শুক্রবার ০৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৪শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: October 09, 2026
October 09, 2026
ভোলাহাট
ভোলাহাট

ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকার দেখছেন মতিউর রহমান

Published: October 09, 2026 at 01:24 PM
ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকার দেখছেন মতিউর রহমান

এক সময় ভোরের আলো ফুটতেই কাঁধে পত্রিকার বোঝা নিয়ে ছুটে বেড়াতেন মতিউর। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ, বাজার, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও—কোথাও বাদ যেত না। মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দিতেন দিনের খবর। পত্রিকা পৌঁছে দেয়াই ছিল তাঁর জীবিকা, আর সেই সামান্য আয়েই চলত স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে চার সদস্যের সংসার।

কিন্তু সময় বদলেছে। হাতে হাতে পৌঁছে দেয়া সেই ছাপা কাগজের জায়গা দখল করে নিয়েছে মুঠোফোনের পর্দা। ইন্টারনেটে মুহূর্তেই খবর পাওয়া যায়। ফলে ভোলাহাট উপজেলায় কমেছে প্রিন্ট পত্রিকার পাঠক ও বিক্রি। আর সেই সঙ্গে জীবিকার শেষ অবলম্বনটুকুও হারাতে বসেছেন ৬০ বছর বয়সী পত্রিকা বিক্রেতা মো. মতিউর রহমান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার ঝাউবোনা গ্রামের মৃত এরশাদুল হকের ছেলে মতিউর রহমান ৩৬ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রির সঙ্গে জড়িত। জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে তিনি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করেন। 

একসময় প্রতিদিন তাঁর কাছে সাড়ে তিনশ থেকে চারশ কপি পর্যন্ত পত্রিকা বিক্রি হতো। মাস শেষে পত্রিকা সরবরাহের সার্ভিস চার্জ পেয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কোনোভাবে সংসারের তিনবেলা খাবার জুটাতেন।

কিন্তু সেই দিন এখন অতীত। বর্তমানে তাঁর পত্রিকা বিক্রি নেমে এসেছে মাত্র ২৭ কপিতে। এই সামান্য আয় থেকে যে সার্ভিস চার্জ পান, তা দিয়ে সংসার চালানো তো দূরের কথা—চা-বিস্কুটের খরচই হয় না। 

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নতুন কোনো পেশায় যাওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে শরীরে আর আগের মতো তেজ নেই। বয়সের ভারে নতুন করে জীবনযুদ্ধে নামার শক্তিও যেন ফুরিয়ে এসেছে। তাই পত্রিকার বিক্রি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখেমুখেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তার ছাপ। মতিউর রহমান আক্ষেপ করে বলেন,“আগে মানুষ পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করত। এখন মোবাইলে ইন্টারনেটেই খবর পড়ে। তাই অনেকে আর পত্রিকা নিতে চায় না। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ অনেক জায়গায় আগে নিয়মিত পত্রিকা দিতাম, এখন সেখানেও পত্রিকা নেওয়া হয় না।”

তিনি বলেন, “আগের মতো সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি আবার পত্রিকা নেয়া শুরু করে, তাহলে পত্রিকা শিল্পও বাঁচবে, আমিও বাঁচব। আমার মতো একজন দরিদ্র মানুষের পরিবারের প্রতিও সহযোগিতা হবে।”

শুধু মতিউর রহমান নন, তাঁর মতো অসংখ্য পত্রিকা বিক্রেতার জীবিকাই এখন প্রশ্নের মুখে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হাতে ছাপা পত্রিকার বদলে জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোন। তবে ভোলাহাটের প্রবীণ পত্রিকা পাঠকদের অনেকেই মনে করেন, হাতে নিয়ে পত্রিকা পড়ার আনন্দ ও গুরুত্ব এখনো আলাদা। পত্রিকার পাঠক মো. রইশুদ্দিন, যিনি বজরাটেক-মুন্সীগঞ্জহাটের একজন মুদি দোকানদার। তিনি বলেন, “ইন্টারনেটের দোহাই দিয়ে যারা পত্রিকা পড়া বাদ দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে আমি একমত নই। হাতে পত্রিকা নিয়ে পড়ার আনন্দই আলাদা। খবরের প্রতিটি লাইন, দাঁড়ি-কমা, খুঁটিনাটি মনোযোগ দিয়ে পড়া যায়। ইন্টারনেটে সেই অনুভূতি সব সময় পাওয়া যায় না।”

তিনি জানান, ভোলাহাটে যখন প্রথম পত্রিকা আসা শুরু  তখন থেকেই আমি নিয়মিত এখন পর্যন্ত পত্রিকা পড়ি। তাঁর ভাষায়, “আমি ভোলাহাটে পত্রিকা আসার পর থেকে পত্রিকা পড়ছি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পত্রিকা পড়ে যাব।”

পত্রিকা বিক্রেতা মতিউর রহমানের কণ্ঠে এখন একটাই আকুতি—“আবারও মানুষ পত্রিকা হাতে তুলে নিক”।

সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা নিয়মিত পত্রিকা নিলে শুধু প্রিন্ট পত্রিকার পাঠকই বাড়বে না, তাঁর মতো অসহায় পত্রিকা বিক্রেতার পরিবারও নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে।

প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে হয়তো ছাপা পত্রিকার দিন বদলে গেছে। কিন্তু ৬০ বছর বয়সী মতিউর রহমানের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পত্রিকার সেই কাগজের পাতাগুলো এখনো তাঁর কাছে শুধু খবরের কাগজ নয়—এটাই তাঁর জীবিকা, তাঁর আত্মপরিচয় এবং পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেয়ার শেষ আশ্রয়।

তাই তাঁর প্রশ্ন “পত্রিকা যদি না চলে, তাহলে আমি কীভাবে চলব, সংসার কি ভাবে চালাব?”

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু মতিউরের একার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভোলাহাটের হারিয়ে যেতে বসা প্রিন্ট পত্রিকার জগত এবং সেই জগতের সঙ্গে জীবিকা জড়িয়ে থাকা মানুষের ভবিষ্যৎ।