তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে রিকশা ও ছোট যানবাহনের সম্পর্ক বহুদিনের। শহর থেকে গ্রাম, বাজার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল থেকে বাসাবাড়ি— স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে রিকশা সাধারণ মানুষের অন্যতম নির্ভরতার বাহন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্যাডেলচালিত রিকশার পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। স্বল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো এবং তুলনামূলক সহজে চলাচলের সুবিধার কারণে এই বাহনের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে।
তবে সুবিধার পাশাপাশি এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের নগরজীবনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার ব্যস্ত সড়ক, বাজার, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজের আশপাশ এবং সরু অলিগলিতে বেপরোয়া গতিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রশ্ন হলো— ব্যাটারিচালিত রিকশা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে, নাকি নিয়মের মধ্যে এনে নিরাপদ করা সম্ভব? বাস্তবতা বিবেচনায় দ্বিতীয় পথটিই বেশি কার্যকর। কারণ, এই বাহনের সঙ্গে শুধু যাত্রীদের যাতায়াত নয়, বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালকদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে বাড়ছে চাপ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের পরিধি খুব বড় নয়। অল্প দূরত্বের মধ্যে বাজার, সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে দিনের ব্যস্ত সময়ে সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যখন বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা যুক্ত হয়, তখন অনেক সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও রিকশা হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করছে, কোথাও আবার একাধিক রিকশা পাশাপাশি চলাচল করছে। অনেক সময় সামনে পথচারী বা অন্য যানবাহন থাকলেও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো একটি জেলাশহরের সড়কব্যবস্থায় এ ধরনের আচরণ দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
প্রশিক্ষণহীন চালক বড় ঝুঁকি
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো, চালকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি। অনেক চালক যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই রাস্তায় যানবাহন চালাচ্ছেন। ফলে ট্রাফিক আইন, নিরাপদ দূরত্ব, পথচারী পারাপার, বাঁক নেয়া, ওভারটেকিং এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার আশঙ্কা থাকে। একজন চালকের সামান্য ভুলের কারণে একটি পরিবারের জীবনে নেমে আসতে পারে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ। একজন পথচারী আহত হতে পারেন, কোনো শিক্ষার্থী দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে কিংবা একজন মোটরসাইকেল আরোহীর জীবন বিপন্ন হতে পারে।
তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জে ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। প্রশিক্ষণ শেষে দক্ষতা যাচাই করে অনুমোদিত পরিচয়পত্র বা লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, কতজন চালক এর সঙ্গে যুক্ত— এ বিষয়ে সঠিক তথ্য থাকা জরুরি। নিবন্ধন ও পরিচয়ব্যবস্থা না থাকলে কোনো দুর্ঘটনা বা অপরাধের পর সংশ্লিষ্ট চালক ও মালিককে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন এবং প্রত্যেক চালকের পরিচয় ও প্রশিক্ষণের তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। নিবন্ধনবিহীন ও অনুমোদনহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এতে একদিকে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে চালকদের জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।
ব্যাটারিচালিত রিকশা মূলত স্বল্প দূরত্বের যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চালকরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালাচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের ব্যস্ত বাজার, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ এবং আবাসিক এলাকায় অতিরিক্ত গতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে শিশুরা স্কুল থেকে বের হওয়ার সময়, বয়স্ক মানুষ রাস্তা পার হওয়ার সময় কিংবা বাজার এলাকায় পথচারীর ভিড়ের মধ্যে দ্রুতগতির রিকশা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তাই এলাকাভেদে সর্বোচ্চ গতি নির্ধারণ করা উচিত। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গতি আরো কম রাখতে হবে।
ব্রেক ও যান্ত্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
যানবাহনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্রেক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। কিন্তু পুরোনো, নিম্নমানের বা ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা যানবাহনের ব্রেক নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা চালু করা যেতে পারে। ব্রেক, টায়ার, স্টিয়ারিং, বৈদ্যুতিক সংযোগ, ব্যাটারি, মোটরসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করে নিরাপদ যানবাহনকেই রাস্তায় চলাচলের অনুমতি দেওয়া উচিত। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন মেরামত না করা পর্যন্ত রাস্তায় নামানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের সব সড়কের ধরন এক নয়। কিছু সড়ক ব্যস্ত, কিছু সড়ক সরু, আবার কিছু সড়ক তুলনামূলক প্রশস্ত। তাই সব জায়গায় একই নিয়ম প্রয়োগ না করে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করা যেতে পারে। শহরের প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় কিংবা অতিরিক্ত যানজটপূর্ণ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বিকল্প সংযোগ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে যানজট কমবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের ভিড় থাকে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পায়ে হেঁটে কিংবা রিকশায় যাতায়াত করে। এসব এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গতি সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
হাসপাতালের সামনে অযথা হর্ন বাজানো, দ্রুতগতিতে চলাচল এবং রাস্তার ওপর যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ করা দরকার। একইভাবে স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
আমের মৌসুমে বাড়তি সতর্কতা দরকার
চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আম উৎপাদনকারী অঞ্চল। আমের মৌসুমে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিপুল পরিমাণ আম বাজার ও মোকামে আসে। আম পরিবহন, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও ক্রেতাদের চলাচলের কারণে এ সময় সড়কে যানবাহনের চাপও বেড়ে যায়। বিশেষ করে আমের মৌসুমে বাজার ও আড়ত এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করলে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।
তাই আমের মৌসুমকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।
সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু যানবাহনের ওপর নির্ভর করে না; চালকের আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রী বা পথচারীর সঙ্গে খারাপ আচরণ, তর্কে জড়িয়ে পড়া, হর্নের অপব্যবহার, অন্য যানবাহনকে অযথা বাধা দেওয়া কিংবা সামান্য বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠা— এসব আচরণ সড়কের পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তোলে। তাই চালকদের কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি আচরণগত প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। তাদের বোঝাতে হবে— সড়কে একজন চালক শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্য দায়ী নন; তার হাতে যাত্রী, পথচারী ও অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীর জীবনও অনেকাংশে নির্ভরশীল।
কখনো কোনো যানবাহন বা চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সাধারণ মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন না। একইভাবে কোনো চালকও পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী কিংবা অন্য কোনো যানবাহনের চালকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে হামলা করতে পারেন না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে কোনো চালক আইন ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো নাগরিকের সঙ্গে চালকের বিরোধ হলে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে— চালক ও সাধারণ মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই।
জনগণকেও সচেতন হতে হবে
ব্যাটারিচালিত রিকশার সমস্যা সমাধানে শুধু প্রশাসনকে দায়ী করলে চলবে না। সাধারণ জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। যাত্রীদের উচিত, নিরাপদ ও অনুমোদিত বাহন ব্যবহার করা। চালক অতিরিক্ত গতিতে চালালে তাকে সতর্ক করা উচিত। শিশুকে একা অনিরাপদ যানবাহনে না পাঠানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করা এবং চলন্ত অবস্থায় ওঠানামা না করার বিষয়েও জনগণকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রচারণা চালানো যেতে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষ করে গম্ভীরা এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, সমাজ ও সচেতনতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে গম্ভীরা, পথনাটক, গণসংগীত, আলোচনা সভা ও সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। এসব কর্মসূচিতে চালক, যাত্রী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পথচারী, সাংবাদিক ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের যুক্ত করা যেতে পারে।
সচেতনতার ভাষা যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সড়ক ব্যবস্থাপনায় তত বেশি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আইন প্রয়োগও জরুরি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাজার এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে লাইসেন্সবিহীন চালক, নিবন্ধনবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও অন্যান্য ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তবে অভিযান যেন হয় নিয়মতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। শুধু জরিমানা আদায় নয়, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই হতে হবে অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।
