মো. আরিফুল ইসলাম
ভূমিকা
জুমআ’র দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা মুসলমানদের নিকট সাপ্তাহিক ঈদ। এটি সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে এই দিন ছুটি থাকে। মানুষ মনে করে, শুক্রবার মানে অবসর দিবস। আবার কেউ মনে করে জুমআ’র দিন মানে বেড়ানোর দিন। তবে একজন মুমিন ব্যক্তির কাছে জুমআ’র দিন ও রাত বিশেষ ইবাদতের দিন। সে সকালে উঠে জামায়াতে ফজর সালাত আদায় করে নাস্তা করে আবারো মসজিদ পানে দৌড়াবে। আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে, নিজের পাপ মোচনের জন্য বা আল্লাহর রহমত লাভের আশায়। মাগরিব পর্যন্ত জোর চেষ্টা চালাবে নিজেকে ক্ষমা করিয়ে নিতে বা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে। অবসর দিন ভেবে এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটিকে সে হেলায় কাটাবে না।
জুমআ’র দিনে আল্লাহতাআলা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সমাধা করেছেন। সপ্তাহের সর্বোত্তম দিন হলো জুমআ’র দিন। এ দিনে আদম (আ.)কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। এ দিনে তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে (দুনিয়ায় পাঠিয়ে) দেয়া হয়েছে। আর কিয়ামতও এ জুমআ’র দিনেই কায়েম হবে। (মুসলিম- ৮৫৪; মিশকাত- ১৩৫৬)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমআ’র দিন। সুতরাং ঐ দিন তোমরা আমার ওপর অধিকমাত্রায় দরুদ পড়। কেননা তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়। লোকেরা বলল, হে রাসুল! আপনি তো (মারা যাওয়ার পর) পচে-গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের দরুদ কীভাবে আপনার কাছে পেশ করা হবে? তিনি বললেন, ‘আল্লাহ পয়গম্বরদের দেহসমূহকে খেয়ে ফেলা মাটির ওপর হারাম করে দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ- ১০৪৭; নাসাঈ- ১৩৭৪).
সর্বোপরি জুমআ’র দিন কেবল ছুটির দিন নয়, এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি দিন।
মুমিনের নিকট জুমআ’র দিনের গুরুত্ব ও ফজিলত
জুমআ’র দিন মূলত ইবাদত পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের দিন। এই দিনে ইবাদতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। আল্লাহতাআলা এই দিনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুনিয়াবী কাজ গুটিয়ে নিয়ে ইবাদতে মনোনিবেশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহতাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যখন জুমআ’র দিন সালাতের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ।’ (জুমআ- ৬২/০৯)
জুমআ’র দিনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেন, ‘লোকেরা যেন জুমআ ত্যাগ করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকে; নচেৎ আল্লাহ অবশ্যই তাদের অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেবেন, তারপর তারা অবশ্যই উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।’ (মুসলিম- ৮৬৫; মিশকাত- ১৩৭০)
তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি অলসতা ও অবহেলা করে পরপর তিন জুমআ’র সালাত ছেড়ে দিবে, আল্লাহতাআলা তার অন্তরে মোহর বা তালা লাগিয়ে দেবেন।’ (আবু দাউদ- ১০৫২; মিশকাত- ১৩৭১)
