হলিউড পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন সিনেমা 'দ্য ওডিসি'র প্রচারণায় প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো ইরানি গহনা পরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন জনপ্রিয় মার্কিন অভিনেত্রী জেনডায়া| প্রাচীন ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে সিনেমার প্রচারে ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা| গ্রিক রাজার ঘরে ফেরার দীর্ঘ যাত্রার গল্প নিয়ে নির্মিত ‘দ্য ওডিসি’ সিনেমায় দেবী এথেনার চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেনডায়া| সম্প্রতি লন্ডনে সিনেমাটির একটি ফটোসেশনে অংশ নেন তিনি| সেখানে তার কানে দেখা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দের প্রাচীন ইরানি নিদর্শন থেকে ˆতরি একজোড়া দুল| এটি প্রকাশ্যে আসার পরই সমালোচনার ঝড় ওঠে| হলিউড সিনেমার প্রচারে এমন মহামূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ব্যবহারকে ইরানের সাংস্কৃতিক অবদানের ‘ছিনতাই’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা| জানা গেছে, বিতর্কিত এই দুল জোড়া লন্ডনের মেফেয়ারভিত্তিক গ্যালারি ও ডিলার ‘ব্যারন’-এর|
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০২৫ সালে গ্লেন স্পিরো নামের আরেক জুয়েলারের কাছ থেকে এগুলো কেনা হয়েছিল| দুলগুলো মূলত ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে উত্তর-পশ্চিম ইরানে আবিষ্কৃত ‘জিউইয়ে’ গুপ্তধনের অংশ, যা ১৯৪৭ সালে রাখালদের দ্বারা লুট হয়েছিল| ২০১৫ সালের এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, টিকে থাকা নিদর্শনগুলো ১৯৬০-এর দশকে ইরানের বাইরের প্রাচীন বাজারে বিক্রি হয়ে যায় এবং বর্তমানে বিশে^র বিভিন্ন জাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছড়িয়ে আছে| ইরানি বংশোদ্ভূত শিল্পকলা ইতিহাসবিদ ও কোর্টোল্ড ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সুসান বাবাই এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন| তিনি বলেন, সেলিব্রিটিদের যারা সাজান বা ফ্যাশন অনুষঙ্গ পরান, তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও সংবেদনশীলতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে|
এসব গহনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এগুলো কেবল ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবে প্রদর্শনের জন্য নয়| এগুলো মানবতা ও বিশে^র ঐতিহ্য| প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রযোজক ড. অ্যানেলিস বেয়ার বলেন, এখানকার প্রধান ˆনতিক সমস্যা হলো দুলগুলো লুট করা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে ˆতরি| আন্তর্জাতিক সিনেমার লাল গালিচায় জেনডায়ার মতো তারকা এটি প্রদর্শনের ফলে বিষয়টি নতুন করে সবার নজরে এসেছে| সমালোচনার জবাবে ব্যারন গ্যালারি জানিয়েছে, দুলগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র মেনেই সংরক্ষণ করা হয়েছে| এগুলো কাউকে পরতে দেওয়ার পেছনে তাদের কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ছিল না; বরং প্রাচীন পারস্যের ¯^র্ণকারদের অসামান্য ˆশল্পিকতাকে উদ্যাপন করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়| তবে অধ্যাপক সুসানের মতে, এই ঘটনার সময়কাল আরও বেশি উদ্বেগজনক| যখন ইরানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান ধ্বংসের মুখে, ঠিক সেই সময়ে হলিউড সিনেমার প্রচারে ইরানের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে মহিমাšি^ত করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক| গহনা বিতর্কের বাইরে সিনেমাটির শুটিং লোকেশন নিয়েও নতুন করে আপত্তি উঠেছে| মরক্কোর নিয়ন্ত্রণাধীন পশ্চিম সাহারার অধিকৃত দাখলা শহরকে শুটিং সেট হিসেবে ব্যবহার করায় ‘দ্য ওডিসি’ বয়কটের ডাক দিয়েছেন সাহরাউই নির্মাতারা| পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকা প্রাচীন লুট হওয়া নিদর্শন (যেমন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বেনিন ব্রোঞ্জ বা পার্থেনন মার্বেল) নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যেই নোলানের সিনেমা নিয়ে এই নতুন সমালোচনা যুক্ত হলো|