যে ব্যাটারিচালিত রিকশা যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন জব্দ করে মালিককে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামত করার সুযোগ দিতে হবে। যদি কোনো পুরোনো রিকশাকে নিরাপদ মানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হয়, তাহলে সেটিকে ধীরে ধীরে চলাচল থেকে প্রত্যাহার করার পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে যারা অনুমোদনহীন বা নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে যানবাহনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছেন, তাদের বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
চালকদের জীবিকার কথাও ভাবতে হবে
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যেন হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ হঠাৎ করে বেকার হয়ে না পড়েন, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। যদি কোনো রুটে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট চালকদের বিকল্প রুট, বিকল্প যানবাহন বা প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে প্যাডেলচালিত রিকশায় রূপান্তরের সুযোগও রাখা যেতে পারে।
কারণ, একজন চালককে শুধু শাস্তি দেওয়া নয়; তাকে নিরাপদ ও বৈধ জীবিকার পথে ফিরিয়ে আনাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
অনেকে বলেন, রিকশা গরিব মানুষের বাহন। কথাটি বাস্তবতার একটি অংশ হলেও এর অর্থ এই নয় যে, গরিব মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত কোনো যানবাহনকে নিয়মের বাইরে রাখা হবে। একজন রিকশাচালকের যেমন জীবিকার অধিকার রয়েছে, তেমনি একজন পথচারীর নিরাপদে রাস্তা চলার অধিকারও রয়েছে। একজন যাত্রীর নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর অধিকার আছে। একজন মোটরসাইকেল আরোহীরও নিরাপদে চলাচলের অধিকার রয়েছে। তাই সমাধান হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের এখনই সময়। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন, ট্রাফিক বিভাগ, পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংগঠন, চালক-মালিক সমিতি, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে বসে একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
নীতিমালায় থাকতে পারে—
০১. চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই।
০২. চালকদের পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ব্যবস্থা।
০৩. প্রতিটি যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস পরীক্ষা।
০৪. এলাকাভেদে সর্বোচ্চ গতি নির্ধারণ।
০৫. ব্যস্ত সড়কে নির্দিষ্ট রুট ও সময়সূচি প্রণয়ন।
০৬. স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও বাজার এলাকায় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ।
০৭. অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধ করা।
০৮. নিম্নমানের ব্যাটারি, মোটর ও যন্ত্রাংশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।
০৯. নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ট্রাফিক অভিযান পরিচালনা।
১০. চালকদের আচরণগত প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং।
১১. জনগণের মধ্যে ব্যাপক সড়ক নিরাপত্তা সচেতনতা তৈরি।
১২. আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কঠোর ও ন্যায়সংগত শাস্তি নিশ্চিত করা।
এখনই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়ক শুধু যানবাহনের জন্য নয়; এই সড়ক কৃষকের, শ্রমিকের, শিক্ষার্থীর, ব্যবসায়ীর, রোগীর, বৃদ্ধের এবং সাধারণ মানুষের। একটি শহর তখনই বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন তার রাস্তায় মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে। ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে, নাকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে নিরাপদ করা হবে— এ সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। তবে যে পথই বেছে নেয়া হোক, সিদ্ধান্ত হতে হবে তথ্য, বাস্তবতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থী ও রোগীদের চলাচল এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার কথা বিবেচনা করেই সমাধান খুঁজতে হবে।
‘রিকশা মানেই গরিবের বাহন’— এই ধারণার আড়ালে যেমন অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না, তেমনি রিকশাচালক মানেই অপরাধী— এমন ধারণাও তৈরি করা যাবে না।
আমাদের দরকার নিরাপদ সড়ক, নিয়ন্ত্রিত যানবাহন এবং দায়িত্বশীল চালক। আজ যদি আমরা সমস্যাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি, তাহলে আগামী দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়ক হতে পারে আরো নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক। আর যদি সমস্যাকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে ছোট ছোট অনিয়ম একসময় বড় দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে আর সিদ্ধান্তহীনতা নয়— প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়ক হবে সবার জন্য নিরাপদ— এই প্রত্যাশাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক ও সম্পাদক, স্বর্ণালী সাহিত্য পরিষদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