২১ এপ্রিল, ২০২৬। বাংলাদেশের শিক্ষা জগৎ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। সারাদেশের হাজারো পরীক্ষা কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয় বাংলা ১ম পত্র দিয়ে। এবারের সবচেয়ে বড় খবর-প্রথমবার কোনো জাতীয় পাবলিক পরীক্ষায় সকল কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও ১১ দফা নির্দেশনায় প্রতি পরীক্ষা কক্ষে ক্যামেরা, জ্যামার, লাইভ মনিটরিং সব বাধ্যতামূলক। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টায় শেষ হওয়া এই প্রথম পরীক্ষা থেকেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভেসে আসছে। কেউ বলছেন বিপ্লব এসেছে, কেউ বলছেন চ্যালেঞ্জ এখনও বাকি।
ইনভিজিলেটরের চোখে প্রথম দিন: বাস্তব অভিজ্ঞতা
প্রথমদিন আমি নিজে একটি পরীক্ষা কক্ষে ইনভিজিলেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সকাল ৯টায় কেন্দ্রে পৌঁছে প্রথম কাজ-ক্যামেরা চেক। প্রতি ডেস্কের উপরে, কালোবর্ণের লেন্সগুলো যেন সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে, “আমি দেখছি।” শিক্ষার্থীরা ঢুকতে ঢুকতে উৎকণ্ঠায় চারপাশে তাকাচ্ছে। ক্যামেরার লাল আলো জ্বলছে, লাইভ ফিড কন্ট্রোল রুমে যাচ্ছে। প্রশ্নপত্র বিতরণের সময় একটা শিক্ষার্থী ফিসফিস করে বলল, “স্যার, এটা রেকর্ড হচ্ছে?” আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ, তাই সবাই নিজের কাজ কর।”
শিক্ষার্থীদের হৃদয়ের কথা: শহর-গ্রামের পার্থক্য
শহুরে শিক্ষার্থীরা মোটামুটি স্বস্তি পেয়েছে। ক্যামেরা তাদের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি এনেছে। কিন্তু গ্রামের ছবি ভিন্ন। “ক্যামেরা” শিক্ষার্থীকে জাজ করছে মনে করে উত্তর গুলিয়ে ফেলেছে অনেকে। জীবনে ১ম বার সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে দুর্বল মানসিকতা এবং আত্মবিশ্বাসহীন শিক্ষার্থীরা চিন্তায় ডুবে যাচ্ছে। গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য আগে থেকে মানসিক প্রস্তুতি ও কাউন্সেলিং দিলে ভালো হতো।
শিক্ষকদের নতুন ভূমিকা: সজাগতা ও চ্যালেঞ্জ
শিক্ষকরা সজাগ থাকতে বাধ্য হয়েছেন, যা ইতিবাচক। ক্যামেরা চেক, লাইভ ফিড মনিটরিং এবং ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে ব্যস্ততা বেড়েছে। গ্রামীণ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট সমস্যায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে শৃঙ্খলা বেড়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, এটি তাদের দায়িত্বশীলতা বাড়িয়েছে।
প্রযুক্তির দুই মুখ: সাফল্য ও ফাঁক
ইতিবাচক দিক অনেক। আগের বছরগুলোতে কপি-প্যাস্ট, বাইরের সাহায্য, মোবাইল অপব্যবহার-এসবের অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। লাইভ মনিটরিংয়ে যেকোনো অভিযোগের তাৎক্ষণিক তদন্ত সম্ভব। শিক্ষামন্ত্রী এএনএম ইহসানুল হক মিলন স্পষ্ট বলেছেন, “ক্যামেরা অকেজো থাকলে অনিয়মের সন্দেহ, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কিন্তু চ্যালেঞ্জও কম নয়। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটের অভাবে লাইভ স্ট্রিমিং ব্যাহত। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ক্যামেরা বন্ধ। গোপনীয়তার প্রশ্ন উঠেছে-শিক্ষার্থীদের ভিডিও রেকর্ডিং কতটা নিরাপদ? প্রশিক্ষণের ঘাটতিতে শিক্ষকরা প্রযুক্তি সঠিকভাবে চালাতে পারেনি। কিছু কেন্দ্রে ক্যামেরার কোণ ঠিক ছিল না, ফলে পুরো কক্ষ কভার হয়নি।
ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা: শিক্ষা থেকে সমাধান
এই প্রথম পরীক্ষা সফলতার দিকে এগিয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়। পরবর্তী পরীক্ষায় ইন্টারনেট অবকাঠামো মজবুত, গ্রামের প্রতিটি কেন্দ্রে জেনারেটর, সবার জন্য বিস্তারিত প্রশিক্ষণ, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং জরুরি। ডেটা নিরাপত্তার জন্য সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হবে। এসএসসি’২৬ থেকে আমরা অনেক শিখছি।”
এসএসসি ২০২৬ শিক্ষা ব্যবস্থার এক মাইলফলক। আজ (গতকাল) বাংলা ১ম পত্রের প্রথম দিন থেকেই আমরা দেখলাম, প্রযুক্তি কীভাবে শিক্ষাকে নতুন রূপ দিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের শিক্ষা বিশ্বমানের হবে। কাল (আজ) নতুন পরীক্ষা, নতুন চ্যালেঞ্জ। সিসিটিভির চোখ আমাদের পথ দেখাবে।
মো. আব্দুল্লাহ আল মেহেদী, সহকারী শিক্ষক, খোলসী দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়, খোলসী,মল্লিকপুর,নাচোল,চাঁপাইনবাবগঞ্জ।