শ্যামল বর্মণ
একটি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে তখনই, যখন তা সমাজের অন্ধকার দূর করে মানুষের মনের খোরাক জোগায়। আজ থেকে ১৯ বছর আগে ২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঠিক তেমনি এক বুক স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (পিএফটিআই)। প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি’র এই অনন্য অঙ্গসংগঠনটি আজ শুধু একটি নাম নয়, বরং লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক সচেতনতার এক অতন্দ্র প্রহরী।
দেখতে দেখতে প্রতিষ্ঠানটি পা রাখল তার গৌরবময় ২০তম বছরে। এই শুভক্ষণে পিএফটিআই’র সকল কর্মী, কলাকুশলী, শুভানুধ্যায়ী ও দর্শকদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার খেসবা অজপাড়া গাঁয়ের এক সংগীত অনুরাগী সাধারণ ঘরের ছেলে আমি। পিতা মৃত মোজাল এবং মাতা মৃত বাদলী দাসীর সন্তান হিসেবে শৈশব থেকেই আমার রক্তে মিশে ছিল গানের প্রতি ভালোবাসা। সময়ের সাথে সাথে দু-একটি বাদ্যযন্ত্র বাজানো আর অভিনয়ের চেষ্টা করতে করতেই ২০১২ সালের ১ সেপ্টেম্বর আমি যুক্ত হই পিএফটিআই’র সাথে। জীবনের দীর্ঘ ১৪টি বছর এই আঙিনায় কাটিয়ে আজ আমি গর্বিত চিত্তে বলতে পারি— এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটি আমাকে দিয়েছে এক বিশাল আকাশ।
জীবনের স্বাভাবিক গতি সচল রাখতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার যেমন বিকল্প নেই; মানুষের মনন ও আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে বিনোদনের প্রয়োজনীয়তাও ঠিক ততটাই অনস্বীকার্য। একজন মহাজ্ঞানী যথার্থই বলেছিলেন— “মানুষ খাদ্যের অভাবে মরে না, বিনোদনের অভাবে মরে।” পিএফটিআই আমাদের সেই মানসিক খোরাক জোগানোর পাশাপাশি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা সামাজিক গোঁড়ামি, অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অভিনয়ের মঞ্চ আর গানের সুরকে অস্ত্র বানিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি করছে এক অভূতপূর্ব জনসচেতনতা।
গ্রামের সেই সাধারণ শ্যামল বর্মণকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে একক অবদান পিএফটিআই’র। এই মঞ্চ আমাকে শুধু একজন সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে গড়ে তোলেনি বরং দিয়েছে সম্মান, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ আর একটি অনন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আমার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করে বাড়িয়ে দিয়েছে পরিচিতির পরিধি। এখানে আমি যেমন প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হয়েছি, তেমনি এখনো শিখছি সংস্কৃতির গভীর পাঠ।
উনিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের উত্তরোত্তর সাফল্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। লোকসংস্কৃতির এই বাতিঘর যুগের পর যুগ ধরে এভাবেই সমাজকে আলোর পথ দেখাক, নতুন নতুন প্রতিভার জন্ম দিক— এই আমার অন্তরের অন্তস্তলের প্রার্থনা। জয় হোক সংস্কৃতির, জয় হোক পিএফটিআই’র!