বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২রা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৪ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
অ্যালগরিদমের খাঁচায় বন্দি প্রজন্ম : ডিজিটাল আসক্তি ও অনলাইন জুয়ার বিপরীতে মানবিক পুনর্গঠন প্রজননস্থল ধ্বংসে বাড়ি বাড়ি যাবে টিম, প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ : ডেঙ্গু মশা নিধন বিষয়ক মতবিনিময় সভায় সিদ্ধান্ত মহারাজপুরে র‌্যাবের অভিযান : ১০ ককটেল ও গানপাউডার সদৃশ গুঁড়া উদ্ধার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র‌্যালি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান স্থানীয় সরকার নির্বাচন : জেলা পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ শুরু বিদায়ী ম্যাচ খেলতে জাতীয় দলে ডাক পেলেন মেসি অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন জ্যোতি কাউন্টিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখালেন খালেদ আহমেদ সুদানে সোনার খনি ধসে নিহত ৬০ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে ভারতসহ ১০ দেশ
Printed on: September 17, 2026
September 16, 2026
সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

অ্যালগরিদমের খাঁচায় বন্দি প্রজন্ম : ডিজিটাল আসক্তি ও অনলাইন জুয়ার বিপরীতে মানবিক পুনর্গঠন

Published: September 16, 2026 at 01:47 PM
অ্যালগরিদমের খাঁচায় বন্দি প্রজন্ম : ডিজিটাল আসক্তি ও অনলাইন জুয়ার  বিপরীতে মানবিক পুনর্গঠন

গৌতম কুমার বিশ্বাস

পুলিশ সুপার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ, গতিশীল ও বিশ্বসংযুক্ত করেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, প্রশাসনিক কাজ কিংবা জরুরি যোগাযোগ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্মার্টফোন আজ অপরিহার্য। কিন্তু সংকট তৈরি হয়েছে তখনই, যখন মানবকল্যাণে সৃষ্ট এই প্রযুক্তি আমাদের চিন্তা ও আচরণের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। আপাতদৃষ্টিতে যা ব্যক্তিগত অভ্যাসের খামখেয়ালিপনা মনে হয়, তা আসলে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের রূপ নিয়েছে। শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে সীমাহীন স্ক্রিন নির্ভরতা এবং অনলাইন জুয়ার বিপজ্জনক বিস্তার আজ তাদের শিক্ষাজীবন, পারিবারিক শান্তি ও মানবিক ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ডোপামিন ফিডব্যাক লুপ ও আসক্তির মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ

পড়াশোনা বা বাস্তব জীবনের যে কোনো লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য, গভীর মনোযোগ ও নিরবচ্ছিন্ন শ্রম। অথচ মোবাইল গেম, টিকটক-রিলসের মতো ক্ষুদ্র ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও আনন্দ উপহার দেয়। অ্যালগরিদমের এই ‘ইনফিনিট স্ক্রোল’ এবং লাইক-কমেন্টের সাময়িক স্বীকৃতি মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ বাড়িয়ে একধরনের আচরণগত নির্ভরতা তৈরি করে। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘক্ষণ নীল আলোর (Blue Light) সংস্পর্শ স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত করে এবং শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক উৎপাদনশীলতা প্রায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে। চোখের মারাত্মক ক্ষতি থেকে শুরু করে শারীরিক ও মানসিক স্থবিরতা— সবই এই ডিজিটাল বন্দিত্বের অনিবার্য পরিণতি।

শিক্ষাজীবন থেকে পারিবারিক দূরত্বের গভীর ক্ষত

একই ছাদের নিচে পরিবার বসে আছে, কিন্তু প্রত্যেকে নিবিষ্ট নিজের মোবাইলের স্ক্রিনে— এ দৃশ্য এখন প্রায় প্রতিটি ঘরের। মুখোমুখি কথা বলার স্থান দখল করেছে ভার্চুয়াল জগৎ, যা ধীরে ধীরে পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা কেড়ে নিচ্ছে। পরিবারে পর্যাপ্ত সময়, মনোযোগ ও মানসিক আশ্রয় না পেয়ে সন্তানরা ঝুঁকছে অবাস্তব সম্পর্কের দিকে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে বুঁদ থাকার কারণে তাদের বাস্তব জীবনের যোগাযোগ দক্ষতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক অভিযোজন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অনলাইন জুয়ার চোরাবালি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি

