শনিবার ২৯ আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৪ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
দেবীনগর গোসলে নেমে এক সাথে প্রাণ গেল ৫ কন্যা শিশুর : এলাকায় শোকের ছায়া এসএসসি ও সমমানের মেধাবীদের সংবর্ধনা ছাত্র শিবিরের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট : শুক্রবারের খেলায় ৫-১ গোলে জয় সদর উপজেলার নাচোলে পৃথক স্থানে মিনিবার ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত নেপালের বন্যা ও ভূমিধস আমাদের যে সতর্কবার্তা দিয়ে গেল বার্ড ফ্লু আশঙ্কায় সাব-অ্যান্টার্কটিক গবেষণাকেন্দ্র থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেবে অস্ট্রেলিয়া নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলায় ৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের সহায়তা চাইল রেড ক্রস হাইস্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করলো ফ্রান্স নরওয়ের রাজা হ্যারাল্ড আর নেই নেপালে বন্যাকবলিত স্থানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪৭
Printed on: August 29, 2026
August 28, 2026
সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

নেপালের বন্যা ও ভূমিধস আমাদের যে সতর্কবার্তা দিয়ে গেল

Published: August 28, 2026 at 12:35 PM
নেপালের বন্যা ও ভূমিধস আমাদের যে সতর্কবার্তা দিয়ে গেল

*তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক*


একটি মানবিক অনুভব ও আমাদের দায়বোধের কথা

প্রতিবেশী নেপালের বুকজুড়ে সাম্প্রতিক যে ভয়াবহতার দৃশ্য আমরা দেখলাম, তা শুধু চোখে পানি এনে দেয় না-হৃদয়ের গভীরে এক ধরনের আতঙ্ক, অসহায়ত্ব এবং গভীর মানবিক বোধের জন্ম দেয়। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা-সবকিছু যেন প্রবল জলস্রোত ও কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে গেল। কেউ হারালেন বাবা-মাকে, কেউ সন্তানকে, কেউ জীবনসঙ্গীকে, কেউবা প্রিয়জনের কোনো সন্ধানই এখনও পাচ্ছেন না।

২৬ আগস্ট হিমালয়ের উচ্চভূমিতে বরফ ও শিলার বিশাল ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক প্রবাহ নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও কাদামাটির স্রোত তৈরি করে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে ছুটে যায় জনবসতির দিকে। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকার অসংখ্য চিহ্ন। নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ চললেও এখনও অনেক মানুষ নিখোঁজ।

এই দৃশ্য দেখে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে-মানুষ আসলে কতটা অসহায়?

আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে বাস করি। স্যাটেলাইট আছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস আছে, উন্নত প্রযুক্তি আছে, হেলিকপ্টার আছে, ড্রোন আছে, উদ্ধারকারী দল আছে। তবুও প্রকৃতির এক ভয়ংকর মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে কখনো কখনো মনে হয়, সে যেন কিছুই নয়।

সংবাদমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখি-‘এতজন নিহত’, ‘এতজন নিখোঁজ’, ‘এতগুলো বাড়ি বিধ্বস্ত’, ‘এত কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত’। সংখ্যাগুলো প্রয়োজনীয়। দুর্যোগের ব্যাপ্তি বোঝাতে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে যে একটি করে জীবন রয়েছে, সেটি আমরা অনেক সময় ভুলে যাই।

একজন নিহত মানে একটি পরিবারে একজন মানুষ আর নেই।

একজন নিখোঁজ মানে একটি পরিবার দিনের পর দিন দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে।

একটি বিধ্বস্ত ঘর মানে শুধু ইট-পাথরের ক্ষতি নয়; সেখানে হয়তো ছিল বহু বছরের সংসার, বিয়ের স্মৃতি, সন্তানের শৈশব, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শেষ আশ্রয়।

একটি ভেসে যাওয়া দোকান মানে একজন মানুষের বছরের পর বছর পরিশ্রমের ফল হারিয়ে যাওয়া।

একটি ধ্বংস হওয়া রাস্তা মানে শুধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়; এর অর্থ হতে পারে আহত মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারা, খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছাতে দেরি হওয়া, কিংবা কোনো পরিবারের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে না পারা।

তাই নেপালের এই দুর্যোগের প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি গল্প। প্রতিটি নিখোঁজ মানুষ একটি অপেক্ষা।

