মো. আরিফুল ইসলাম
ওয়াহশী ইবনে হারব ছিলেন মক্কার একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাস। তার মনিবের নাম ছিল জুবায়ের ইবনে মুতইম। ওহুদের যুদ্ধে তিনি নবিজির (সা.) চাচা হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে (রা.) শহীদ করেছিলেন।
বদরের যুদ্ধে মক্কার উমাইয়া গোত্রের সর্দার উতবা ইবনে রাবিআ হজরত হামজার (রা.) সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন। তাই ওহুদের যুদ্ধের আগে তার মেয়ে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা ওয়াহশীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ওয়াহশী যদি হজরত হামজাকে (রা.) হত্যা করতে পারেন, তাহলে তিনি ওয়াহশীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেবেন। সেজন্যই ওয়াহশী ওহুদের যুদ্ধে বিশেষভাবে শুধু হজরত হামজাকেই (রা.) হত্যার জন্য অনুসরণ করতে থাকেন এবং একপর্যায়ে তাকে হত্যা করতে সক্ষম হন।
ওহুদের যুদ্ধের পর ওয়াহশী দাসত্ব থেকে মুক্তি পান এবং স্বাধীন মানুষ হিসেবে মক্কায় বসবাস করতে থাকেন। মুসলমানরা মক্কা বিজয় করলে তিনি মক্কা থেকে পালিয়ে তায়েফে পালিয়ে যান। চাচার হত্যাকারী হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য পলাতক কাফেরের মতো নবিজি (সা.) তাকেও ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। ওয়াহশীকে নবিজির (সা.) ইসলামের দাওয়াত দেওয়া ও ওয়াহশীর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা.) সূত্রে বর্ণিত রয়েছে।
তাবরানি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) ওয়াহশী ইবনে হারব, যিনি হজরত হামজাকে (রা.) শহীদ করেছিলেন, তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে বার্তা পাঠালেন।
তখনো তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, বহু পরে তিনি সাহাবি হয়েছেন। স্বাভাবিক যুক্তিতে প্রিয় চাচাকে যে হত্যা করেছে, তার ওপর মানুষের চরম রাগ ও ক্ষোভ থাকার কথা। মনোভাব এ রকম হওয়ার কথা যে, সে জাহান্নামে যাক এবং আরো কঠিন কোনো আজাবে পতিত হোক। কিন্তু রাসুল (সা.) চাচার খুনির কাছেও বিশেষ গুরুত্বের সাথে দাওয়াত পাঠালেন।
রাসুলের (সা.) প্রেরিত দূত যখন তার কাছে পৌঁছলেন, তখন ওয়াহশী (রা.) বললেন, আমি তো কোরআন শরিফের সেই আয়াত সম্পর্কে জানি, যেখানে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি শিরক করে, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে এবং জিনায় লিপ্ত হয়, সে চিরতরে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে এবং তার আজাব দ্বিগুণ করা হবে। আমি তো এর সবই করেছি। শিরক করেছি, কতল করেছি, জিনাও করেছি। সুতরাং আমার তো জাহান্নামেই যাওয়া অবধারিত, আমার আর ঈমান এনে লাভ কী?
দূত ফিরে এসে রাসুল (সা.)কে পুরো বিষয়টি জানালেন। তখন আল্লাহতাআলা সান্ত্বনার বাণী নিয়ে আয়াত নাজিল করলেন, ‘কিন্তু যে তওবা করেছে, ইমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে; আল্লাহতাআলা তার সমস্ত গুনাহকে নেকি দ্বারা বদলে দেবেন এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (২৫, সুরা আল-ফুরকান ৭০)
এই আয়াতের বার্তা নিয়ে দূত আবার ওয়াহশীর (রা.) কাছে গেলেন। ওয়াহশী (রা.) শুনে বললেন, ঠিক আছে, তওবা তো করতে পারব এবং ইমানও আনতে পারব; কিন্তু আমি তো নিশ্চিত নই যে, আমি নিয়মিত নেক আমল করতে পারব কিনা! আমার তো এতেও নাজাত হবে না, কারণ নেক আমলের শর্ত পূরণ করা কঠিন।
দূত আবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন এবং রাসুলকে (সা.) বিষয়টি অবহিত করলেন। এরপর আল্লাহতাআলা আবার আয়াত নাজিল করলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতাআলা তার সাথে শরিক করা ছাড়া অন্য যে কোনো গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।’ (৪, সুরা আন-নিসা ৪৮)
দূত এই সুসংবাদ নিয়ে আবার ওয়াহশীর (রা.) কাছে গেলেন। ওয়াহশী (রা.) বললেন, আল্লাহতাআলা যাকে চান ক্ষমা করবেন ঠিক আছে, কিন্তু আমার ব্যাপারে তিনি আদৌ চাইবেন কিনা, তা তো আমি জানি না! এ কথা বলে তিনি এবারো ঈমান আনলেন না।
দূত আবার খালি হাতে ফিরে এলেন। তখন আল্লাহতাআলা পরম করুণাময় ও দয়ালুরূপে সান্ত্বনার চূড়ান্ত বার্তা নাজিল করলেন, ‘হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর অবিচার বা সীমাহীন পাপ করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (৩৯, সুরা আয-যুমার, ৫৩)
এই আয়াত নিয়ে যখন দূত আবার উপস্থিত হলেন, তখন ওয়াহশী (রা.) বললেন, হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে! এবং তিনি ইসলাম কবুল করলেন।
পুরো এই ঘটনাটি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে মনে হবে, কোরআনের আয়াত নাজিল হচ্ছে আর আল্লাহর রাসুল (সা.) বারবার দূত পাঠাচ্ছেন। এখানে যেন ওয়াহশীর বিন্দুমাত্র কোনো ঠেকা নেই, বরং সমস্ত ঠেকা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সাঃ)! ওয়াহশী একের পর এক শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন আর তাঁরা সেই শর্তের জবাব নিয়ে বারবার হাজির হচ্ছেন। স্বাভাবিক নিয়ম হলো, যার প্রয়োজন থাকে, সেই তো শর্ত মানতে বাধ্য হয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, ওয়াহশী (রা.) এত বেপরোয়া ও প্রয়োজনমুক্ত হলেন কীভাবে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) এত ঠেকায় পড়লেনই বা কেন?
এর মূল কারণ হলো, ওয়াহশী বেপরোয়া ছিলেন তাঁর নিজের জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতার কারণে। নেশাগ্রস্ত মানুষ যেমন নিজের ভালোমন্দ বোঝে না এবং পরিণতি নিয়ে বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না, জাহেল মানুষও তেমনি নিজের আসল ক্ষতি বুঝতে পারে না।
ইসলাম গ্রহণের পর ওয়াহশী (রা.) আমৃত্যু ইসলামের ওপর অটল থাকেন এবং ইসলামের জন্য লড়াই করেন। ইসলামের পথে নিজেকে উৎসর্গ করে তিনি আগের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করেন। হজরত আবু বকরের (রা.) খেলাফতকালে ওয়াহশী মুসলমানদের পক্ষে ইয়ামামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওই যুদ্ধে মিথ্যা নবুয়্যতের দাবিদার মুসায়লামা কাজ্জাবকে হত্যা করে তিনি যুদ্ধজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
মো. আরিফুল ইসলাম : ব্যাংকার ও লেখক