মঙ্গলবার ০৬ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
আমার মেয়ের ডেঙ্গু রোগ ও আমার অজ্ঞতা, প্রত্যাশা ‘জনসচেতনতা’ পূজা উদযাপন পরিষদের সঙ্গে মতবিনিময় পুলিশের ডেঙ্গু নিধনে জেলা প্রশাসন গঠিত টিমের অভিযান অব্যাহত চাঁপাইনবাবগঞ্জে একদিনে ৭৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গুতে মৃত্যু এক ব্যবসায়ীর শিশুদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে : প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে স্থিতিশীল হলে সমন্বয়ের চিন্তা করবে সরকার : তথ্য উপদেষ্টা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ১৮০ কর্মকর্তাকে বিদ্যালয় পরিদর্শনের নির্দেশ ঢাকায় পদায়নে লটারির মাধ্যমে মনোনীত ১৮ সাব-রেজিস্ট্রার জনগণের সেবা করাই নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব : এলজিআরডি মন্ত্রী
Printed on: October 06, 2026
October 06, 2026
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর

আমার মেয়ের ডেঙ্গু রোগ ও আমার অজ্ঞতা, প্রত্যাশা ‘জনসচেতনতা’

Published: October 06, 2026 at 02:12 PM
আমার মেয়ের ডেঙ্গু রোগ ও আমার অজ্ঞতা, প্রত্যাশা  ‘জনসচেতনতা’

গৌতম কুমার বিশ্বাস

পুলিশ সুপার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা


ডেঙ্গু নিয়ে আমার ধারণা ছিল খুব সরল— প্লেটলেট কমলেই বিপদ, প্লেটিলেট ঠিক থাকলে ভয়ের কিছু নেই। আমার ১৩ বছরের মেয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর বুঝলাম, এই ধারণা শুধু ভুলই নয়, বিপজ্জনকও। মেয়ে এখন সুস্থ। কিন্তু এই কয়েক দিনে যা শিখেছি, তা না জানালে নিজেকে অপরাধী মনে হবে।

কী ঘটেছিল

২০ সেপ্টেম্বর মেয়ের জ্বর শুরু হয়। জ্বর উঠেছিল ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত। তৃতীয় দিনে বমি হয়, তারপর পাতলা পায়খানা। ২৩ সেপ্টেম্বর তাকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করি।

প্লেটলেট তখনো খুব বেশি কমেনি। আমি ভেবেছিলাম, তাহলে হয়তো বড় বিপদ নেই। কিন্তু চিকিৎসক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং ২৪ সেপ্টেম্বর কিছু বিশেষ পরীক্ষার পরামর্শ দেন। রাতে ফলাফল এলো এরকম—

* ডি-ডাইমার : ১১.৩১ (স্বাভাবিক <০.৫০, অনেক বেশি)

* ফেরিটিন : ৩১৬৮.৪০ (স্বাভাবিক ১৩-১৫০, অনেক বেশি)

* সিরাম প্রোক্যালসিটোনিন : ৪.৩৭ (স্বাভাবিক <০.০৫, অনেক বেশি)

এই ফলাফল দেখে চিকিৎসক তাৎক্ষণিক এমন হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন, যেখানে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (PICU) আছে। সেই রাতেই মেয়েকে স্কয়ার হাসপাতালের PICU-তে ভর্তি করি।

এরপর দুই দিনে ডেঙ্গুর আসল চেহারা ধরা পড়ল। প্লেটলেট নেমে গেল ৬০ হাজারে। আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রেতে পেটে ও ফুসফুসের আবরণে সামান্য পানি জমা এবং পিত্তথলির দেয়াল পুরু হওয়া দেখা গেল। রক্তে অ্যালবুমিন কমে গিয়েছিল, হাত-পা ফুলেছিল, লিভারের এনজাইম কিছুটা বেড়েছিল। সঠিক সময়ে ভর্তি, ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ আর মেপে মেপে স্যালাইন দেওয়ায় সে ধীরে ধীরে সেরে উঠল। প্লেটলেট বেড়ে ২ লাখ ৩২ হাজারে ফিরে এলো। শক বা বড় রক্তক্ষরণ হয়নি, অ্যান্টিবায়োটিকও লাগেনি।