প্রতিটি উদ্ধার হওয়া মানুষ একটি অলৌকিক প্রত্যাবর্তন। আর প্রতিটি মরদেহ একটি পরিবারের জন্য চিরস্থায়ী শোক।

আজ নেপালের মানুষ বিপর্যস্ত। আজ তাদের ঘরে শোক। আজ তাদের অনেক পরিবার জানে না তাদের প্রিয়জন কোথায়। আজ তাদের অনেক মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছে। আজ তাদের উদ্ধারকর্মীরা জীবন বাজি রেখে ধ্বংসস্তূপে মানুষ খুঁজছেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রথম অনুভূতি হওয়া উচিত-মানবিকতা। কার মানুষ, কোন দেশের মানুষ, কোন ধর্মের মানুষ, কোন ভাষায় কথা বলে-দুর্যোগের মুহূর্তে এসব পরিচয় গৌণ হয়ে যায়।


প্রকৃতি কি আমাদের সতর্ক করছে?

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-এটি আমাদের হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তনশীল পরিবেশের দিকে নতুন করে তাকাতে বাধ্য করছে।

বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে হিমবাহ ধস ও তার পরবর্তী বরফ-পাথরের প্রবাহকে এই ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও হিমবাহের পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।

হিমালয় শুধু নেপালের পাহাড় নয়।

হিমালয় দক্ষিণ এশিয়ার একটি বিশাল প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবলয়।

এই পর্বতমালা থেকে অসংখ্য নদীর উৎপত্তি। ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন নদী ও পানির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।

তাই হিমালয়ের কোনো পরিবর্তন শুধু পাহাড়ের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না।

তার প্রভাব নদীতে পড়ে। তার প্রভাব কৃষিতে পড়ে। তার প্রভাব পানির নিরাপত্তায় পড়ে। তার প্রভাব জনজীবনে পড়ে। এমনকি তার প্রভাব আমাদের মতো সমতল দেশের মানুষের জীবনেও পৌঁছে যেতে পারে।

সুতরাং নেপালের এই দুর্যোগকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের বৃহত্তর পরিবেশগত বাস্তবতার একটি সতর্ক সংকেতও হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন-শুধু আলোচনার বিষয় নয়

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমরা বহু বছর ধরে আলোচনা করছি। আন্তর্জাতিক সম্মেলন হচ্ছে।

বক্তৃতা হচ্ছে। গবেষণা হচ্ছে। প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যখন অস্বাভাবিক বন্যা, ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস, হিমবাহের পরিবর্তন এবং আকস্মিক দুর্যোগ বাড়তে থাকে, তখন বুঝতে হয়-জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের ভবিষ্যৎ নয়। এটি বর্তমানের বাস্তবতা।

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় আমাদের আবারও সেই বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

পাহাড়ের সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে ভয়াবহ ঝুঁকি। খাড়া ঢাল, সরু নদী উপত্যকা, দুর্বল ভূপ্রকৃতি, হঠাৎ নদীর পানি বৃদ্ধি, ভূমিধস এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা-সব মিলিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

হিমালয়ের বরফ যদি দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তার প্রভাব শুধু পাহাড়ি অঞ্চলে থাকবে না। নদীর আচরণ পরিবর্তিত হতে পারে, আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, পাহাড়ি জনপদ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


উদ্ধারকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা

যখন আমরা ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দায় ধ্বংসের দৃশ্য দেখি, তখন হয়তো কয়েক মিনিটের জন্য আমাদের চোখে পানি আসে।

কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে যারা প্রবেশ করেন, তাদের কাজ কতটা কঠিন-তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। উদ্ধারকর্মীরা জানেন না সামনে কী আছে। তারা জানেন না মাটির নিচে কেউ জীবিত আছে কি না। তারা জানেন না পরবর্তী মুহূর্তে আবার ভূমিধস হবে কি না।

নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ, স্থানীয় উদ্ধারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ মানুষ যারা জীবন ঝুঁকিতে ফেলে অন্যকে উদ্ধারে এগিয়ে এসেছেন-তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

দুর্যোগের সময় মানবতার সবচেয়ে সুন্দর চেহারাটি আমরা প্রায়ই এই মানুষগুলোর মধ্যেই দেখতে পাই। নিখোঁজ মানুষের পরিবারের কথা আমরা কি ভাবছি?

