সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৮ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: September 21, 2026
September 21, 2026
আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

তিন বছর পর ক্লাসরুমে ফিরল গাজার শিশুরা

Published: September 21, 2026 at 01:09 PM
তিন বছর পর ক্লাসরুমে ফিরল গাজার শিশুরা

ভাঙাচোরা ভবন, তাঁবু আর টিনের ছাপড়ার নিচে গাদাগাদি করে বসেছে শিশুরা। হাতে নেই নতুন খাতা-কলম, গায়ে নেই পরনের ইউনিফর্ম। তবুও মুখে বইছে শিক্ষার আলোয় ফেরার আনন্দ। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর গাজা উপত্যকায় ফের সরাসরি শুরু হয়েছে স্কুল পাঠদান কর্মসূচি। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বলেছে, যুদ্ধকালে গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার শিক্ষা কর্মকর্তারা বলেছেন, সংঘাতে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিশু এতদিন সরাসরি স্কুলে পাঠদান ও স্বাভাবিক শিক্ষাগ্রহণ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল। গাজার পূর্বাঞ্চলীয় খান ইউনিসের শিক্ষা পরিচালক ইব্রাহিম রমদান বলেন, ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২২ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৫৩২ জন শিক্ষকসহ ৭৭০ জনেরও বেশি শিক্ষাকর্মী নিহত হয়েছেন। এই মর্মান্তিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও আবার স্কুল খোলাকে আশার আলোর মাঝে ভঙ্গুর এক শুভ সূচনা হিসেবে দেখছেন তারা। খান ইউনিসের শিক্ষার্থী মোয়ায়েদ আবু মুস্তফা বলে, “তিন বছর আগে শেষবার স্কুলে গিয়েছিলাম। আজ নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হচ্ছে; এটি আমাদের জন্য আনন্দ আর সাফল্যের বছর।” চরম দাবদাহের মধ্যে বাতাস চলাচলের সুবিধাহীন তাঁবুর মেঝেতে বসে ক্লাস করতে হচ্ছে তাকে। পায়ে নেই ভালো জুতো, হাতে নেই খাতা-কলম, আর যুদ্ধে হারিয়েছে খেলার সাথীদের। তবুও তার অদম্য বার্তা, “এত কিছুর পরও আমরা শিখব; তাঁবুর নিচে বসেই শিখব।” বাস্তুচ্যুত পরিবারের সঙ্গে তাঁবুতে বসবাসকারী ১৫ বছর বয়সী সমর আবু সালমিও ফিরেছে ক্লাসে। এক অস্থায়ী স্কুলের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সে বলে, “মোবাইলের পর্দায় পড়ালেখা করেছি, শিক্ষকদের সামনাসামনি দেখিনি দীর্ঘদিন। এখন এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে গিয়ে হলেও নিজের স্বপ্নটা পূরণ করতে চাই।” যুদ্ধের আগের স্মৃতি মনে করে সে বলে, আগে খাতা, কলম, জামাকাপড়; সবকিছুই খুব সহজে আর সস্তায় পাওয়া যেত। 


শিক্ষাসামগ্রীর চরম সংকট, আকাশছোঁয়া দাম

চারপাশের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরু করেছে গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের স্থান দিতে তাঁবু, তেরপল, স্টিল ও কাঠ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বহু অস্থায়ী পাঠশালা। কোনোটি বালুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোনোটির শ্রেণিকক্ষে একটি ব্ল্যাকবোর্ড আর গুটিকয়েক গদি ছাড়া কিছুই নেই। কোনো কোনো স্কুলে আবার এখনও গাদাগাদি করে বাস করছে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো। ১৪ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী ইয়ামেন আবু সামরা বলে, “আগে আনন্দের সাথে স্কুলে যেতাম। কিন্তু এখন ক্লাসে আসার সময় মাথায় ঘোরে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি, রকেট আর হামলার ভয়। এখন এমন এক তাঁবুতে বসে আছি, যেখানে তীব্র রোদ আর গরম ছাড়া কিছু নেই।” গাজার শিক্ষা কর্মকর্তারা বলেছেন, চলতি বছর ইউনিসেফের সহায়তায় অন্তত ৫ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী এসব অস্থায়ী বেসরকারি স্কুল ও লার্নিং সেন্টারে সরাসরি অংশ নেবে। আর যারা উপস্থিত হতে পারছে না বা গাজা ছেড়েছে, তাদের জন্য অনলাইন শিক্ষা অব্যাহত রাখা হয়েছে। গত বছরের যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। যুদ্ধবিরতির ফলে বড় ধরনের সংঘাত সাময়িক থামলেও সংকটের অবসান ঘটেনি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এদিকে, ইসরায়েলি আমদানিনিষেধের কারণে শিক্ষা উপকরণের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজার স্থানীয় ব্যবসায়ী খালেদ আলিয়ান। তিনি বলেন, “যে খাতাটির দাম আগে ছিল ৩ শেকেল (১ ডলার), তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫ শেকেলে। বর্তমানে সব জিনিসের দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।” শিক্ষা উপকরণ আটকে দেওয়া ও স্কুলে হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের সামরিক সংস্থা কোগাট কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ইসরায়েল বরাবরের মতোই অভিযোগ করে বলেছে, হামাস স্কুলগুলোকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। যদিও এই দাবি শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে হামাস।