গ্রামবাংলার হারানো লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে শনিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ‘পোসালু উৎসব’। খবাবারের পাশাপাশি গান, কবিতা আবৃত্তি ও নানা ধরনের খেলাধুলায় মুখরিত ছিল পুরো আয়োজন। এলাকার প্রায় ৮০ জন শিশু এই আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে।
রহনপুর পৌর এলাকার পুনর্ভবা নদীঘেঁষা বাবুরঘোন মহল্লায় উত্তর রহনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিক মমতাজ বেগমের বাড়িতে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। শিশুদের পাশাপাশি গ্রামের নারী ও শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরাও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে সহযোগিতা করেন।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, উৎসব আয়োজনের জন্য অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৬০ টাকা করে চাঁদা এবং বাড়ি থেকে চাল সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত চাল ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে শিশুদের জন্য সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করা হয়, যার মধ্যে ছিল ডিম, মাংস, ডাল, শাকসবজি ও শসা। রান্নাবান্নার পাশাপাশি দিনব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও খেলাধুলা চলে। প্রতিবছরই নিজ উদ্যোগে এ ধরনের উৎসবের আয়োজন করে আসছেন শিক্ষিক মমতাজ বেগম।
উৎসবে অংশ নেয়া শিশু শিক্ষার্থী মাহমুদা খাতুন মিম আনন্দ প্রকাশ করে বলে, পোসালু উৎসবে এসে আমার খুব ভালো লেগেছে। বন্ধুদের সঙ্গে গান, কবিতা ও খেলাধুলায় অংশ নিতে পেরে দারুণ আনন্দ পেয়েছি। প্রতিবছর এমন আয়োজন হলে আমরা সবাই মিলে আনন্দ করতে পারব।
আরেক শিক্ষার্থী নিরব বলে, বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে খেলাধুলা ও আনন্দ করার সুযোগ পেয়ে খুব ভালো লেগেছে। অনেক কিছু শিখলাম ও জানলাম এই পোসালু উৎসবে।
রহনপুর রাবেয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শোয়াযেব আলী বলেন, আমাদের গ্রামীণ কৃষ্টি ও ঐতিহ্যগুলোকে নতুন প্রজন্মের সামনে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ ধরনের লোকজ উৎসবের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শিশুরা যাতে নিজেদের সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে শেখে এবং যান্ত্রিকতার ভিড়ে আনন্দময় শৈশব পায়, সে ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ বিশেষ ভুমিকা রাখবে।
হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক মাহবুবুল আলম জন বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার সুযোগ পেলে শিশুরা নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পায়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।
সিনিয়র সাংবাদিক আতিকুল ইসলাম আজম বলেন, গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্য ও শিকড়ের অংশ। আধুনিকতার প্রভাবে অনেক ঐতিহ্যবাহী কর্মকাণ্ড আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এ অবস্থায় শিশুদের সম্পৃক্ত করে পোসালু উৎসবের মতো আয়োজন সংস্কৃতি সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের উদ্যোগকে সামাজিক ও সামষ্টিকভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
আয়োজক শিক্ষিকা মমতাজ বেগম বলেন, “শিশুদের আনন্দ দেয়া এবং তাদের মাঝে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরার লক্ষ্যেই প্রতিবছর এ উৎসবের আয়োজন করি। শিশুদের পাশাপাশি গ্রামের নারীরা ও অভিভাবকেরা সহযোগিতা করেন। সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে উৎসবটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতেও এ আয়োজন অব্যাহত রাখতে চাই"।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শিশুদের নিয়ে এমন আয়োজন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং এটি পারস্পরিক সম্প্রীতি, সামাজিক বন্ধন ও লোকজ সংস্কৃতি চর্চার এক অনন্য মাধ্যম। এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত থাকলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা আরো বৃদ্ধি পাবে। অন্য অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ওই মহল্লার সর্দার আশরাফুল ইসলাম, ইমাম মাসুদ দীন ইসলাম, সাংবাদিক আল-মামুন বিশ্বাস, ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী ডালিমসহ অনেকে।