ওই পরীক্ষাগুলোর মানে কী

* ডি-ডাইমার : রক্ত জমাট বাঁধা ও ভাঙার প্রক্রিয়ায় গোলমালের ইঙ্গিত দেয়।

* ফেরিটিন : শরীরে তীব্র প্রদাহ থাকলে বেড়ে যায়।

* প্রোক্যালসিটোনিন : বাড়লে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বা গুরুতর প্রদাহের সম্ভাবনা মাথায় রাখতে হয়। আমার মেয়ের রক্ত ও প্রস্রাবের কালচারে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়নি, তাই অ্যান্টিবায়োটিক লাগেনি।

* হেমাটোক্রিট (HCT) : রক্তে কণিকার অনুপাত। রক্তের জলীয় অংশ বেরিয়ে গেলে রক্ত ঘন হয় এবং এই মান বাড়ে।

* অ্যালবুমিন : রক্তের একটি প্রোটিন, যা তরলকে রক্তনালির ভেতরে ধরে রাখে। এটি কমলে ফোলা ও তরল জমার ঝুঁকি বাড়ে।

* প্লাজমা লিকেজ : ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রভাবে ছোট রক্তনালির দেয়ালের ভেদ্যতা বেড়ে যায়। নালি ছিঁড়ে না গেলেও রক্তের জলীয় অংশ (প্লাজমা) চুঁইয়ে বেরিয়ে পেটে, ফুসফুসের আশপাশে বা টিস্যুতে জমে। এতে রক্তনালিতে তরল কমে গিয়ে রক্তচাপ পড়ে যেতে পারে।

ডেঙ্গুর তিনটি পর্যায় ও ক্রিটিক্যাল ফেজ

১. জ্বরের পর্যায় (প্রথম ৩-৪ দিন) : তীব্র জ্বর, গা-ব্যথা, বমি। এ সময় রোগীকে সাধারণত স্পষ্টভাবে অসুস্থ দেখায়।

২. ক্রিটিক্যাল ফেজ (সাধারণত জ্বরের ৩য় থেকে ৭ম দিনের মধ্যে, প্রায় ২৪-৪৮ ঘণ্টা) : এটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। কঠিন বাস্তবতা হলো, এ সময়েই জ্বর কমে আসে, তাই বাবা-মায়ের মনে হয়, “এবার ভালো হচ্ছে।” অথচ ঠিক তখনই প্লাজমা লিকেজ বাড়তে পারে, প্লেটলেট দ্রুত নামতে পারে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে। রোগী বাইরে ঠিক দেখালেও ভেতরে অবস্থা খারাপ হতে থাকে।

* ক্রিটিক্যাল ফেজে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ঝুঁকি

* প্লাজমা লিকেজ চলতে থাকলে রক্তনালিতে তরল কমে যায় এবং রক্তচাপ পড়ে যেতে পারে। এর চূড়ান্ত রূপ ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। রক্তচাপ বেশিক্ষণ কম থাকলে লিভার ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছায় না। দীর্ঘক্ষণ এই অবস্থা চললে অঙ্গগুলো বিকল হতে শুরু করে। এর সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাস সরাসরি লিভারের কোষে আঘাত করেও তীব্র লিভার-ক্ষতি ঘটাতে পারে।

* সব রোগীর এমন হয় না। সময়মতো ধরা পড়লে এবং সঠিক তরল ব্যবস্থাপনা পেলে বেশিরভাগ রোগী এ পর্যায় পেরিয়ে যান। বিপদ হয় তখনই, যখন সতর্কসংকেত চোখ এড়িয়ে যায়।

