কবি, কথাসাহিত্যিক এবং বহুল আলোচিত দীর্ঘ কবিতা ‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম’র রচয়িতা আলহাজ আশরাফুল ইসলাম ভাস্কর চৌধুরী আর নেই|
গত রবিবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)|
তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর| মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন|
পরিবার নিয়ে তিনি ঢাকার উত্তর আদাবরস্থ ঢাকা হাউজিং এলাকায় নিজ¯^ বাড়িতে থাকতেন| ১৫ জুন শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়| এরপর থেকেই তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন| পরীক্ষায় তার খাদ্যনালীতে টিউমার ধরা পড়ে| এর পাশাপাশি ফুসফুসে পানি জমা এবং দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস জটিলতায় তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে| সবশেষে চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে রবিবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান|
সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার ভবানীপুরের তার গ্রামের বাড়িতে তৃতীয় জানাজার নামাজ শেষে চাঁনহাজীপাড়া পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়|
এসময় উপস্থিত ছিলেন— রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড.আলমগীর স্বপন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাহিত্য সংগঠন হৃথিবী রথের আনিফ রুবেদ, বাংলাদেশ সাহিত্যপ্রেমী পরিষদের ওমর ফারুকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ|
এর আগে রবিবার রাতে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রথম জানাজা ও সোমবার বাদ ফজর ঢাকার উত্তর আদাবর বাসভবনের কাছে ঢাকা হাউজিং জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়|
ভাস্কর চৌধুরীর প্রয়াণে সমকালীন সাহিত্যিক ও গুণীজনরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন| সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকবার্তায় অনেকেই লিখেছেন, বাংলা সাহিত্য তার এক অনন্য অভিভাবক ও স্বতন্ত্র কণ্ঠকে হারাল| তার এই প্রয়াণ বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি|
পরিবারের পক্ষ থেকে তার ছোটভাই বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল আহসান জাকারিয়া মুক্তা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন|
ডা. জিয়াউল আহসান জানান, ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর তৎকালীন রাজশাহীর জেলার অন্তর্গত চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের রাজারামপুরের ভবানীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভাস্কর চৌধুরী| তার পিতার নাম নুরুল ইসলাম| ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি| সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকলেও সাহিত্যসাধনা অব্যাহত রাখেন এবং গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র অবস্থান ˆতরি করেন| সরকারি চাকরি (কাস্টম কর্মকর্তা) হতে অবসর গ্রহণের পর হজ পালন করেন তিনি|
প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন ভাস্কর চৌধুরী| এরপর ৪০টির অধিক গল্প, কবিতা ও উপন্যাস লিখে দেশের একজন স্বনামধন্য কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন তিনি| তবে তার লেখাগুলো প্রকাশ পেত ভাস্কর চৌধুরী নামে|
২০১২ সালে প্রকাশ প্রায় তার দীর্ঘ কবিতা ‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম’| যা ২০১৪ সালে দুই বাংলার আবৃত্তিশিল্পীদের কণ্ঠে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে|
এছাড়া সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও সংগ্রাম নিয়ে রচিত তার মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ পাঠক ও সমালোচকমহলে প্রশংসিত হয়|
বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি, মানুষ, লোকজ সংস্কৃতি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম তার সাহিত্যকর্মের প্রধান উপজীব্য ছিল| সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি পাঠক, গবেষক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছে সমাদৃত ছিলেন|
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— রক্তপাতের ব্যাকরণ (১৯৮৪-গল্পগ্রন্থ), বাষট্টি বিঘা নদী (১৯৮৭-গল্পগ্রন্থ), কোথায় নিবাস (১৯৮৭-গল্পগ্রন্থ), পতনের সময় (১৯৮৮-গল্পগ্রন্থ), শনিবারে বৃষ্টি (১৯৯৯-গল্পগ্রন্থ), লালমাটি কালো মানুষ (১৯৯৮-উপন্যাস), ¯^প্নপুরুষ (১৯৯৮-উপন্যাস), মীমাংসা পর্ব (১৯৯৮-উপন্যাস), আষাঢ়ের জীবনদর্শন (১৯৯৯-উপন্যাস), ভূমি (২০১১- উপন্যাস), কৃষ্ণপুরাণ (২০১১-উপন্যাস), কখনও কখনও এরকম ঘটে (২০১২-উপন্যাস), আমার কেবলই সমর্পণ (১৯৮৬-কবিতা), নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম (২০১২-কবিতা), আমার ভেতরে আঁধার (২০১২-কবিতা), পরাণের গহীন (২০১২-কবিতা), তোর বড় কষ্টরে (২০১২-কবিতা) প্রভৃতি|