চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে তে-ভাগা আন্দোলনখ্যাত বিপ্লবী নেত্রী রাণী ইলামিত্রের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। মঙ্গলবার সকালে ইলা-মিত্র স্মৃতি সংসদের আয়োজনে ও এসেডো ও গণস্বাক্ষরতা অভিযান এর সহযোগিতায়, উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের ইলা-মিত্র মট ও সংগ্রহশালা প্রাঙ্গণ থেকে একটি শোক র্যালি বের হয়ে মঞ্চে গিয়ে শেষ হয়। পরে ইলা-মিত্র স্মৃতি সংসদের সভাপতি শ্রী বিধান শিং এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন নাচোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা দাস।
সূচনা বক্তব্য দেন নাচোলের রানী সিনেমার পরিচালক সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দুলাল উদ্দিন খাঁন, বিআরডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ, ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটির কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফী রতন, রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক হরেন্দ্রনাথ শিং, এসেডোর নির্বাহী পরিচালক রবিউল আলম।
এছাড়াও কৃষি অফিসার সলেহ্ আকরাম, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ফারহানা নবী, সমাজসেবা অফিসার সোহেল রানা, এলজিইডির প্রকৌশলী সাদিকুল ইসলাম, দৈনিক গৌড় বাংলা পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ও লেখক সাজিদ তৌহিদ, এসেডোর ম্যানেজার আজাহার আলী, সাংবাদিক একেএম জিলানীসহ উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম।
আলোচনা শেষে ইলা মিত্র স্মৃতি সংসদের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন প্রধান অতিথি নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা দাসকে।
ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী এবং শোষিত কৃষকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক ইলামিত্র। ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে কলকাতায় এই মহীয়সী নারী মৃত্যুবরণ করেন। প্রতি বছরই বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রয়াণ দিবসটি বিনম্র শ্রদ্ধায় ও গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন মালদহ ও রাজশাহী অঞ্চলের (বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে) সাঁওতাল আদিবাসী ও প্রান্তিক কৃষকদের জমি ও ফসলের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য তিনি তেভাগা আন্দোলনে ঐতিহাসিক নেতৃত্ব দেন। ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ কৃষকদের দেওয়ার দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন শোষক জমিদার ও তৎকালীন জোতদারদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। সাঁওতাল ও সাধারণ কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জন্য অসীম ত্যাগের কারণে কৃষকরা তাকে ভালোবেসে ‘রানী মা’ বলে ডাকতেন। ১৯৫০সালে নাচোল বিদ্রোহের পর স্থানান্তর হওয়ার সময় তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তৎকালীন পাকিস্তান পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন তাঁর ওপর চালানো হয় লোমহর্ষক ও অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। আদালতে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলেও ১৯৫৪ সালে অসুস্থতার কারণে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য কলকাতায় চলে যান এবং পরবর্তীতে সেখানেই স্থায়ী হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ইলা-মিত্র ভারতে অবস্থান করেই বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন এবং শরনার্থী শিবিরের জন্য নানা ধরনের ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি একজন কৃতী ক্রীড়াবিদও ছিলেন এবং ১৯৪০ সালের অলিম্পিক গেমসের জন্য নির্বাচিত প্রথম বাঙালি নারী অ্যাথলেট ছিলেন, যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেই অলিম্পিক বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া তিনি ভারতের আইনসভার (পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা)র সদস্য হিসেবেও একাধিকবার নির্বাচিত হন।