শনিবার ০৭ নভেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২২শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: November 07, 2026
November 07, 2026
লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

যে কারণে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে আপনার শুকনো কাশি

Published: November 07, 2026 at 12:18 PM
যে কারণে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে আপনার শুকনো কাশি

দীর্ঘদিনের শুকনো কাশি একটি বিরক্তিকর সমস্যা। সাধারণ সর্দি-জ্বর সেরে যাওয়ার পরও অনেক সময় কাশি কয়েক সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস স্থায়ী হতে পারে। এতে ঘুমের ব্যাঘাত, দৈনন্দিন কাজে অস্বস্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশির পেছনে কয়েকটি সাধারণ ও চিকিৎসাযোগ্য কারণ রয়েছে। আজকে এই বিষয়গুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো। 


১. কফ ভ্যারিয়েন্ট অ্যাজমা

অ্যাজমার একটি বিশেষ ধরন হলো কফ ভ্যারিয়েন্ট অ্যাজমা। এতে সাধারণ অ্যাজমার মতো শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ বা সাঁ সাঁ শব্দ নাও থাকতে পারে; দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশিই প্রধান উপসর্গ হয়ে দেখা দেয়। সাধারণত রাতে বা ভোরে কাশি বাড়ে। ধুলাবালি, ঠান্ডা বাতাস, অ্যালার্জেন এবং ঋতু পরিবর্তনের সময় উপসর্গ তীব্র হতে পারে।


বারবার এমন কাশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে স্পাইরোমেট্রিসহ শ্বাসক্রিয়ার পরীক্ষা করা হতে পারে। রোগের কারণ নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে কাশি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।


২. পোস্টন্যাসাল ড্রিপ

নাক বা সাইনাসে অতিরিক্ত মিউকাস তৈরি হয়ে তা গলার পেছন দিয়ে নামলে তাকে পোস্টন্যাসাল ড্রিপ বলা হয়। এই মিউকাস গলার সংবেদনশীল অংশে উত্তেজনা তৈরি করে কাশির সৃষ্টি করতে পারে।


অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, সাইনুসাইটিস, নাক বন্ধ থাকা কিংবা নাকের অন্যান্য সমস্যায় এটি বেশি দেখা যায়। শোয়ার পর মিউকাস গলায় জমে যাওয়ায় রাতে বা ভোরে কাশি বাড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কাশির একটি পরিচিত কারণ এটি।


৩. গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ 

পাকস্থলীর অ্যাসিড বা খাবারের কিছু অংশ ওপরের দিকে উঠে এলে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা জিইআরডি হতে পারে। এতে বুকজ্বালা, টক ঢেকুর ও গলায় জ্বালাপোড়ার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশিও হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ না থাকলেও শুধু কাশি দেখা দিতে পারে।


একসাথে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত ওজন ও ধূমপান এ সমস্যা বাড়াতে পারে। কারণটি শনাক্ত করে রিফ্লাক্স নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই কাশি কমে যায়।


৪. ভাইরাল সংক্রমণের পর দীর্ঘস্থায়ী কাশি

সর্দি-জ্বর বা অন্য কোনো ভাইরাল শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ সেরে যাওয়ার পরও কিছুদিন শ্বাসনালি অতিসংবেদনশীল থাকতে পারে। ফলে সংক্রমণের উপসর্গ চলে গেলেও শুকনো কাশি থেকে যায়।


সাধারণত সময়ের সঙ্গে এ ধরনের কাশি ধীরে ধীরে কমে যায়। পর্যাপ্ত পানি পান, বিশ্রাম এবং গলা আরামদায়ক রাখার ব্যবস্থা উপকারী হতে পারে। তবে কাশি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।


৫. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসিই ইনহিবিটর (অঈঊ রহযরনরঃড়ৎ) শ্রেণির ওষুধ অনেকের ক্ষেত্রে এমন কাশির কারণ হতে পারে।


তাই দীর্ঘদিনের কাশির কারণ খুঁজতে রোগী নিয়মিত কী কী ওষুধ সেবন করছেন, সেটিও জানা গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধজনিত কাশি সন্দেহ হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প ওষুধ বিবেচনা করতে পারেন। নিজের সিদ্ধান্তে কোনো নিয়মিত ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।


৬. ধূমপান

দীর্ঘদিন ধূমপান শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কফ ও শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে। এতে ক্রনিক ব্রংকাইটিসসহ বিভিন্ন ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বাড়ে।


ধূমপানের পরিমাণ ও সময়কাল যত বেশি হয়, শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতির ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী কাশির ক্ষেত্রে ধূমপানের ইতিহাস জানা গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন? 

দীর্ঘস্থায়ী কাশি সব সময় গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে কাশি না কমলে বা বারবার ফিরে এলে এর কারণ নির্ণয় করা জরুরি। বিশেষ করে কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, রক্ত ওঠা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর বা অস্বাভাবিক ওজন কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


কারণভেদে দীর্ঘস্থায়ী কাশির চিকিৎসাও ভিন্ন। তাই কফ সিরাপ দিয়ে কাশি দমিয়ে রাখার চেয়ে কাশির পেছনের কারণ খুঁজে বের করাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য আমাদের। কয়েক সপ্তাহের কাশি অবহেলা না করে সঠিক ইতিহাস, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের মাধ্যমে কারণ শনাক্ত করা জরুরি। কারণ, “কাশি একটি উপসর্গ—চিকিৎসা হওয়া উচিত তার কারণের।”


ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফী, সহকারী অধ্যাপক (ইএনটি), সিলেট এমএ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।