শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৩রা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৫ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
সদর থানা পুলিশের অভিযান : চুরি হওয়া তিনটি মোটরসাইকেল উদ্ধার আন্তঃজেলা চোর চক্রের ৬ জন গ্রেপ্তার শিবগঞ্জে ৫৯ বিজিবির অভিযানে ৮৪৮টি চোরাচালানি পণ্যসহ জব্দ ১৩৫ মোবাইল ফোন সেট চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৬৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ি বাড়ি যাওয়া শুরু করেছে গঠিত টিম আইসিসির মাসসেরা ক্রিকেটার হলেন দিনুশা ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করছে ইইউ সুইজারল্যান্ডে বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ৩ ডিজিটাল হচ্ছে টিসিবি মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়নের সুফল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে : হাফেজদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর দেশ বিদেশের সম্পদের তথ্য চায় দুদক
Printed on: September 18, 2026
September 17, 2026
সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

পারস্পরিক হিংসার ভয়াবহতা

Published: September 17, 2026 at 12:18 PM
পারস্পরিক হিংসার ভয়াবহতা

মো. আরিফুল ইসলাম


হিংসা একটি ধ্বংসাত্মক কুঅভ্যাস। মানুষকে কলুষিত করার জন্য এই একটি বদঅভ্যাসই যথেষ্ট। তাই তো দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে আমরা কত বিচিত্র স্বভাবের মানুষই না দেখতে পাই! আমাদের মধ্যে এমন অনেক লোকও আছেন, যারা অন্যের ভালো একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। অন্যের ভালো কিছু দেখলে হিংসায় জ্বলে-পুড়ে একাকার হয়ে যান। 

মানবজাতির এই হিংসা প্রবণতা এক প্রকার ব্যাধি; যা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক পাপের কাজ, অবশ্যই বর্জনীয় এবং সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে সুরা ফালাকের ৫নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর (আমি আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।’ এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সন্দেহ নেই, হিংসা নেক আমলগুলোর নূর ও আলোকে নিভিয়ে দেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ- ৪৯০৬) 

এছাড়াও হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) হতে বর্ণিত নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের বিদ্বেষ করো না, হিংসা করো না, ষড়যন্ত্র করো না ও সম্পর্ক ছিন্ন করো না। বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও, পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (বুখারি- ৬০৭৬, মুসলিম- ২৫৫৯, জামে তিরমিজি- ১৯৩৫)

মানুষের অন্যতম খারাপ অভ্যাস হলো অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা। ইসলামে হিংসা বা বিদ্বেষ পোষণকারীকে খুবই নিকৃষ্ট চোখে দেখা হয়েছে। তাই তো হজরত আবু হুরাইরাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— তোমরা অবশ্যই হিংসা পরিহার করবে। কারণ আগুন যেভাবে কাঠকে বা ঘাসকে খেয়ে ফেলে, তেমনি হিংসাও মানুষের নেক আমলকে খেয়ে ফেলে। (আবু দাউদ- ৪৯০৩]

হজরত দিমরাহ ইবনে সা’লাবাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতদিন তারা পরস্পর হিংসা না করবে।’ (ইমাম হায়সামী মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৮১)

মানুষ হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকুক এবং মানবসমাজে সামাজিক শান্তি-সম্প্রীতি বজায় থাকুক এটাও আল্লাহতায়ালার একান্ত অভিপ্রায়। তাই তো তিনি কোরআনের সুরা আন-নিসার ৫৪নং আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন, সে জন্য কি তারা তাদের ঈর্ষা করে?’ একজন প্রকৃত ইমানদার ব্যক্তি কখনো হিংসার বশবর্তী হতে পারেন না।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— সে মুসলিম জাহান্নামে একত্রিত হবে না যে কোনো কাফিরকে হত্যা করেছে, এরপর সঠিক ও সরল পথে দৃঢ় রয়েছে। আর কোনো মুমিনের পেটে আল্লাহর রাস্তার ধুলা এবং জাহান্নামের তাপ একত্রিত হবে না। আর আল্লাহর বান্দার অন্তরে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হবে না। (সুনানে নাসায়ী- ৩১০৯]

মানুষের বদভ্যাস সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, তিনটি বদভ্যাস আছে, যা থেকে কেউ মুক্ত নয়। ১. কু-ধারণা, ২. হিংসা, ও ৩. অশুভ ফলাফলে বিশ্বাস। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, এসব থেকে মুক্ত থাকার উপায় কী? তিনি বললেন, ‘কারো প্রতি কু-ধারণা এলে তা বিশ্বাস না করা, হিংসার উদ্রেক হলে প্রকাশ না করা আর কাজ থেকে ফিরে না আসা।’ (ইমাম হায়সামী মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

হিংসা এমন একটি খারাপ অভ্যাস যা মানুষের নৈতিক চরিত্র তো ধ্বংস করেই তার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতিগুলোকেও ধ্বংস করে দেয়। তাই তো নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা দ্বীন ধ্বংস করে দেয়।’ (তিরমিজি)

যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— তোমাদের আগেকার উম্মতদের রোগ তোমাদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। তা হলো পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা। আর এই রোগ মুণ্ডন করে দেয়। আমি বলছি না যে, চুল মুণ্ডন করে দেয়, বরং এটা দ্বীনকে মুণ্ডন (বিনাশ) করে দেয়। (তিরমিজি- ২৫১০)

হিংসুকরা আল্লাহর নিয়ামতের শত্রু, গোটা মোমিনের শত্রু। তাই তো রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিয়ামতের শত্রু আছে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর নিয়ামতের শত্রু কারা? রাসুল (সা.) বললেন, ‘হিংসুকরা। হিংসুক তো এজন্যই হিংসা করে— আল্লাহ কেন তার বান্দাকে অনুগ্রহ করেছেন।’ (দাওয়াউল হাসাদ)

এছাড়াও ইমাম বাকির (রহ.) বলেন, ‘হিংসা ইমানকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয়।’ (আল কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা-৩০৬, হাদিস নং-১) 

হিংসার পরিণাম সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (রহ.) বলেন, ‘একে অপরের সঙ্গে হিংসা করা থেকে বিরত থাকো, কেননা হিংসা হলো কুফরের ভিত্তিস্বরূপ।’ (আল কাফি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা-৮, হাদিস নং-১) হিংসুক বান্দাদের আল্লাহতায়ালা ক্ষমা করবেন না আর ইহকাল ও পরকালে তাদের পরিণতি ভয়াবহ। তাই তো নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘অর্ধ শাবানের রাতে (অর্থাৎ শবে বরাতে) আল্লাহতায়ালা তার সব সৃষ্টিকেই ক্ষমা করে দেন। তবে তিনি মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা করেন না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ- ১৩৯০)

পরিশেষে বলা যায় যে, হিংসা মানুষের একটি আত্মিক রোগ। যা মরণব্যাধির চেয়েও ভয়ংকর। এই হিংসাই মানবাত্মাকে দূষিত ও কলুষিত করে এবং সব নেক আমলকে নষ্ট করে দেয়। অতএব, সব মানব সন্তানেরই হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা অবশ্য কর্তব্য।


মো. আরিফুল ইসলাম : লেখক