বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বিষয়ক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়েছে| বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এই কর্মসূচির আয়োজন করে জেলা তথ্য অফিস| প্রেস ব্রিফিংয়ের একপর্যায়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ড. কেরামত আলী| মূল আলোচনা করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী| অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন— চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি গোলাম মেস্তফা মন্টু ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ, ˆদনিক চাঁপাই দর্পণ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক আশরাফুল ইসলাম রঞ্জুসহ অন্যরা|
প্রচারপত্রের মাধ্যমে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেন জেলা তথ্য অফিসার রূপ কুমার বর্মন|
প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, করবো কাজ, গড়বো দেশ’— এই স্লোগানের ভিত্তিতে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উক্তি ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এর আলোকে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে|
নির্বাচনী ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতিতে মোটা দাগে যা ছিল তার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড অন্যতম| এই ফ্যামিলি কার্ড হলো বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের একটি ডিজিটাল, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রবর্তিত একটি স্মার্ট কার্ড| প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে, নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চতকরণে, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নয়নের লক্ষে ফ্যামিলি কার্ড প্রবর্তন করেছে বর্তমান সরকার| পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা হবে| প্রায় ৪ কোটি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে| প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১০ মার্চ রাজধানীর কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে বিশেষ এ ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন করেন| প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৪ উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ৩৭ হাজার ৫৬৭টি হতদরিদ্র পরিবার প্রতি মাসে ২৫০০/- টাকা হারে এ সুবিধা পাবে|
ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগীরা হলেন— দরিদ্র, যাদের আয়ের কোনো স্থায়ী বা সুনির্দিষ্ট উৎস নেই, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা নারী, যারা পরিবার পরিচালনা করছেন (বিধবা ভাতা প্রাপ্ত নারী ব্যতীত), প্রতিবন্ধী সদস্য আছে এমন পরিবার, ভূমিহীন পরিবার, দিনমজুর ও শ্রমিক ইত্যাদি|
সরকারের আরেকটি প্রতিশ্রুতি ছিল নদী, খাল খনন ও পুনর্খনন| শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনর্বাস্তবায়নের মাধ্যমে বর্তমান সরকার আগামী ৫ বছরে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন, পুনর্খনন ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে| এর ফলে দেশে হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী, হাজার হাজার খাল ও তাদের পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচ ব্যবস্থার উন্নতি করা হবে| প্রথম পর্যায়ে ৫৪টি জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে| যার মূল লক্ষ্য জলাবদ্ধতা নিরাসন করা, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা| খাল খননের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৬ মার্চ দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার শাহাপাড়ায় খাল খননের কাজ উদ্বোধন করেন|
এ কর্মসূচির আওতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নবাব খাল খনন উদ্বোধন করা হয় এবং এই খালের প্রায় ৫ কিলোমিটার পুনর্খনন করা হচ্ছে| এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় আগামী ৫ বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আরো ২৬টি খাল খনন করা হবে, যার মোট ˆদর্ঘ্য ২৪৭.২৫ কিলোমিটার|
সরকারের আরেকটি কর্মসূচি হচ্ছে— বৃক্ষ রোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ| ‘সবুজ হোক দেশ, নির্মল হোক পরিবেশ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে সারাদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার| পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করা হবে| এ উদ্যোগের মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ৩.৫ লক্ষাধিক সবুজ কর্মসংস্থান ˆতরি হবে, যেখানে নারী, যুবক-যুবতী ও গ্রামীণ জনগণ সমানভাবে অংশ নিবে| একইসঙ্গে ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা গড়ে তোলা হবে, যা ২.৫ লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে| পরিবেশ সুরক্ষায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে| যার লক্ষ্য হলো একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্জীবিত বাংলাদেশ, যেখানে বর্জ্যই নতুন সম্পদ এবং পরিবেশ উন্নয়নের শক্তি| বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে সরকার একটি সার্কুলার মডেল প্রতিষ্ঠিত করবে, যেখানে বর্জ্যকে রূপান্তর করা হবে সম্পদে|
আরেক কর্মসূচির নাম নারীর জন্য গাড়ি| উন্নত সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষে নারীদের চলাচলে স্বকীয়তা, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ও নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষে বিআরটিসির মাধ্যমে মহিলা বাস সার্ভিস চালু করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার| এ কর্মসূচির আওতায় ঢাকায় পরিবেশবান্ধব ইলেক্ট্রিক বাস এবং নারীদের জন্য নিরাপদ বিশেষায়িত বাস সার্ভিস চালু করা হবে, যা রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ˆবপ্লবিক পরিবর্তন আনবে| যেখানে নারীরাই চালকসহ সকল কিছু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবেন|
সরকারের অন্যতম কর্মসূচি হচ্ছে কৃষক কার্ড বিতরণ ও কৃষি ঋণ মওকুফ| ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, গড়বো সুফলা বাংলাদেশ’— এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের ভর্তুকি, সহজ লোন, বীজ ও সারসহ ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হবে| যেমন— ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তি, মোবাইল ফোনে আবহাওয়া পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য, ফসলের রোগবালাই সংক্রান্ত পরামর্শ ও ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা| প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রথম পর্যায়ের কৃষক কার্ডের এই সুবিধার শুভ উদ্বোধন করেন|
এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা বছরে ২৫০০/- টাকা নগদ সুবিধা পাবেন| প্রাথম ধাপে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার প্রায় ২১ হাজার কৃষককে এ কার্ড প্রদান করা হবে| এর ফলে আগামী ৪ বছরে দেশের প্রায় ১৬.৫ মিলিয়ন (১ কোটি ৬৫ লাখ) কৃষক এই কার্ডের আওতায় চলে আসবে| বর্তমান সরকার শপথ গ্রহণের পরেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে| এই সুবিধার আওতায় শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ঋণ নেয়া প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মোট ১৫৫০ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ করা হবে|
ব্রিফিংয়ে জেলা তথ্য অফিসার রূপ কুমার বর্মন জানান, সরকারের ইশতেহারের এসব বিষয় ছাড়াও বাল্যবিয়ে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে গণযোগাযোগ অধিদপ্তর প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে| সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ১৮০ দিনের বিশেষ প্রচার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে| এ কর্মসূচির আওতায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মে পর্যন্ত ১ হাজার ২১টি উঠান ˆবঠক/কমিউনিটি সভা, ২০২টি নারী সমাবেশ, ১৪টি কৃষক সমাবেশ, ২২টি ফ্যামিলি সমাবেশ, ২ হাজার ৩১৬টি অনলাইন প্রচার, ৩৪০টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানের লাইভ প্রচার, ১৪টি ˆনতিকতা উন্নয়ন বিষয়ক সভা ও কুইজ প্রতিযোগিতা, ১১ হাজার ৬০টি চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও সড়ক প্রচার/মাইকিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে|
জেলা তথ্য অফিসার আরো জানান, একই সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬টি উঠান ˆবঠক/কমিউনিটি সভা, ২টি নারী সমাবেশ, ১৪৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শন, ৩৩টি অনলাইন প্রচার, ৪টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানের লাইভ প্রচার ও ৪৭ ইউনিট সড়ক প্রচার/মাইকিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছেন|
রূপ কুমার বর্মন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে যাতে বাংলাদেশ একটি উন্নত, ˆবষম্যহীন মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’— এ লক্ষে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে|