তাসিকুল হক
বাল্য বিবাহ বর্তমানে বাংলাদেশে প্রকট একটি সমস্যা। পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশ বাল্যবিবাহের শীর্ষে অবস্থান করছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান বুরোর সদ্য প্রকাশিত ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ এর প্রাথমিক ফলাফলে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের সংখ্যা ৩৮.৯ শতাংশ। অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে প্রজনন স্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে। গ্রামে এই অবস্থা ভয়াবহ ।
এই ভূখণ্ডে রাজা রামমোহন রায় উনবিংশ শতাব্দিতে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাথে বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। কেননা তাঁরও বিয়ে হয়েছিল অল্পবয়সে। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিয়ে হয়েছিল কম বয়সে। তিনি বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য যে আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন তার সাথে তিনি বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। ভারতবর্ষে উল্লিখিত দুজনই ছিলেন আধুনিক মানুষ।
উনবিংশ শতাব্দির শেষদিকে ঢাকায় বিক্রমপুরের নিশীকান্ত চট্টোপাধ্যায় সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন ১৮৮২ সালে। এটি ছিল কোন ভারতীয় প্রথম পিএইডি ডিগ্রি অর্জন। তিনি ঢাকায় বাল্য বিবাহ নিবারণী সভা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সাথে অন্তঃপুরে স্ত্রী শিক্ষা এবং যুবতী বিদ্যালয় গড়ে তুলেন।
ভারতের মহারাষ্ট্রে বাল্য বিবাহ নিবারণ করতে সমাজসংস্কারক ও রাজনীতিবিদ গোপাল কৃষ্ণ গোখলে এগিয়ে আসেন। তিনি মেয়েদের বিয়ের ১০ বৎসর হতে ১২ বৎসর করার জন্য মত প্রকাশ করেন।
অবশেষে বৃটিশ ভারতে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯, ২৮ সেপ্টেম্বর পাস করা হয়। এই আইনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন হররিলাস সারদা। তিনি রাজস্থানের আজমীরের মানুষ। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, বিচারক এবং রাজনিতিবিদ ছিলেন। এই আইনকে তাঁর নামানুসারে সারদা আইন বলেও অভিহিত করা হয়। এই আইন ছেলেদের ১৮ বৎসর এবং মেয়েদের ১৪ বৎসর করা হয়। এটি child marriage Restraint. Act নামেও পরিচিত।
বাল্য বিবাহের সাথে মায়ের স্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্য ওতোপ্রত ভাবে জড়িত। ৮০ এর দশকেও মাতৃমৃত্যু ছিল প্রতি একলক্ষ শিশু প্রসবের বিপরীতে ৬৪৮ থেকে ৯২৬জন, শিশু মৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪১ জন।
বর্তমানে মাতৃমৃত্যু ১ লক্ষ শিশুর জন্মের বিপরীতে ৯০জন শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩০ থেকে ৩১ জন।
১৯৭৬ সালে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীন মাঠ কর্মী নিয়োগ করে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বাল্য বিবাহের কুফল বিষয়ক প্রচারণা শুরু হয় এবং বলা হয় ‘কুড়িতে বুড়ি নয়, বিশের আগে বিয়ে নয়।’ সাথে পরিবার পরিকল্পনা সেবা কার্যক্রম শুরু হয় স্লোগান হয় “ছেলে হোক, মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ঠ।” মায়ের মৃত্যুর অন্যতম কারণ প্রসব পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। যেটিকে বলা হয় Postpartum Hemorrhage, (সংক্ষেপে PPH)। মোট মায়ের মৃত্যুর মধ্যে এ PPH এ মারা যান শতকরা ৩১ শতাংশ।
বাংলাদেশে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির পথিকৃত ছিলেন ডা. হুমায়রা সাঈদ। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালে ঢাকার পল্টনে বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি গঠিত হয়। যেটি বর্তমানে FPAB নামে পরিচিত। পরবর্তিতে ১৯৬৫ সালে পাকিস্থানে পরিবার পরিকল্পনা বোর্ড গঠিত হয় সরকারিভাবে।
১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে পৃথিবীর প্রথম প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির পথিকৃত মার্গারেট স্যাংগার মুম্বাই এসেছিলেন এক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য। সেখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল কিন্তু তিনি উপস্থিত থাকতে পারেন নি। কিন্তু তিনি পত্রালাপের মাধ্যমে মার্গারেট স্যাংগারকে অভিনন্দন জানিয়ে দারিদ্র্য ক্লিষ্ট মানুষের জনসংখ্যা সীমিত রাখা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষা এবং কর্মসুচির কথা উল্লেখ করে এই কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন ।
অতীব দুঃখের সাথে বলতে হয়, সপ্তদশ শতাব্দিতে যখন সম্রাট শাহজাহান তাঁ প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য তাজমহল তৈরি করেন। তখন ইউরোপের সুইডেনে রানী উলরিকা এলিও নোরা জীবদ্দশায় সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মা ও শিশুর মৃত্যু রোধ করার জন্য চিকিৎসকদের নিয়ে প্যানেল গঠন করে প্রতিটি গ্রামে এক দুজন করে প্রশিক্ষিত ধাত্রী তৈরি করার ব্যবস্থা করেছিলেন। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম প্রশিক্ষিত ধাত্রী তৈরির ইতিহাস।
উল্লেখ্য যে, সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহল তাঁর চতুর্দশ সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যান। তাঁর বিবাহিত জীবনে ১৯ বছরে এই ১৪টি সন্তান প্রসব করেন। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণজনীত কারনে মৃত্যু বরন কারেন।
সম্রাট শাহজাহানের তৈরি তাজমহল পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্যের একটি। তেমনি এর উল্টোদিকে একজন সম্রাজ্ঞী প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে তিনি বেদনার প্রতীক হয়ে আছেন। এটিকে বলা হয় Symbol of Sorrow. উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে যে কয়টি জেলায় বাল্য বিবাহের হার বেশি তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অন্যতম।
লেখক-সহকারী পরিচালক, পরিবার পরিকল্পনা (অব:)