* যা দেখলে দেরি করা যাবে না : প্রস্রাব কমে যাওয়া, চোখ বা শরীর হলদে হওয়া, অতিরিক্ত ঝিমুনি বা অস্থিরতা, তীব্র পেটব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠাণ্ডা ও ফ্যাকাশে হাত-পা।

৩. সেরে ওঠার পর্যায় (পরের ২-৩ দিন) : বেরিয়ে যাওয়া তরল ধীরে ধীরে রক্তে ফিরে আসে, জ্বর থামে, ক্ষুধা ফেরে, প্লেটলেট বাড়ে, গায়ে র‌্যাশ উঠতে পারে। আমার মেয়ের ক্ষেত্রে নবম দিনেও কিছুটা জ্বর ফিরে এসেছিল। এ সময়ও চিকিৎসকের নজরদারি দরকার।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত দুটি লেখায় চিকিৎসকেরা একই কথা বলেছেন। অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান (প্রথম আলো, ১১ আগস্ট ২০২৩) লিখেছেন, ডেঙ্গুতে প্লেটলেট ঠিক থাকলেই রোগী দুশ্চিন্তামুক্ত, এমনটা নয়। তাঁর ভাষ্য, ডেঙ্গুতে রোগী প্লেটলেট কমার কারণে নয়, বরং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে মারা যান। 

ডা. মো. আরিফ উর রহমান (প্রথম আলো, ২২ আগস্ট ২০২২) পেটব্যথা ও বমি, গায়ে লাল-কালো দাগ, রক্তক্ষরণ, প্রস্রাব কমে যাওয়া এবং কিছুই খেতে না পারাকে হাসপাতালে ভর্তির সংকেত বলেছেন।

ডব্লিউএইচও-র নির্দেশনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ডেঙ্গুর কিছু সতর্কসংকেত চিহ্নিত করেছে। এর যে কোনোটি দেখা দিলে রোগীকে হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন :

- তীব্র বা ক্রমাগত পেটব্যথা

- বারবার বমি

- শরীরে তরল জমার লক্ষণ (পেট ফোলা, শ্বাসকষ্ট)

- মাড়ি, নাক বা অন্য কোথাও থেকে রক্তক্ষরণ

- অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা বা ঝিমুনি

- লিভার বড় হয়ে যাওয়া

- প্লেটলেট দ্রুত কমার সঙ্গে হেমাটোক্রিট বেড়ে যাওয়া

WHO আরো পরামর্শ দেয় : পর্যাপ্ত তরল খাওয়ানো, জ্বরে শুধু প্যারাসিটামল দেওয়া, আর অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ব্যথানাশক এড়ানো।

অভিভাবকদের জন্য কয়েকটি কথা

১. শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখে নিশ্চিন্ত হবেন না। রোগী সার্বিকভাবে কেমন আছে, সেটাই আসল।

২. জ্বর কমলেই ভালো হয়ে গেছে, এমন ভাববেন না। ওই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

৩. প্রস্রাবের পরিমাণ, পেটব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঝিমুনি বা ঠাণ্ডা হাত-পা দেখলে দেরি করবেন না।

৪. ঘরে নিজে নিজে স্যালাইন বা ওষুধ চালাবেন না। কোন রোগীর কোন পরীক্ষা লাগবে, তা চিকিৎসক ঠিক করবেন।

৫. আগে ডেঙ্গু হয়ে থাকলে আরো সতর্ক থাকবেন। পরবর্তী সংক্রমণে জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে।

শেষ কথা

আজ ভাবি, সেদিন যদি শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা আর মেয়ের মুখের হাসি দেখে নিশ্চিন্ত থাকতাম, তাহলে কী হতো। চিকিৎসকের সতর্কতা আর সময়মতো পাওয়া সঠিক চিকিৎসাই আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়েছে। ডেঙ্গু শুধু প্লেটলেটের অসুখ নয়। এই কথাটি আমি সবাইকে জানাতে চাই, যাতে কাউকে মূল্য দিতে না হয়।