তিনি আরো বলেন, ‘জুমআ’র সালাত আদায় করতে আসে না এমন একদল লোক সম্পর্কে নবী (সা.) বললেন, ‘আমার ইচ্ছা হয় যে, কোনো ব্যক্তিকে সালাতে ইমামতি করার নির্দেশ দেই আর আমি গিয়ে যারা জুমআ’র সালাত আদায় করতে আসে না, আগুন লাগিয়ে তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেই।’ (মুসলিম- ৬৫২)
জুমআ’র দিনের ফজিলত
জুমআ’র দিনের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সূর্য উদিত হয়েছে এমন দিনসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো জুমআ’র দিন। এ দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এদিন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় এবং এদিন তাকে সেখান থেকে বের করা হয়। আর কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে না জুমআ’র দিন ব্যতীত।’ [মুসলিম- ৮৫৪)
তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ এবং জ্বিন ব্যতীত এমন কোনো প্রাণী নাই, যে প্রাণী জুমআ’র দিন ভোরবেলা হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ভয়ে চিৎকার করে না।’ (ইবনু হিববান- ২৭৭২)
জুমআ’র বিশেষ কিছু ফজিলত নিম্নে আলোকপাত করা হলো
১. জুমআ’র দিনে একাধিক সৎ আমলে জান্নাতবাসীর অন্তর্ভুক্তি
জুমআ’র দিন এত ফজিলতপূর্ণ একটি দিন যে, এই দিনে পাঁচটি আমল করতে পারলে আল্লাহতাআলা তাকে জান্নাতবাসী হিসাবে গণ্য করবেন। যেমন রাসুল (সা.) বলেন, ‘পাঁচটি আমল যে একই দিনে করবে, আল্লাহতাআলা তার নাম জান্নাতবাসীদের মধ্যে লিখে দিবেন।’
ক. যে রোগীর সেবা করল,
খ. যে কারো জানাজায় উপস্থিত হলো,
গ. যে সিয়াম পালন করল,
ঘ. জুমআ’র দিনে মসজিদে গেল এবং
ঙ. একজন দাস মুক্ত করল। [ইবনু হিববান- ২৭৭১]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, ‘পাঁচটি আমল যে একই দিনে করবে আল্লাহতাআলা তার নাম জান্নাতবাসীদের মধ্যে লিখে দিবেন; যে জুমআ’র দিনে সিয়াম পালন করবে, জুমআ’র জন্য মসজিদে যাবে, জানাজায় উপস্থিত হবে, রোগীর সেবা করবে ও একজন দাস মুক্ত করবে।’ [ আবু ইয়ালা- ১০৪৪]
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যে আমলগুলো করবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। [আবু ইয়ালা- ১০৪৩]
২. জুমআ’র দিন আল্লাহর নিকট মহান দিন
জুমআ’র দিন দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন। যেমন রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমআ’র দিন সকল দিনের সর্দার, সব দিনের চেয়ে বড় ও আল্লাহর নিকট বড় মর্যাদাবান। এ দিনটির পাঁচটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে— ১. আল্লাহতাআলা এ দিনে আদমকে সৃষ্টি করেছেন। ২. এ দিনে তিনি আদমকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ৩. এ দিনেই আদম মৃত্যুবরণ করেছেন। ৪. এ দিনে এমন একটা ক্ষণ আছে, সে ক্ষণে বান্দারা আল্লাহর কাছে হারাম জিনিস ছাড়া আর যা কিছু চায় তা তিনি তাদেরকে দান করেন। ৫. এ দিনেই কিয়ামত হবে। আল্লাহর নিকটবর্তী মালাক (ফেরেশতা), আসমান, জমিন, বাতাস, পাহাড়, সাগর সবই এই জুমআ’র দিনকে ভয় করে।’ [ইবনু মাজাহ- ১০৮৪]
৩. জুমআ আদায়কারীর জন্য আলোকবর্তিকা
যারা জুমআ’র সালাত আদায় করবে তাদের জন্য এই জুমআ কিয়ামতের দিন নূর বা আলো হবে। আর এই আলোতে সে পুলসিরাত পার হবে। জুমআ’র দিনকে সাপ্তাহিক ঈদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। জুমআ’য় উপস্থিত হওয়ার যেমন বিশেষ ফজিলত রয়েছে, তেমনি এতে উপস্থিত হয়ে সালাত আদায় করা আল্লাহর নূর অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। যেমন রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতাআলা কিয়ামতের দিনসমূহকে নিজ অবস্থায় উত্থিত করবেন। তবে জুমআ’র দিনকে আলোক-উজ্জ্বল ও দ্বীপ্তিমান করে উত্থিত করবেন। জুমআ আদায়কারীগণ আলো দ্বারা বেষ্টিত থাকবে যেমন নতুন বর বেষ্টিত থাকে, যা তাকে প্রিয়জনের অভিমুখী করে। তারা আলোক বেষ্টিত থাকবে এবং সেই আলোতে চলবে। তাদের রং হবে বরফের মতো উজ্জ্বল ও সুগন্ধি হবে কাফূরের পর্বত থেকে সিঞ্চিত মিশকের মতো। তাদের দিকে জিন ও মানুষ তাকাতে থাকবে। তারা আনন্দে দৃষ্টি ফেরাতে না ফেরাতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের সাথে একনিষ্ঠ সওয়াবপ্রত্যাশী মুয়াজ্জিন ছাড়া কেউ মিশতে পারবে না।’ [হাকেম- ১০২৭; ইবনু খুযায়মাহ- ১৭৩০]
৪. জুমআ মুসলমানদের জন্য নেয়ামত, যা থেকে ইহুদি-নাসারারা বঞ্চিত
জুমআ’র দিন মুসলমানদের জন্য বড়ই নেয়ামত। এতে যত কল্যাণের সমাবেশ ঘটেছে অন্য কোনো দিনে ঘটেনি বা ঘটবেও না। এই দিনের প্রার্থনায় বড় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া য়ায়। কল্যাণকর কিছু চাওয়া হলে তা পাওয়া যায়।
যেমন হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘একদা জিবরাইল (আ.) আমার নিকট আসলেন। তখন তার হাতে একটি স্বচ্ছ সাদা আয়না ছিল। যার মধ্যে একটি কালো দাগ ছিল। আমি বলললাম, হে জিবরাইল (আ.) এটা কী? তিনি বললেন, এটা জুমআ, আপনার রব এটা আপনার নিকট উপস্থাপন করেছেন, যাতে এই দিন আপনার ও আপনার পরবর্তী লোকদের জন্য ঈদ হয়ে যায়। পরকালে আপনিই অগ্রগামী আর ইহুদি-নাসারারা পশ্চাৎগামী। তিনি বললেন, এতে আমাদের জন্য লাভ কী? জিবরাইল (আ.) বলেন, এতে অনেক কল্যাণ রয়েছে। এই দিনে একটি মুহূর্ত রয়েছে, এ সময়ে যে তার রবের নিকট কোনো কল্যাণের জন্য দোয়া করবে আর যদি তার ভাগ্যে তা থাকে তাহলে তিনি তাকে অবশ্যই তা দিবেন। আর যদি ভাগ্যে নাও থাকে তাহলে তার জন্য তার থেকে অনেক মূল্যবান কিছু জমা রাখা হবে। আর যদি সে কোনো অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে আর তার ভাগ্যে লেখা থাকে তাহলে তার থেকেও বড় বিপদ থেকে তিনি তাকে রক্ষা করবেন। তিনি বললেন, এই কালো দাগটা কীসের? তিনি বললেন, এটি হলো কিয়ামত যা জুমআ’র দিনে কায়েম হবে। আমাদের নিকট এটিই শ্রেষ্ঠ দিন। আমরা পরকালে এই দিনকে ‘ইয়াওমুল মাজিদ’ বলে জানব।’ [ছহীহুত তারগীব- ৩৭৬১]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আল্লাহ আমাদের পূর্বের উম্মতগুলোকে পথভ্রষ্ট করেছেন জুমআ’র ব্যাপারে। ইহুদিদের ছিল শনিবার ও নাসারাদের ছিল রবিবার। আর আল্লাহ আমাদেরকে শুক্রবারের জন্য পথপ্রদর্শন করেন। অতএব শুক্রবারের পর শনি ও রবিবার হওয়ার কারণে তারা আমাদের পেছনে পড়ে গেছে। ফলে দুনিয়াতে আমরা পেছনের উম্মত হলেও কিয়ামতের দিন আমরা প্রথমে থাকব। সৃষ্টিজগতের সকলের পূর্বে আমাদের হিসাব শেষ করা হবে।’ [মুসলিম- ৮৫৬; নাসাঈ- ১৩৬৮]
আরেকটি হাদিসে আরো সুন্দরভাবে এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমরা সবশেষে আগত উম্মত, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা হবো সর্বাগ্রবর্তী। আমরাই প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করব। অথচ তাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে আমাদের পূর্বে এবং আমাদেরকে তা দেয়া হয়েছে তাদের পরে। তারা বিরোধে লিপ্ত হয়ে পড়ল কিন্তু তারা যে সত্য দীনের ব্যাপারে বিরোধে লিপ্ত হয়েছিল, আল্লাহ আমাদেরকে সে দিন সম্পর্কে হেদায়েত দান করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের জন্য আজকে জুমআ’র দিন আর ইহুদিদের জন্য পরের দিন এবং খৃষ্টানদের জন্য তারও পরের দিন।’ [বুখারী- ৮৯৬; মুসলিম- ৮৫৫]