মৃত্যুর সংবাদ ভয়াবহ। কিন্তু নিখোঁজ থাকার যন্ত্রণা অনেক সময় আরও দীর্ঘ। মৃত্যুর খবর অন্তত একটি সত্যকে সামনে আনে। কিন্তু নিখোঁজ মানুষ মানে অনিশ্চয়তা। তাই নিখোঁজ মানুষদের পরিবারের কষ্টকে আমরা যেন শুধু সংবাদ হিসেবে না দেখি। তাদের মানসিক সহায়তা প্রয়োজন। তাদের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। তাদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ প্রয়োজন।

নেপালের দিকে তাকিয়ে শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। বাংলাদেশও দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা আমাদের পরিচিত। ঘূর্ণিঝড় আমাদের পরিচিত। নদীভাঙন আমাদের পরিচিত। পাহাড়ধসও আমাদের জন্য অপরিচিত নয়।

বিশেষ করে দেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং পাহাড়ের পাদদেশের মানুষ বর্ষাকালে ভূমিধসের ঝুঁকিতে থাকেন। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির পর ভূমিধসের ঘটনা আমরা বহুবার দেখেছি। তাই নেপালের দুর্যোগ আমাদের জন্যও একটি শিক্ষা।

আমাদের প্রশ্ন করতে হবে-

আমাদের পাহাড়গুলো কি নিরাপদ?

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি কি নিয়ন্ত্রিত?

দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা কি দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে?

স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর?

উদ্ধারকারী দলের সক্ষমতা কতটা?

হাসপাতালগুলো কি বড় দুর্যোগ সামলানোর জন্য প্রস্তুত?

সাধারণ মানুষ কি জানেন ভূমিধস বা আকস্মিক বন্যার সময় কী করতে হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

কারণ দুর্যোগের পর উদ্ধারকাজের চেয়ে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি অনেক বেশি জীবন বাঁচাতে পারে।

প্রযুক্তি আমাদের রক্ষা করতে পারে-যদি আমরা তাকে কাজে লাগাই। আধুনিক প্রযুক্তি দুর্যোগ মোকাবিলায় বিপ্লব ঘটাতে পারে।

স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, ড্রোন, রিয়েল-টাইম নদীর পানি পর্যবেক্ষণ। বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস। ভূমিধসের ঝুঁকি মানচিত্র। হিমবাহ পর্যবেক্ষণ। মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা। জিপিএস-ভিত্তিক উদ্ধারব্যবস্থা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ঝুঁকি বিশ্লেষণ। এসব প্রযুক্তি এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়।

প্রশ্ন হলো-আমরা এগুলো কতটা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি?

একটি সতর্কবার্তা যদি পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছে যায়, হয়তো একটি পরিবার ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদ জায়গায় যেতে পারে। একটি নদীর পানি বাড়ার খবর যদি সময়মতো পাওয়া যায়, হয়তো বাজারের মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারে।

একটি পাহাড়ধসের ঝুঁকি যদি আগেই চিহ্নিত করা যায়, হয়তো একটি বসতি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো-‘সময়’। কয়েক মিনিটও কখনো একটি জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

আমাদের উচিত আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি তৈরি করা প্রকৃতির দুর্যোগ কখনো পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না।

কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। এ জন্য প্রয়োজন সচেতনতা।

প্রয়োজন পরিকল্পনা। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল। প্রয়োজন জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা। প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র। প্রয়োজন দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা। প্রয়োজন দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক সহায়তা। আমরা প্রায়ই দুর্যোগের সময় আবেগপ্রবণ হয়ে উঠি। ত্রাণ সংগ্রহ করি।

ছবি তুলি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করি। এগুলো প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শুধু ত্রাণ দেওয়ার বিষয় নয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা হলো-দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, দুর্যোগের সময় দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং দুর্যোগের পর মানুষের পুনর্বাসন। এই তিনটি স্তরকে শক্তিশালী করতে না পারলে আমরা প্রতিবারই একই জায়গায় ফিরে আসব।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের দায়িত্ব

বর্তমান সময়ে কোনো দুর্যোগের খবর মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়।

