আহমেদ ফ্রান্স
সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়। আর লোকসংস্কৃতি হলো সেই আত্মপরিচয়ের প্রাণভোমরা। পদ্মা-মহানন্দা বিধৌত চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি ও মানুষের কণ্ঠে যে সুর বাজে, যে ছন্দে জীবন দোলে তাকে ধারণ, লালন ও জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার অদম্য প্রয়াস থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট’।
দেখতে দেখতে ১৯টি বসন্ত পেরিয়ে ২০ বছরে পদার্পণ করল আমাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান। এই দীর্ঘ পথচলা কেবল একটি সংগঠনের টিকে থাকার গল্প নয়, এটি অঞ্চলের হাজার বছরের লোকঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক নিরন্তর সংগ্রামের ইতিহাস।
২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর। যখন চারদিকে অপসংস্কৃতির আগ্রাসন আর লোকসংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা, ঠিক তখনই চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক স্বপ্নদ্রষ্টা আলোর মশাল হাতে এগিয়ে এলেন সাংস্কৃতিক-সংগঠক, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির কর্ণধার মো. হাসিব হোসেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল— “বিশ্বায়নের যুগে টিকতে হলে শেকড়কে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে হবে।”
সেই বিশ্বাস থেকেই দিন-রাত পরিশ্রম করে, মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরের মাটির শিল্পীদের খুঁজে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট। কিছু দেশীয় বাদ্যযন্ত্র আর বুকভরা স্বপ্ন। শুরু হলো পথচলা।
প্রয়াস ফোক থিয়েটার একটি পূর্ণাঙ্গ লোক-গবেষণাগার, একটি চলমান স্কুল। গত ১৯ বছরে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করে চলেছি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রাণ গম্ভীরা। সামাজিক অসঙ্গতি, দুর্নীতি ও লোকশিক্ষাকে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে তুলে ধরে গম্ভীরাকে আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করেছি। হারিয়ে যেতে বসা আলকাপের ছোকরা-ছোকরির নাচ আর কবিগানের তৎক্ষণাৎ বাক্যুদ্ধকে আমরা মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছি। সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা নিয়ে মঞ্চনাটক প্রযোজনা ও পরিবেশনা করেছি। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া থেকে শুরু করে লালন-হাসনের বাউল দর্শন— সবই আমাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। লোকজ নৃত্যের সাথে আধুনিক কোরিওগ্রাফির মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমরা নতুন ধারার পরিবেশনা তৈরি করেছি।
প্রয়াস শুধু পরিবেশনাই করে না, তৈরি করে। আমাদের রয়েছে নিয়মিত বাদ্যযন্ত্র চর্চা (দোতারা, ঢোল, বাঁশি, হারমোনিয়াম), নৃত্য প্রশিক্ষণ, অভিনয় ও আবৃত্তি প্রশিক্ষণ।
এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রাপ্তির খাতা নেহাত কম নয়। জেলা প্রশাসন, শিল্পকলা অ্যাকাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমির বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে অংশগ্রহণ ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, অসংখ্য গুণীজনের প্রশংসা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। সবচেয়ে বড় অর্জন— সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট প্রমাণ করেছে, লোকসংস্কৃতি দিয়েও সুস্থ বিনোদন ও সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব।
২০তম বর্ষে পদার্পণ করে আমাদের শপথ আরো দৃঢ়। আমরা চাই— চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি স্থায়ী লোকসংস্কৃতি আর্কাইভ ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা। গম্ভীরা ও আলকাপকে ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য গবেষণা ও প্রচারণা চালানো। প্রতিটি স্কুলে লোকসংস্কৃতি চর্চাকে বাধ্যতামূলক করার আন্দোলন গড়ে তোলা। নতুন প্রজন্মকে মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রেখে সুস্থ সংস্কৃতির ধারায় ফিরিয়ে আনা।
পরিশেষে, আজকের এই আনন্দঘন দিনে কৃতজ্ঞতা জানাই প্রতিষ্ঠাতা মো. হাসিব হোসেনকে, যাঁর সীমাহীন ত্যাগ ও পরিশ্রমে আজ প্রয়াস মহীরুহে পরিণত। কৃতজ্ঞতা জানাই, সেই সকল কর্মকর্তাবৃন্দ, শিল্পী, কলাকুশলী, দর্শক, শুভানুধ্যায়ী ও সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটিকে, যারা ১৯ বছর ধরে প্রয়াসের পাশে ছায়ার মতো ছিল এবং আছে।
জয় হোক প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের।
জয় হোক বাংলার লোকসংস্কৃতির।
আহমেদ ফ্রান্স : টিম লিডার, প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