৫. কুরবানির সওয়াব লাভের দিন
জুমআ’র দিন সওয়াব লাভের দিন। এই দিনে সালাতের উদ্দেশ্যে আগেভাগে মসজিদে গমনে অসংখ্য সওয়াব রয়েছে, যা সীমাহীন। যেমন রয়েছে বছরব্যাপী সিয়াম-কিয়ামের ফজিলত তেমনি রয়েছে উট, গরু, দুম্বা কুরবানির সওয়াব বা মুরগি ও ডিম দানের সওয়াব। রাসুল (সা.) বলেন, যে দিনের ওপর সূর্যোদয় বা অস্ত যায় সে দিনগুলোর মধ্যে জুমআ’র দিনই সর্বশ্রেষ্ঠ। মানুষ এবং জিন ব্যতীত এমন কোনো প্রাণী নাই, যে প্রাণী জুমআ’র দিন ভোরবেলা হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ভয়ে চিৎকার করে না।’ [ইবনু হিববান- ২৭৭২]
জুমআ’র দিনে মসজিদের প্রত্যেক দরজায় ফেরেশতাগণ বসে থাকেন, তারা মর্যাদা অনুসারে মানুষের নাম লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। ফলে কতক মানুষ সেই তালিকায় উট কুরবানিকারীর ন্যায়, কতক মানুষ গরু কুরবানিকারীর ন্যায়, কতক মানুষ বকরি কুরবানিকারীর ন্যায়, কতক মানুষ ভেড়া সাদকাকারীর ন্যায়, কতক মানুষ চড়ুই/মুরগি সাদকাকারীর ন্যায় এবং কতক মানুষ ডিম সাদাকাকারীর ন্যায়।’ [আহমাদ- ৭৬৭৩; নাসাঈ- ১৩৮৭]
৬. মুসলমানদের তৃতীয় ঈদ
জুমআ’র দিন মুসলমানদের তৃতীয় ঈদ। যদিও ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা অপেক্ষা জুমআ’র দিন উত্তম। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে জুমআ’র আগমন থাকায় বাহ্যিক দৃষ্টিতে গুরুত্ব কম মনে হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ এই দিনকে মুসলিমদের ঈদের দিনরূপে নির্ধারণ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি জুমআ’র সালাত আদায় করতে আসবে সে যেন গোসল করে এবং সুগন্ধি থাকলে তা শরীরে লাগায়। আর মিসওয়াক করাও তোমাদের কর্তব্য।’ [ইবনু মাজাহ- ১০৯৮]
৭. প্রতি কদমে এক বছরের সিয়াম ও তাহাজ্জুদ সালাতের সওয়াব লাভ
জুমআ’র সালাতের জন্য পায়ে হেঁটে মসজিদে আগমনে প্রতি কদমের জন্য এক বছরের সিয়াম ও এক বছরের তাহাজ্জুদ সালাত আদায়ের সওয়াব পাওয়া যায়। যেমন রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গোসল করল এবং গোসল করাল, সকাল সকাল মসজিদে আসল, ইমামের নিকটবর্তী হয়ে মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শুনল এবং নিশ্চুপ থাকল তার জন্য প্রতি কদমের বিনিময়ে এক বছরের (নফল) সিয়াম ও সালাতের সওয়াব রয়েছে।’ [আবু দাউদ- ৩৪৫; নাসাঈ- ১৩৯৮]
৮. কবরের আজাব বা ফিৎনা থেকে মুক্তি
জুমআ’র দিনের বিশেষ ফজিলতের কারণে কেউ এর দিনে বা রাতে মারা গেলে সে কবরের ফিৎনা থেকে রক্ষা পাবে। যেখানে নবী-রাসুল ও শহীদগণ ব্যতীত প্রত্যেক মানুষই কবরের ফিৎনায় নিপতিত হবে। কিন্তু জুমআ’র দিনের বিশেষ ফজিলতের কারণে এই দিনে মারা গেলে সে কবরের ফিৎনা থেকে রক্ষা পেতে পারে। রাসুল (সা.) বলেন, যদি কোনো মুসলিম জুমআ’র দিন অথবা জুমআ’র রাতে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে আল্লাহতাআলা তাকে কবরের ফিৎনা থেকে রক্ষা করবেন।’ [আহমাদ, তিরমিযী- ১০৭৪]
৯. সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ সালাত
জামায়াতে সালাত আদায় করা ওয়াজিব। বিশেষত, ফজর ও এশার সালাত জামায়াতে আদায়ের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এই জামায়াত যদি জুমআ’র দিনের ফজরের সালাতে হয় তাহলে সেই সালাত সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ সালাত। যেমন ইবনু ওমর (রা.) হিমরান ইবনু আবানকে বললেন, তোমাকে জামায়াতে সালাত আদায়ে কীসে বাধা দিল? সে বলল, আমি জুমআ’র দিনে ফজরের সালাত জামায়াতে আদায় করেছি। তখন তিনি বললেন, তোমার নিকট কি একথা পৌঁছেনি যে, নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম সালাত জুমআ’র দিনে জামায়াতে আদায়কৃত ফজরের সালাত।’ [বায়হাকী, শু’আবুল ঈমান- ৩০৪৫]
১০. গুনাহ মাফের দিন
জুমআ’র দিন হলো গুনাহ মাফের দিন। মানুষ নিজের অজান্তে অনেক ছোট ছোট গুনাহ করে ফেলে। জুমআ’র দিনে বিশেষ ফজিলতের কারণে আল্লাহতাআলা এই গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমআ থেকে আরেক জুমআ এবং এক রমজান থেকে আরেক রমজান, তার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য কাফফারা হয়ে যাবে যদি কাবিরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে।’ [ মুসলিম- ৩৩]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ওজু করবে এবং উত্তমভাবে ওজু করবে, তারপর জুমআ’র সালাতে যাবে, চুপচাপ খুৎবা শুনবে, তাহলে তার এই জুমআ হতে অপর জুমআ পর্যন্ত সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে, অধিকন্তু আরো তিন দিনের। আর যে ব্যক্তি খুৎবার সময় ধূলাবালি নাড়ল, সে অর্থহীন কাজ করল।’ [মুসলিম- ৮৫৭]
১১. দোয়া কবুলের দিন
জুমআ’র দিন দোয়া কবুলের দিন। এই দিনে একটি মুহূর্ত আছে যখন দোয়া করলে আল্লাহ সে দোয়া কবুল করেন। এই সময়ের ব্যাপারে মতপার্থক্য থাকলেও বিশুদ্ধ মতে সময়টি আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত। যেমন রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমআ’র দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, যখন কোনো মুসলিম বান্দা সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করলে অবশ্যই তিনি তাকে তা দান করেন।’ কুতায়বা (রা.)-এর বর্ণনায় আরো আছে, ‘তিনি তার হাত দ্বারা মুহূর্তটির স্বল্পতার প্রতি ইঙ্গিত করেন।’ [মুসলিম- ৮৫২]
১২. দোয়া কবুলের সময়
দোয়া কবুলের সময় নিয়ে ইখতিলাফ রয়েছে। তবে সাহাবায়ে কেরামের অধিকাংশই আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তবে যেহেতু ইখতিলাফ আছে, সেজন্য এই দিনের সময়গুলোতে দোয়া করে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে। যেমন হাদিসে এসেছে, আবু মুসা আল-আশ’আরী (রা.) বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তোমার পিতাকে রাসুল (সা.) থেকে জুমআ’র দিনের বিশেষ মুহূর্তটি সম্পর্কে হাদিছ বর্ণনা করতে শুনেছ?’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমি বললাম, হ্যাঁ। আমি পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (সাঃ)কে বলতে শুনেছি, ইমামের বসা থেকে সালাত শেষ করার মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে সে মুহূর্তটি নিহিত।’ [মুসলিম- ৮৫৩]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমআ’র দিনের বারো ঘণ্টার মধ্যে একটি বিশেষ মুহূর্ত আছে, তখন কোনো মুসলিম আল্লাহর নিকট যে দোয়া করে আল্লাহ তা-ই কবুল করেন। তোমরা এই মুহূর্তটিকে আসরের পরে অনুসন্ধান করো।’ [আবু দাউদ- ১০৪৮]
অন্য আরেকটি হাদিছে দোয়ার পদ্ধতি ও সময় সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বসে থাকা অবস্থায় আমি বললাম, আমরা আল্লাহর কিতাবে জুমআ’র দিনের এমন একটি মুহূর্ত সম্পর্কে উল্লেখ পেয়েছি যে, সেই মুহূর্তে কোনো মুমিন বান্দা সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করলে, তিনি তার প্রয়োজন পূরণ করেন। আব্দুল্লাহ বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার দিকে ইশারা করে বললেন, এক ঘণ্টা সামান্য সময় মাত্র। আমি বললাম, আপনি যথার্থই বলেছেন, এক ঘণ্টা সামান্য সময়ই। আমি বললাম, সেটি কোন মুহূর্ত? তিনি বলেন, সেটি হলো দিনের শেষ মুহূর্ত। আমি বললাম, তা সালাতের সময় নয়? তিনি বলেন, হ্যাঁ। মুমিন বান্দা এক সালাত শেষ করে বসে বসে অন্য সালাতের প্রতীক্ষায় থাকলে সে সালাতের মধ্যেই থাকে।’
জুমআ’র দিনে আমাদের করণীয়
জুমআ’র দিন ও রাত উভয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য রাতে ঘুমানোর সময় সুরা মুলক পাঠ করে ঘুমাবে। এরপরে ফজরের সময় উঠে জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করবে। অতঃপর মসজিদেই জিকির-আজকার করে সূর্যোদয় হলে জোহা বা ইশরাকের সালাত আদায় করবে। এরপর বাসাবাড়িতে সকালের নাশতা করে আবার জুমআ’র মসজিদে রওয়ানা দিবে। মসজিদে বা বাড়িতে সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে। অতঃপর সাধ্যানুযায়ী ইমামের খুৎবার পূর্ব পর্যন্ত নফল সালাত, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ বা আল্লাহর জিকির-আজকার করতে থাকবে। ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন, ‘ইসলামের প্রথম যুগে ফজর উদয় হওয়ার পরেই লোকদের ভিড়ে রাস্তাগুলো ভরে যেত। তারা ঈদের দিনের ন্যায় দিনের আলোতে হেঁটে জুমআ মসজিদে ভিড় জমাত।’
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘জুমআ’র দিনে সাহাবীগণ যখন মসজিদে আসতেন, তাতে প্রবেশ করার পর থেকে সাধ্যমত সালাত আদায় করতে থাকতেন। তাদের কেউ দশ রাকাত আদায় করতেন, কেউ বারো রাকাত পড়তেন, কেউ আট রাকাত পড়তেন, কেউ আবার তার থেকেও কম পড়তেন।’ [মাজমূউল ফাতাওয়া- ২৪/১৮৯ পৃ.]
আর জুমআ’র পরে দুই, চার বা ছয় রাকাত সুন্নাত সালাত মসজিদে বা বাড়িতে আদায় করবে। অতঃপর দুপুরের খাবার শেষে হালকা বিশ্রাম করে আসরের সালাতের জন্য প্রস্তুতি নিবে। আসরের সালাত শেষে মসজিদে বসে মাগরিব পর্যন্ত বিভিন্ন ইবাদত ও মুনাজাতে লিপ্ত থাকবে। এছাড়াও জুমআ’র দিনে নিম্নোক্ত আমলগুলো করা মুস্ততাহাব।
ক. ফজরের সালাতে সুরা সাজদা ও দাহর পাঠ
ইমাম জুমআ’র দিন ফজরের সালাতে সূরা সাজদা ও দাহর পাঠ করবে। যেমন ইবনু আববাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমআ’র দিন ফজরের সালাতে আলিফ-লাম-মীম-তানযীল (সুরা হামিম আস-সাজদা) এবং হাল আতা আলাল ইনসান (সুরা দাহর) সুরাদ্বয় তিলাওয়াত করতেন।’ [বুখারী- ৮৯১; মুসলিম- ৮৭৯]
খ. রাসুল (সা.)-এর প্রতি অধিকহারে দরুদ পাঠ
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুমআ’র দিন ও রাতে আমার প্রতি অধিকহারে দরুদ পাঠ করো। কারণ যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত নাজিল করেন।’ [বায়হাকী, ছহীহাহ- ১৪০৭]
গ. গোসল করা
জুমআ’র দিনে গোসল করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। অনেক বিদ্বান জুমআ’র দিনে গোসল করাকে ওয়াজিব বলেছেন। এজন্য মসজিদে যাওয়ার পূর্বে গোসল করে বের হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক সাবালকের জন্য জুমআ’র দিন গোসল করা ওয়াজিব। আর সে মেসওয়াক করবে এবং সুগন্ধি থাকলে তা ব্যবহার করবে।’ [বুখারী- ৮৮০]
