চয় করে তাদের দারিদ্র্য হ্রাস করার জন্য। তাদের কষ্টার্জিত ছোট ছোট টাকা তারা প্রতিষ্ঠানে জমা করে একটু লাভের আশায় এবং পারিবারিক উন্নতির জন্য। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান এগুলো জমা রাখে লাভ-লোকসানের হিসাবে নয়, দারিদ্র্য বিমোচনের স্বার্থে।

অর্থবিল ২০২৪-এর মাধ্যমে আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১০২ সংশোধন করে ‘যেকোনো ধরনের আমানত’-এর বিপরীতে প্রদত্ত সুদ বা মুনাফার ওপর যেকোনো ব্যক্তির জন্য উৎসে কর কর্তনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী বিধানে এ বাধ্যবাধকতা মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।

২০০৬ সালের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন অনুযায়ী, কেবল আমানতকারীরাই ঋণ গ্রহণের সুযোগ পান এবং তারা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণে নিয়মিত সঞ্চয় জমা করেন। এ সঞ্চয়গুলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেমন গ্রামীণ পুঁজি গঠনের একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করা, পরিবারের কারো অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি বা আকস্মিক আয়ের সংকটের সময়ে আমানতকারীর একটি আর্থিক সুরক্ষা বা ‘অনানুষ্ঠানিক বীমা’ হিসেবে সহায়তা প্রদান, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সঞ্চয় সংস্কৃতি ও মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন ইত্যাদি।

ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকদের সঞ্চয়ের সুদের ওপর কর ধার্য করলে যে প্রভাব সেক্টরে পড়বে : নতুন নতুন গ্রাহক এ খাতে আগমন আশঙ্কাজনকভাবে কমবে এবং দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। সঞ্চয় হ্রাসের কারণে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ কমবে। গ্রাহকদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, সংগঠনের প্রতি আস্থার অভাব দেখা দেবে। এর ফলে সঞ্চয়ের পরিমাণ দিন দিন কমে যাবে। এনবিআর অডিট হবে এবং বাড়তি ঝামেলা আসবে সংস্থার ওপর। মাঝারি ও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম হুমকির মধ্যে পড়বে। ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকদের অধিকাংশের আয়ই করমুক্ত আয়সীমার আওতাধীন। ফলে অগ্রিম আয়কর সমন্বয়ের সুযোগ তাদের নেই। পরিবারের কারো অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি বা আকস্মিক আয়ের সংকটের সময়ে আমানতকারীকে আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে সহায়তা প্রদান করতে পারবে না। গ্রামীণ পুঁজি গঠনের একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে না। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সঞ্চয় সংস্কৃতি এবং ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে না। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যদের সঞ্চয়ের প্রকৃতি, পরিমাণ ও সামাজিক উদ্দেশ্য প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংক আমানতের তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আমানতের সুদের ওপর উৎসে কর কর্তনের ফলে সংগৃহীত রাজস্ব আয় সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের তুলনায় অতি নগণ্য। অথচ এ সামান্য পরিমাণ কর আদায়ের ফলে স্বল্প আয়ের গ্রাহকদের মাঝে বিশৃঙ্খলা এবং সঞ্চয়ের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি হবে। একদিকে ক্ষুদ্র ঋণ খাতের তহবিল ঘাটতির কারণে তাদের বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং অন্যদিকে এ উন্নয়ন ঘাটতি মোকাবেলায় উন্নয়ন খাতে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাবে। সদস্য আমানতের ওপর প্রদত্ত সুদের উৎসে করারোপ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।

ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা হচ্ছে দেশের তৃণমূল জনগোষ্ঠী অর্থাৎ দরিদ্র মানুষ। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ তাদের অর্থাৎ তৃণমূল জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন করা। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা অল্প অল্প টাকা এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে জমা রাখে পারিবারিক উন্নতির জন্য। গ্রাহকদের জমাকৃত টাকা বা সঞ্চয়ের সুদের ওপর করারোপ করা হলে তা হবে সরাসরি ৩ কোটি ৬০ লাখ গরিব মানুষের ওপর করের বোঝা হবে, যা রাজনৈতিক সরকারের জন্য হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

পরিশেষে প্রান্তিক কৃষক এবং জনগোষ্ঠীর ক্ষতি, নারী উদ্যোক্তা তৈরি এবং নারী ক্ষমতায়ন হ্রাস, কর্মসংস্থান হ্রাস, কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হ্রাসের কারণে সরকারের ওপর নানাবিধ চাপ তৈরি হবে, যা সরকারের খরচকে প্রকারান্তরে আরো বৃদ্ধি করবে।

সার্বিকভাবে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ট্যাক্সের মাধ্যমে সরকার যে পরিমাণ অর্থ আয় করবে তার থেকে ভ্যাট বাবদ বেশি অর্থ আয় করা সম্ভব হবে। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় সরকারকে দেশের উন্নয়ন খাতে আরো বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।

বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র ঋণবান্ধব। করারোপের ফলে সরকারের দারিদ্র্যবান্ধব ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। ক্ষুদ্র ঋণ খাতে করারোপ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।


মো. মোশাররফ হোসেন : ক্ষুদ্র ঋণ বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মী


[দৈনিক বণিক বার্তা পত্রিকা থেকে]