পড়াশোনার প্রয়োজনে গুগলে তথ্য খোঁজা স্কুলপড়ুয়াদের কাছে খুবই পরিচিত অভ্যাস। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা, নতুন বিষয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কিংবা প্রজেক্টের জন্য তথ্য সংগ্রহ সব ক্ষেত্রেই ভরসা গুগল সার্চ। কিন্তু এবার সেই পরিচিত সার্চ পরিষেবা নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। গুগলের দাবি, তাদের সার্চ ইঞ্জিন থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে পুরোপুরি আলাদা করে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। ফলে কোনো স্কুল যদি শিক্ষার্থীদের জন্য গুগলের এআই পরিষেবা বন্ধ করে দেয়, তাহলে তারা গুগল সার্চ-ও ব্যবহার করতে পারবে না। সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একাধিক নতুন এআই সুবিধা চালুর কথা জানিয়েছে গুগল। পাশাপাশি স্কুল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের হাতে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে সংস্থাটি। তবে এই নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সার্চ পরিষেবাকে যুক্ত করায় প্রশ্ন উঠেছে, স্কুলে এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি হলে তার প্রভাব কি সাধারণ ইন্টারনেট
সার্চের ওপরও পড়বে? এআই বন্ধ করলে সার্চও বন্ধ কেন?
গুগলের শিক্ষা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস ফিলিপসের বক্তব্য, বর্তমানে সার্চ ইঞ্জিন ও এআই প্রযুক্তি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে সার্চ পরিষেবা থেকে এআইকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার সুযোগ নেই। কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি শিক্ষার্থীদের জন্য গুগলের এআই সুবিধা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা গুগল সার্চ-এও প্রবেশ করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে তাদের স্ক্রিনে স্কুলের পক্ষ থেকে পরিষেবা বন্ধ থাকার বার্তা দেখানো হবে। গুগলের এই অবস্থান নিয়েই মূলত আপত্তি উঠেছে। কারণ, সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করা এবং এআইয়ের সাহায্যে কোনো প্রশ্নের উত্তর তৈরি করা এক বিষয় নয়। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শুধু ওয়েবসাইট, বই বা নির্ভরযোগ্য সূত্র খুঁজতেই সার্চ ব্যবহার করে। সেখানে এআই বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ সার্চও আটকে গেলে শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
গুগলের সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন বিতর্ক?
যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি অভিযোগ করেছেন, গুগল নিজেদের সার্চ পরিষেবার শক্তিশালী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে স্কুলগুলোকে এআই ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। আমেরিকার ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সাবেক প্রধান লিনা খানও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, একটি জনপ্রিয় সার্চ পরিষেবার সঙ্গে এআই ব্যবহারের শর্ত জুড়ে দিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব স্কুল শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, তথ্যের নির্ভুলতা কিংবা প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে চিন্তিত, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পড়ুয়াদের জন্য আসছে গাইডেড লার্নিং
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় এআইয়ের ব্যবহার আরও কার্যকর করতে ‘গাইডেড লার্নিং’ নামে একটি সুবিধা আনছে গুগল। এর উদ্দেশ্য শুধু প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীকে ধাপে ধাপে বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করা। ধরা যাক, কোনো শিক্ষার্থী জটিল অঙ্ক বা পদার্থবিদ্যার একটি সমস্যা সমাধান করতে পারছে না। এই সুবিধা তাকে একবারে উত্তর না দিয়ে বিভিন্ন ধাপ বুঝিয়ে সমাধানের পথে এগিয়ে নিতে পারে। ফলে শিক্ষার্থী শুধু উত্তর মুখস্থ না করে সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করতে হয়, তা শেখার সুযোগ পাবে। গুগলের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শিক্ষায় এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। তবে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন নিজেরা চিন্তা করতে শেখে, তথ্য যাচাই করে এবং এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুলের সিদ্ধান্ত, নাকি প্রযুক্তি সংস্থার শর্ত?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। একদিকে এআই দ্রুত তথ্য খুঁজে দিতে পারে, কঠিন বিষয় সহজ করে বুঝিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে ভুল তথ্য, নকল করার প্রবণতা এবং নিজে চিন্তা করার অভ্যাস কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই অনেক স্কুল এআই ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। কিন্তু এআই বন্ধ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে যদি সাধারণ সার্চ পরিষেবাও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের তথ্য পাওয়ার বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠবে, প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম ঠিক করার অধিকার কার হাতে থাকা উচিত স্কুলের, নাকি প্রযুক্তি সংস্থার?
একসময় বইয়ের পাতা উল্টে জ্ঞান খুঁজত শিক্ষার্থীরা, পরে সেই জায়গা নেয় ইন্টারনেট। এখন সেই ইন্টারনেটেও এআইয়ের প্রভাব বাড়ছে। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, শেখার পদ্ধতিও বদলাবে। তবে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে যেন জানার দরজাটাই বন্ধ হয়ে না যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।