ঘ. সুগন্ধি ব্যবহার, গোসল করা ও মেসওয়াক করা
জুমআ’র দিনে সকাল সকাল গোসল করে সুন্দর জামা পরিধান করবে এবং সুগন্ধি ব্যবহার করবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমআ’র দিন গোসল করবে, উত্তম পোশাক পরবে, তার কাছে থাকলে সুগন্ধি লাগাবে, তারপর মসজিদে গমন করবে। কিন্তু মানুষের কাঁধ ডিঙ্গিয়ে সামনে আসার চেষ্টা করবে না। এরপর যথাসাধ্য সালাত আদায় করবে, ইমাম খুৎবার জন্য হুজরা হতে বের হবার পর থেকে সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত চুপচাপ থাকবে, তাহলে এ জুমআ হতে পূর্বের জুমআ পর্যন্ত তার যত গুনাহ হয়েছে তা তার কাফফারা হয়ে যাবে।’ [আবু দাউদ- ৩৪৩]
ঙ. সুরা কাহাফ তেলাওয়াত
জুমআ’র দিনে সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব। কারণ এতে অন্তর আলোকিত হবে। তাছাড়া এই সুরাটি তার জন্য নূর হবে, যার আলোতে সে পুলসিরাত অতিক্রম করতে পারবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমআ’র দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে তার জন্য দুই জুমআ’র মধ্যবর্তীকাল জ্যোতির্ময় হবে।’ [মিশকাত- ২১৭৫]
আরেকটি হাদিসে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমআ’র দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য তার ও বাইতুল আতিক্ব (কাবা)-এর মধ্যবর্তী জায়গা আলোকিত হয়ে যাবে।’ [দারেমী- ৩৪০৭; ছহীহুত তারগীব- ৭৩৬।
চ. জুমআ’র সলাতের জন্য সকাল সকাল প্রস্তুতি গ্রহণ করা
জুমআ’র সালাতের জন্য ভোরবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। গোসল করে সুগন্ধি মেখে মসজিদ পানে চলে যাবে। এর যেমন বিশেষ ফজিল আছে, তেমনি এর মাধ্যমে মসজিদে বসে বিভিন্ন ইবাদত পালনের সুযোগ হবে। জুমআ’র দিন কল্যাণ লাভের দিন। আর এই কল্যাণ লাভে বিলম্ব করা যাবে না। প্রতি জুমআ’কে গনিমত মনে করে ইবাদতে মশগুল হয়ে যেতে হবে। আল্লাহতাআলা বলেন, ‘আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিন পরিব্যপ্ত। যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য।’ [আলে ইমরান- ৩/১৩৩]
উপসংহার
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জুমআ বা শুক্রবারের দিন ছুটির দিন। অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে জুমআ’র দিনের গুরুত্ব ও ফজিলত অনুধাবন করে ছুটি রাখা হয়। যাতে করে মুসলমানেরা তাদের এই দিনের বিশেষ ফজিলত অর্জন করতে পারে। আর বিভিন্ন ইবাদত পালন ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। সাথে সাথে নিজেদের গুনাহ ক্ষমা করিয়ে নিতে পারে। কিন্তু মানুষ এই দিনটিকে ইবাদতের ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ না করে অবসর আনন্দের দিন হিসেবে গ্রহণ করেছে। যদিও শারঈ দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। আল্লাহতাআলা এবং তাঁর রাসুল এই দিনের সূচনা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইবাদতের কর্মসূচি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যারা আল্লাহর কর্মসূচি গ্রহণ করবে তারা সফলকাম হবে। আর যারা অলসতা ও অবহেলা করে তা বর্জন করবে, তারা ব্যর্থ হবে। আল্লাহতাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের পথে পরিচালিত হয়ে সফলকাম হওয়ার তাওফিক দান করুন— আমিন।
- মো. আরিফুল ইসলাম : লেখক