চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলার ৪৫টি ইউনিয়নের মধ্যে কয়েকটি ইউনিয়ন পদ্মা নদীর পশ্চিম পারে অবস্থিত। এর মধ্যে জেলার সদর উপজেলার নারায়ণপুর ও আলাতুলি ইউনিয়ন ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের একাংশ উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে পাঁকা ও নারায়ণপুর ইউনিয়ন দুটি পাশপাশপাশি অবস্থিত। এই দুটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষের জেলা বা উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা। বর্ষা মৌসুমে পদ্মার পানি উপচে গিয়ে চারিদিক থৈ থৈ করে। তখন এই ইউনিয়ন দুটির মানুষ বাড়ির কাছে নৌকায় চড়ে জেলা সদরে বা উপজেলা সদরে এসে কাজ সেরে আবার নৌকা করে ফিরে যায়। কিন্তু বিপাকে পড়ে তখন, যখন কোনো মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন দ্রুত তাদেরকে হাসপাতালে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শ্যালোমেশিন চালিত নৌকায় আসতে সময় লাগে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা কিন্তু ফেরত যেতে স্রোতের উজানে হওয়ার কারণে সময় লাগে প্রায় দ্বিগুণ। অনেক সময় প্রসূতি মায়েদের নিয়েও বিপাকে পড়তে হয়।
শুষ্ক মৌসুমে যাতায়াত আরো কঠিন হয়ে পড়ে। পদ্মা নদীতে পানি হারিয়ে যাওয়ায় অনেকটা পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। ইজারাদারের নৌকার বাইরে কোনো নৌকা ভাড়া নিতে গেলে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা গুনতে হয়। পদ্মা পাড়ের বাসিন্দারা বাড়ি থেকে রোগীদের বহন করে খাটলিতে করে। অনেক সময় হাসপাতালে নেয়ার আগেই নৌকার মধ্যেই মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পদ্মা পাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল ব্যক্তিগত উদ্যোগে নারায়নপুর ও আলাতুলি ইউনিয়নের রোগী বহনের জন্য বিনামূল্যে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স উপহার হিসেবে দিয়েছেন। গতকাল বুধবার বিকেলে নারায়ণপুর ইউনিয়নে পদ্মা নদীর ধারে তিনি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি স্থানীয়দের কাছে হস্তান্তর এবং চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেন।
এই নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সেবায় থাকছে প্রয়োজনীয় সকল প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা— যেমন অক্সিজেন সিলিন্ডার, হুইলচেয়ার, বেড, প্রেসার মাপার যন্ত্র, ডায়াবেটিস পরীক্ষার ব্যবস্থাসহ অনান্য প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম।
নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন— শুধু নদীপথেই নয়, নৌকা থেকে নামার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতাল পর্যন্ত রোগী পৌঁছে দেওয়ার জন্যও ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু থাকবে। তিনি বলেন— এতদিন এই চরাঞ্চলের কোনো মানুষ অসুস্থ হলে শহরে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য ছোট বা বড় নৌকা রিজার্ভ করে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও অমানবিক। এমনকি যাত্রীবাহী নৌকায় রোগী নিতে হলে পুরো নৌকা যাত্রীতে ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। দুঃখজনক হলেও সত্য, এমন অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মাঝ নদীতেই প্রাণ হারিয়েছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অবহেলিত এই চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কথা বলে নারায়ণপুর এলাকায় একটি প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে অবহেলিত। তাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ যাতে দ্রুত ও সহজে চিকিৎসা পায়, সে লক্ষেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন— সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক লতিফুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু বকর, জেলা প্রকাশনা সম্পাদক প্রফেসর শহিদুল্লাহ, পৌর আমির হাফেজ গোলাম রাব্বানী, সদর উপজেলা আমির হাফেজ আব্দুল আলীমসহ অন্যরা।