এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের শেষ মুহূর্তের করণীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন নাচোল উপজেলার খোলসী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ আল মেহেদী
আব্দুল্লাহ আল মেহেদী
২১ এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে সারাদেশে শুরু হয়েছে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা| এর মাধ্যমে দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে শুরু হবে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়| এই সময়টি শুধু পরীক্ষার নয়, আত্মবিশ্বাস , ˆধর্য আর মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা| দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, শিক্ষক-অভিভাবকের পরামর্শ, নিজের পরিশ্রম আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন— সবকিছু মিলিয়ে এই মুহূর্তটি প্রতিটি পরীক্ষার্থীর কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে| এখন আর বড় কোনো প্রস্তুতি নেয়ার সময় নেই, বরং যা পড়া হয়েছে, সেটিকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে নেয়ার সময়|
শেষ মুহূর্তে অনেক শিক্ষার্থীর মাথায় এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে| মনে হয়, এখনো অনেক কিছু পড়া বাকি, অনেক কিছু ভুলে গেছে, আর বুঝি ঠিকমতো প্রস্তুতি হয়নি| কিন্তু এই ভাবনাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে| কারণ ভয় মানুষের মনোযোগ নষ্ট করে, আর অস্থিরতা মনে রাখা শক্তিকে দুর্বল করে দেয়| তাই এখন দরকার শান্ত থাকা| ঘাবড়ে গিয়ে নতুন নতুন বিষয় ধরার চেয়ে পুরোনো পড়াগুলোই বারবার দেখে নেয়া বেশি লাভজনক| যেটুকু জানা আছে, সেটিকেই ঝালিয়ে নেয়া এখন সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ|
এই সময়ে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পুনরাবৃত্তি| যেসব অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো একবার নয়, বারবার দেখে নিতে হবে| সংজ্ঞা, সূত্র, তারিখ, নাম, ব্যাখ্যা, রচনা, সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, সৃজনশীল প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ— এসব আবার মিলিয়ে দেখা উচিত| অনেক সময় একটি ছোট ভুলের কারণে বড় ক্ষতি হয়ে যায়| তাই খুঁটিনাটি বিষয়েও মনোযোগ দিতে হবে| বিশেষ করে, যেসব বিষয় আগে পড়া হয়েছে কিন্তু একটু দুর্বল মনে হচ্ছে, সেগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার| নতুন কিছু মুখস্থ করার চেয়ে পুরোনো জিনিস মনে গেঁথে রাখা এখন বেশি জরুরি|
তাছাড়া এই সময় একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মেনে চলা খুব উপকারী| সকাল, দুপুর, বিকেল আর রাত— এই চার সময়কে ভাগ করে নিয়ে পড়াশোনা করলে কাজ অনেক সহজ হয়| সকালে মন ও মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে সতেজ থাকে, তাই কঠিন বিষয় বা বেশি মনোযোগের কাজ তখন করা ভালো| দুপুরে হালকা বিষয়, বিকেলে রিভিশন, আর রাতে শুধু গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দেখে নেয়া যেতে পারে| এভাবে পড়লে শরীরও ক্লান্ত হয় না, মনও এক জায়গায় থাকে| এলোমেলোভাবে পড়লে সময় নষ্ট হয়, কিন্তু পরিকল্পনা করে পড়লে অল্প সময়েও অনেক কিছু গুছিয়ে নেয়া যায়|
পরীক্ষার আগে ঘুমকে অবহেলা করা উচিত নয়| অনেকেই ভাবে, শেষ রাতে জেগে থাকলে বেশি পড়া যাবে| কিন্তু বাস্তবে তা ঠিক উল্টো| ঘুম কম হলে মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করে না, মনোযোগ নষ্ট হয়, আর পড়া মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে| তাই পরীক্ষার আগের দিনগুলোতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে| তাড়াহুড়ো করে রাত জেগে পড়ার চেয়ে সময়মতো ঘুমিয়ে ভোরে একটু সতেজ মনে পড়া অনেক বেশি কার্যকর| সুস্থ শরীর আর শান্ত মন পরীক্ষার ভালো ফলাফলের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ|
এখন মোবাইল ফোন, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় ব্যয়— এসব থেকে দূরে থাকা দরকার| এই দুই দিন খুব মূল্যবান| একটু অসাবধান হলেই অনেক সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে| তাই পড়ার সময় পুরো মনোযোগ পড়ায় দিতে হবে| অন্যদের প্রস্তুতি নিয়ে অযথা চিন্তা করা, তুলনা করা বা ভয় পাওয়া ঠিক নয়| প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি আলাদা, শক্তি আলাদা, আর ধারণ করার ক্ষমতাও আলাদা| তাই নিজের জায়গা থেকে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ|
পরীক্ষার হলে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সেটিও এখন মনে রাখা দরকার| প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর আগে পুরো প্রশ্ন ভালোভাবে পড়তে হবে| তারপর সহজ প্রশ্নগুলো আগে করা উচিত| এতে সময় বাঁচে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ে| যে উত্তরই লেখা হোক, তা পরিষ্কার, গোছানো এবং সহজ ভাষায় লেখা দরকার| অপ্রয়োজনীয় কাটাকাটি, বিশৃঙ্খল লেখা বা তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়| যা জানা আছে, তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করাই ভালো ফলের একটি বড় উপায়| অনেক সময় সঠিক উত্তর জানলেও খারাপভাবে লেখার কারণে ন¤^র কমে যায়| তাই পরীক্ষার খাতাকে যত্নের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে|
এই সময়ে অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে| সন্তানের ওপর অযথা চাপ দেওয়া, তুলনা করা বা ভয় দেখানো ঠিক নয়| বরং তাদের পাশে থেকে সাহস জোগানো, শান্ত পরিবেশ ˆতরি করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া বেশি দরকার| “চেষ্টা করো”, “ভয় পেয়ো না”, “শান্ত থাকো”— এই ধরনের কথা পরীক্ষার্থীর মনোবল বাড়িয়ে দেয়| পরিবার যদি ইতিবাচক মনোভাব রাখে, তাহলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি আরো সহজ হয়ে ওঠে|
সবশেষে বলা যায়, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের জন্য এই সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ| এখন আর বড় কোনো প্রস্তুতির সুযোগ নেই, কিন্তু যা আছে, তা গোছানো, ঝালিয়ে নেয়া এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করার সুযোগ অবশ্যই আছে| ভয়কে পাশে সরিয়ে রেখে শান্ত মাথায় পড়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া, পরিকল্পনা মেনে চলা এবং নিজের ওপর ভরসা রাখা— এই চারটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন| মনে রাখতে হবে, শেষ মুহূর্তের সঠিক প্রস্তুতিই অনেক সময় সাফল্যের দরজা খুলে দেয়| তাই অস্থির না হয়ে মনোযোগী হও, ভয় না পেয়ে এগিয়ে চলো, আর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হও|