রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৫শে শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৪ সফর ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, বন্ধ তিন বিভাগের সেবা নাচোলে ঈদগাহ ও গোরস্থানের উন্নতি কল্পে আলোচনা সভা চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে সারের জন্য ভোর থেকেই কৃষকের লাইন শিবগঞ্জে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় এমপি কেরামত আলীর শিবগঞ্জ বিজিবি’র অভিযানে জব্দ নেশাজাতীয় সিরাপ, গ্রেপ্তার একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জে শ্বাসকষ্ট নিয়ে আরো ৩ শিশু হাসপাতালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ৫৫ রোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহভাজন ১ জন শনাক্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে একদিনে আরো ৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনভর্বার নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত
Printed on: August 09, 2026
August 07, 2026
জাতীয়
জাতীয়

মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমানো সম্ভব : ড. মুশতাক হোসেন

Published: August 07, 2026 at 12:30 PM
মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমানো সম্ভব : ড. মুশতাক হোসেন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেছেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল হাসপাতালে নয়, শুরু হতে হবে মানুষের বাসা-বাড়ি, পাড়া-মহল্লা, বিদ্যালয়, কর্মস্থল এবং স্থানীয় জনসমাজ থেকে।

তিনি বলেন, রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেয়া, দরিদ্র রোগীদের সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া গেলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু ও ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। 

ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বর্ষার সময় বৃষ্টিকে যদি আমরা ডেঙ্গুর জন্য শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখি, তাহলে সংকট আরো গভীর হবে। কিন্তু প্রতিবার বৃষ্টির পর যদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা যায়, তাহলে ডেঙ্গুর এই বার্ষিক দুর্ভোগ থেকে দেশকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা সম্ভব।’

তিনি বলেন, বর্ষাকাল বাংলাদেশের মানুষের কাছে যেমন স্বস্তির, তেমনি জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের সময়। টানা বা থেমে থেমে বৃষ্টি, আর্দ্র আবহাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানি সব মিলিয়ে এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য তৈরি হয় আদর্শ পরিবেশ। ফলে প্রতিবছরই বর্ষা ঘিরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে।

তিনি আরো বলেন, চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। ইতোমধ্যে জুনের তুলনায় জুলাই মাসে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে আশঙ্কা করা যায়, আগস্টে এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ে না; এর পেছনে কাজ করে একটি নির্দিষ্ট জৈবিক চক্র।

এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, অনেকেই মনে করেন, বৃষ্টি হলে মশা কমে যায়। বাস্তবতা ভিন্ন। বৃষ্টির সময় পূর্ণবয়স্ক এডিস মশা গাছের পাতা, ঝোপঝাড়, ঘরের কোণা কিংবা অন্যান্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। বৃষ্টি চলে গেলেই মশা সক্রিয় হয়। অন্যদিকে মশার ডিম বৃষ্টির পানিতে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, এডিস মশার ডিমের গায়ে আঠালো আবরণ থাকায় তা বিভিন্ন পাত্র, দেয়ালের কিনারা বা পানির ধার ঘেঁষে আটকে থাকে। অনুকূল পরিবেশ পেলে তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে সেখান থেকে লার্ভা বের হয়। এরপর সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে সেই লার্ভা পূর্ণবয়স্ক মশায় পরিণত হয় এবং ভাইরাস বহনকারী কোনো রোগীকে কামড়ালে সে নিজেও সংক্রমিত হয়। পরে সেই মশা যখন আরেকজন সুস্থ মানুষকে কামড়ায়, তখন ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো- আমরা এখনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সক্রিয় হই। অর্থাৎ সংকটের শেষ ধাপে গিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার প্রবণতা বেশি। বড় হাসপাতালের আইসিইউ, বিশেষায়িত চিকিৎসা কিংবা সংকটাপন্ন রোগীকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো রোগী যেন সেই জটিল অবস্থায় পৌঁছাতে না পারে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব না দিলে কেবল তৃতীয় সর্বোচ্চ স্তরের (টারসিয়ারি) চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গুর মৃত্যু কমানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত তৃণমূল পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা। সরকারিভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও তা এখনো সবার কাছে সহজলভ্য নয়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি, নিম্ন আয়ের এলাকা কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য জ্বরের শুরুতেই পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি বিনামূল্যে পরীক্ষা করা যায় এবং রোগী শনাক্ত হয়, তাহলে তাকে যথাযথ পরামর্শ দেয়া সম্ভব হবে।

আইইডিসিআরের সাবেক এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলাকে কেবল স্বাস্থ্যসেবার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; এটি সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ও। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে এসে অসুস্থ দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও ন্যূনতম সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

সব ডেঙ্গু রোগীকে রাজধানীর বড় হাসপাতালে ভর্তি করারও প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বরং যারা ঝুঁকিপূর্ণ যেমন- গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী, অপুষ্ট শিশু, অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তি কিংবা অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষ তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্, জেলা হাসপাতাল কিংবা নির্ধারিত মাধ্যমিক পর্যায়ের হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। এতে রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ার আগেই চিকিৎসকের নজরদারিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর চাপও কমবে।

মশা নিয়ন্ত্রণেও প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে যেতে হবে উল্লেখ করে ড. মুশতাক বলেন, শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছড়ানো বা মৌসুমি পরিদর্শন করে জরিমানা আদায় যথেষ্ট নয়। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত গাড়ি, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ড্রাম, ফুলের টব, ভাঙা পাত্র কিংবা রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে নিয়মিত লার্ভা ধ্বংসের ব্যবস্থা করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে, যেখানে মানুষ দীর্ঘদিন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে, সেখানে নিরাপদ লার্ভানাশক বা পানি বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে জনগণকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা জরুরি।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, ডেঙ্গু প্রতিরোধেও তেমন সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। বরিশাল, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তাই এটিকে একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি সংগঠন সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। খবর-বাসস এর।