এটি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি বিপজ্জনকও।

একটি সঠিক ছবি মানুষকে সচেতন করতে পারে।

একটি যাচাই করা তথ্য উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু একটি মিথ্যা খবর আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।

ভুয়া মৃত্যুসংবাদ কোনো পরিবারকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে পারে।

পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে দেওয়া মানুষের সহানুভূতিকে বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই নেপালের এই বিপর্যয়ের সময় আমাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

কোনো ছবি বা তথ্য শেয়ার করার আগে যাচাই করতে হবে।

নিখোঁজ মানুষের ছবি শেয়ার করলে তথ্যের উৎস উল্লেখ করতে হবে। উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি করে এমন সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

দুর্যোগকে বিনোদনের উপকরণ বানানো যাবে না।

মানুষের কান্না কোনো কনটেন্ট নয়।

মানুষের মৃত্যু কোনো ‘ভিউ’ নয়।

মানুষের বিপর্যয় কোনো ‘লাইক’ পাওয়ার মাধ্যম নয়।

নেপালের জন্য আমাদের প্রার্থনা

আজ নেপালের জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়তো খুব সাধারণ-প্রার্থনা।

যে পরিবারগুলো প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের জন্য প্রার্থনা।

যারা এখনও নিখোঁজ, তাদের নিরাপদে ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা।

যারা আহত, তাদের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা।

যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রার্থনা।

যারা উদ্ধারকাজে নিয়োজিত, তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা।

যারা প্রিয়জনের সন্ধানে দিন-রাত অপেক্ষা করছেন, তাদের ধৈর্যের জন্য প্রার্থনা।

প্রার্থনা কখনো দুর্যোগের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দিতে পারে না-কিন্তু বিপর্যস্ত মানুষের হৃদয়ে আশা জাগাতে পারে।

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় যেন আমাদের সেই পুরোনো সত্যটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

আমরা প্রকৃতির মালিক নই। আমরা প্রকৃতির অংশ।

প্রকৃতিকে বুঝতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বসতি গড়তে হয়। পাহাড় কেটে রাস্তা বানাতে হলে পরিবেশগত ঝুঁকি বুঝতে হয়। নদীর গতিপথের প্রতি সম্মান দেখাতে হয়। বন ধ্বংসের পরিণতি বুঝতে হয়। হিমবাহ ও পাহাড়ি জলাধারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হয়। মানুষ যত বেশি প্রকৃতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করবে, প্রকৃতিও কোনো না কোনো সময় তার শক্তি দেখাবে।


আজ নেপাল, আগামীকাল কে?

এই প্রশ্নটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমরা নেপালের ছবি দেখছি। কাল অন্য কোনো দেশের ছবি দেখতে হতে পারে। অথবা আমাদের নিজেদের দেশেরও। দুর্যোগ কোনো পাসপোর্ট দেখে আসে না। কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত দেখে নদীর পানি থেমে থাকে না। ভূমিধস কোনো প্রশাসনিক সীমানা মানে না। বায়ুমণ্ডল কোনো দেশের একার সম্পত্তি নয়। তাই জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর বিলাসিতা নয়-প্রয়োজন।

হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তথ্য ভাগাভাগি করতে হবে। নদী ও হিমবাহ পর্যবেক্ষণে সহযোগিতা করতে হবে। আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে আন্তঃদেশীয় করতে হবে।

দুর্যোগের সময় দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ একটি দেশের দুর্যোগ অনেক সময় অন্য দেশের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

আমরা যেন এই দৃশ্য ভুলে না যাই, দুর্যোগের দৃশ্য আমরা কয়েক দিন দেখব। সংবাদমাধ্যমে খবর চলবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হবে। তারপর নতুন কোনো ঘটনা এসে পুরোনো ঘটনাকে আড়াল করবে। কিন্তু নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে এই দুর্যোগ কখনো পুরোনো হবে না। কারও সন্তান আর ফিরবে না। কারও ঘর আর থাকবে না। কারও জীবিকা আর আগের মতো হবে না। কারও মনে নদীর শব্দ শুনলেই আতঙ্ক ফিরে আসবে। তাই আমাদের উচিত এই ঘটনাকে শুধু কয়েক দিনের সংবাদ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা।


পরিশেষে বলতে চাই: মানুষের পাশে মানুষ

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ-সম্পর্কিত বিপর্যয় আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরেছে-মানুষ যতই শক্তিশালী মনে করুক নিজেকে, প্রকৃতির সামনে সে এখনও অসহায়। কিন্তু এই অসহায়তার মধ্যেও মানুষের একটি শক্তি আছে। সেটি হলো-মানবতা।

একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বাঁচাতে পারে। একজন অপরিচিত মানুষের জন্য রক্ত দিতে পারে। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দিতে পারে। একজন নিখোঁজ মানুষের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারে। একটি দেশ আরেকটি দেশের পাশে দাঁড়াতে পারে। আর কোটি মানুষ একসঙ্গে প্রার্থনা করতে পারে। আজ নেপালের জন্য আমাদের হৃদয় কাঁদছে।

হিমালয়ের বুক থেকে নেমে আসা সেই ভয়ংকর স্রোত শুধু মাটি, পাথর আর ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেয়নি-আমাদের সামনে রেখে গেছে অনেকগুলো প্রশ্ন।

  1. আমরা কি প্রস্তুত?
  2. আমরা কি প্রকৃতিকে যথেষ্ট সম্মান করছি?
  3. আমরা কি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বুঝছি?
  4. আমরা কি আমাদের পাহাড়, নদী ও পরিবেশকে রক্ষা করছি?
  5. আমরা কি দুর্যোগের আগেই মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি?
  6. আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-একজন বিপন্ন মানুষের জন্য আমরা কি যথেষ্ট মানবিক?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে আজই।

কারণ দুর্যোগ কখনো বলে আসে না। কখনো মেঘের আড়ালে আসে। কখনো পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। কখনো নদীর শান্ত স্রোতের নিচে তার ভয়ংকর শক্তি জমা হয়। আর কখনো হিমালয়ের কোনো বরফঢাকা চূড়া থেকে হঠাৎ নেমে আসে মৃত্যুর স্রোত। আমরা হয়তো সেই স্রোত থামাতে পারব না।

কিন্তু আগাম প্রস্তুতি নিয়ে অনেক জীবন বাঁচাতে পারি। আমরা হয়তো হারানো মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারি। আমরা হয়তো ধ্বংস হওয়া ঘর মুহূর্তে পুনর্নির্মাণ করতে পারব না। কিন্তু একটি আশ্রয় দিতে পারি। আমরা হয়তো নেপালের সব মানুষের কষ্ট দূর করতে পারব না।কিন্তু তাদের বলতে পারি-আপনারা একা নন।

বাংলাদেশের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, একজন প্রতিবেশী হিসেবে তাই আজ আমার একটাই প্রার্থনা-হে আল্লাহ, নেপালের বিপর্যস্ত মানুষদের রক্ষা করুন।

যারা নিখোঁজ, তাদের জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন। যারা আহত, তাদের দ্রুত সুস্থতা দান করুন। যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের এই অসহনীয় শোক সহ্য করার শক্তি দিন।

উদ্ধারকর্মীদের নিরাপদ রাখুন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘর, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের পথ সহজ করে দিন। আর আমাদের সবাইকে শিক্ষা দিন-প্রকৃতির শক্তিকে অবহেলা না করতে, পরিবেশকে ভালোবাসতে এবং বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। নেপালের পাহাড় আজ হয়তো কাঁদছে।

কিন্তু সেই কান্না যেন আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। আমরা যেন শুধু চোখের পানি ফেলেই থেমে না যাই।

আমরা যেন প্রস্তুত হই। সচেতন হই। মানবিক হই। প্রকৃতিকে সম্মান করি এবং মনে রাখি-

মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার দেশ নয়, তার ধর্ম নয়, তার ভাষা নয়; মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়-সে একজন মানুষ।

নেপালের বিপন্ন মানুষের জন্য আমাদের হৃদয়, আমাদের সহমর্মিতা এবং আমাদের প্রার্থনা রইল।

আল্লাহ নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের হেফাজত করুন।নিখোঁজদের নিরাপদে ফিরিয়ে দিন।

নিহতদের আত্মার শান্তি দান করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে ধৈর্য দিন।  আমিন।

লেখক পরিচিতি: তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক, প্রাবন্ধিক,কলাম লেখক ও ব্যবসায়ী, সম্পাদক, স্বর্ণালী সাহিত্য পরিষদ,চাঁপাইনবাবগঞ্জ।