চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আব্দুল ওয়াহেদ বলেছেন, প্রায় দুই বছর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলকায় ডেঙ্গু জ্বর আক্রান্ত রোগী দেখা দিতে শুরু করে। গত কয়েক মাসে চাঁপাইনবাগঞ্জ পৌর এলাকায় ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করেছে। যার কারণে চেম্বারের সম্মানিত সদস্য ওবাইদুল আজিম রিংকুসহ আরো অনেকে মৃত্যু বরণ করেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ থেকে ৭৫ জন মানুষ মারা গেছে। এক মসজিদপাড়া গোরস্থানেই ১৩ জনকে দাফন করা হয়েছে। যার রেকর্ড জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই।
তিনি বলেন— বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় ঘরে ঘরে ডেঙ্গু জ্বর আক্রান্ত রোগী বাড়ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা মহামারী আকার ধারণ করেছে। এই কারণে আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের পৌর এলাকাকে ডেঙ্গুর রেড জোন বা ডেঙ্গু মহামারী এলাকা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা হতে ১৫ থেকে ২০ জন ডেঙ্গু রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি টিম গঠন করে জরুরিভাবে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে প্রেরণের জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।
শনিবার দুপুরে ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতা বিষয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি কথাগুলো বলেন। এই সভার আয়োজন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। সভায় সভাপতিত্ব করেন চেম্বার সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ।
আব্দুল ওয়াহেদ অভিযোগ করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় জনপ্রতিনিধি না থাকায় শহরের প্রতিটি এলাকা অপরিষ্কার ও ময়লা আবর্জনা এবং পানি জমে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেনেসহ উন্নয়ন মূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। যা সঠিকভাবে তদারকির অভাবে বিভিন্ন এলাকায় খাল খনন করে বন্ধ না করা, খালে পানি ও ময়লা জমে থাকায় ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করেছে। মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরে এত মানুষ মৃত্যুবরণ করেনি, যতটা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য পুরোপুরি সঠিক নয়, কেননা ৮০ ভাগ রোগী নিজ বাড়িতে থেকে অথবা ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নেয়। ফলে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য সঠিক পাওয়া যায় না। এমনকি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর বা উন্নত চিকিৎসার জন্য গিয়ে সেখানে মারা গেলেও কোনো তথ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের রেকর্ডে থাকে না।
আবদুল ওয়াহেদ বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা, মশার প্রজননস্থল (যেমন আজাইপুর বিল, বেলেপুকুর, বিদিরপুর, মহানন্দা নদীর পাড়সহ শহরের বিভিন্ন নদী, বিল, পুকুর ধারে ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখায় মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়েছে) ধ্বংস এবং জনগণকে সচেতন করার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। সুপারিশগুলো হলো—
০১. অবিলম্বে পৌরসভার প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বদলীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন করা আব্যশক।
০২. চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় উন্নয়ন মূলক কাজ দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করে খননকৃত খাল ও ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
০৩. জরুরি ভিত্তিতে চাঁপাইনবাগঞ্জ পৌরসভা এলাকার প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট স্থানে ডাস্টবিন এবং ময়লা আবর্জনা ডাম্পিং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
০৪. ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
০৫. প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও প্রতিষ্ঠানের আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
০৬. ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
০৭. পানি সংরক্ষণের পাত্র অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে এবং নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
০৮. এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
০৯. ডেঙ্গুর উপসর্গ জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
১০. ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিহার করে স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
১১. ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে।
১২. ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সমাজ, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ আরো জোরদার করতে হবে।
পরিশেষে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন এবং সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করেন চেম্বার সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ। সেই সঙ্গে সাত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ব্যবসায়ীদের নিয়ে আন্দোলনে নামার হুশিয়ারি দেন তিনি।
চেম্বার ভবনে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন— সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি খায়রুল ইসলাম, সাবেক সহসভাপতি মনোয়ারুর ইসলাম ডালিমসহ অন্যরা।