মোবাইল অপব্যবহারের সবচেয়ে অন্ধকার ও সর্বনাশা রূপ হলো, অনলাইন জুয়ার বিস্তার। বিভিন্ন চটকদার অ্যাপ ও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। শুরুতে সামান্য অর্থ দিয়ে শুরু হলেও হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার মরিয়া চেষ্টায় তৈরি হয় এক সর্বগ্রাসী চক্র। প্রথমে নিজের পকেট খরচ, পরে পরিবারের সঞ্চয় ভাঙা, ধারদেনা এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ জোগাড় করতে চুরি, প্রতারণা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পথে পা বাড়াচ্ছে সম্ভাবনাময় তরুণরা। এই জুয়ার পরিণতি কেবল একটি তরুণের ভবিষ্যৎকে নয়, বরং বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাস্তব চিত্র : নির্মম কিছু সতর্কবার্তা

ডিজিটাল আসক্তি কোনো দূরবর্তী তাত্ত্বিক বিষয় নয়; আমাদের চারপাশেই এর ট্র্যাজিক উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে টয়লেটের সেপটিক ট্যাংকে পড়ে যাওয়া ফোন তুলতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে যুবকের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়— মোবাইলের মোহে মানুষ নিজের জীবনকেও তুচ্ছজ্ঞান করছে। অন্যদিকে সদর উপজেলায় পরিবারের কাছে ফোন চেয়ে না পেয়ে কিংবা গোমস্তাপুরে অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মা ফোন কেড়ে নেয়ায় অভিমানে আত্মহত্যার মতো বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।

এসব ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে, শুধু শাসন, তিরস্কার কিংবা হঠাৎ ডিভাইস কেড়ে নিয়ে এই আসক্তি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এতে হিতে বিপরীত হয়ে কিশোররা চরম আত্মঘাতী পথ বেছে নিতে পারে। সংকট নিরসনে প্রয়োজন গভীর সহমর্মিতা, পারিবারিক খোলামেলা যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক দিকনির্দেশনা।

পরিত্রাণের উপায় : মানবিক সমাজ ও ডিজিটাল সচেতনতা

আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা অবাস্তব ও অযৌক্তিক। প্রয়োজন প্রযুক্তির সচেতন, নিয়ন্ত্রিত ও ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করা। এর জন্য সম্মিলিতভাবে কয়েকটি ক্ষেত্রে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি—

* সক্রিয় ডিজিটাল অভিভাবকত্ব : সন্তানদের একাকী ডিভাইসের হাতে ছেড়ে না দিয়ে তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। ডিভাইস কেড়ে নেয়ার বদলে অভিভাবকের উচিত একসঙ্গে মানসম্মত কনটেন্ট দেখা (Co-use) এবং স্ক্রিন ব্যবহারে সুস্থ শৃঙ্খলা তৈরি করা।

* ডিজিটাল মিনিমালিজম ও স্ক্রিন-ফ্রি জোন : শোবার ঘরে রাতে স্ক্রিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং খাওয়ার টেবিলে ফোন ব্যবহারে লাগাম টানতে হবে। প্রতিটি রাতকে স্ক্রিনমুক্ত রেখে সুস্থ ঘুম নিশ্চিত করা মানসিক স্বাস্থ্যের প্রথম শর্ত।

* সুস্থ বিকল্প ও সামাজিক নিরাময় : মাঠের খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক আড্ডার সুযোগ বাড়াতে হবে। বাস্তব জীবনের আনন্দময় বিকল্প না দিলে তরুণরা আবার ভার্চুয়াল জগতে ফিরে যাবেই।

* অনলাইন জুয়া ও অপরাধে শূন্য সহনশীলতা : শর্টকাটে সফলতার ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে যে, মেধা ও যোগ্যতাই সফলতার একমাত্র পথ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনকে সাইবার নিরাপত্তা ও অনলাইন প্রতারণার বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। জুয়ায় আসক্ত কাউকে একঘরে না করে দ্রুত পেশাদার কাউন্সিলিং বা আইনি সহায়তার আওতায় আনা প্রয়োজন।

প্রযুক্তি থাকবে আমাদের হাতে, আমরা যেন প্রযুক্তির বন্দি না হই

প্রযুক্তি মানুষের দাস হওয়ার কথা ছিল, প্রভু হওয়ার নয়। আমাদের সন্তানদের হাতে শুধু একটি স্ক্রিন তুলে দিলে চলবে না, তুলে দিতে হবে একটি নিরাপদ ও আলোকিত ভবিষ্যৎ। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সমগ্র দেশের প্রতিটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের প্রতি আহ্বান— আমাদের সন্তানদের কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য নয়, বরং আত্মমর্যাদাশীল, সংবেদনশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। পারিবারিক সচেতনতা এবং সামষ্টিক সামাজিক ঐক্যই পারে এই অ্যালগরিদমের অন্ধকার ফাঁদ থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে।