হাসিব হোসেন
সংস্কৃতি কোনো স্থবির বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনের স্পন্দন, মাটির গন্ধ আর বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। প্রাচীন উঁচু-নিচু লাল মাটির ঢেউ খেলানো বরেন্দ্রভূমি ও প্রবহমান পদ্মা-মহানন্দার নদীবিধৌত উর্বর সমতল প্লাবনভূমি ও চরাঞ্চল এক অনন্য ভৌগোলিক মেলবন্ধনে সৃষ্ট এ অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্য, লোকজ সুর ও জীবনবোধে ঋদ্ধ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অন্যতম সমৃদ্ধ ভিত্তি। গম্ভীরা, আলকাপ, গীত কিংবা মনসার গানের মতো হাজার বছরের লোকঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ জনপদের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজচেতনার বাহক হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু আধুনিকতার তীব্র জোয়ার আর বিশ্বায়নের প্রবল বাস্তবতায় যখন এই ঐতিহ্যবাহী শিকড়গুলো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছিল, তখনই ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনসহ সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে ২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (পিএফটিআই)। উন্নয়ন ও মানবিক কল্যাণে নিবেদিত প্রতিষ্ঠান ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি’র দূরদর্শী ভাবনার ফসল হিসেবে গড়ে ওঠা এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটি আজ সাফল্যের উনিশ বছর পূর্ণ করে গৌরবের বিশ বছরে পদার্পণ করছে।
পিএফটিআই নিছক কোনো নাট্যদল বা প্রশিক্ষণালয় নয়; এটি লোকশিল্পের এক জীবন্ত পাঠশালা এবং শিল্পীদের পরম আশ্রয়। গত উনিশ বছরের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি আঞ্চলিক ঐতিহ্যকে পরম মমতায় আগলে রেখে তাকে সমকালীন সমাজবাস্তবতার সাথে যুক্ত করেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় পিএফটিআই’র সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, নতুন প্রজন্মের মাঝে নিজের শিকড় ও লোকঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ও গর্ববোধ তৈরি করা। যে সময়ে তরুণ প্রজন্ম শেকড়বিমুখ হচ্ছিল, সে সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় এসে কিশোর-তরুণেরা শিখেছে দোতরা, ঢোলক ও মন্দিরার তাল; জেনেছে নানার ব্যঙ্গাত্মক সংলাপ আর নাতির চটুল প্রশ্নের আড়ালে লুকানো গভীর জীবনদর্শন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকসংস্কৃতির প্রাণভোমরা হলো গম্ভীরা। নানা ও নাতির এই চিরায়ত দ্বন্দ্ব, সংলাপ ও কৌতুকের মধ্য দিয়ে আবহমানকাল ধরে গ্রামীণ জনপদে অনিয়ম, কুসংস্কার ও সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পিএফটিআই এই লোকমাধ্যমটিকে কেবল আক্ষরিক অনুকরণে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং যুগোপযোগী থিয়েটার কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে সৃষ্টি করেছে ‘গম্ভীরা নাট্য’। ফলে ঐতিহ্যগত নান্দনিকতা অক্ষুণ্ন রেখেই গম্ভীরা হয়ে উঠেছে আধুনিক সমাজ বিশ্লেষণের এক অনন্য হাতিয়ার।
একই সাথে হারিয়ে যেতে বসা পটগান, আলকাপ, কবিগান, লাঠিখেলা এবং ভাটিয়ালি, বাউল ও মেয়েলি গীতের মতো অনন্য সুরগুলোকে নিয়মিত চর্চা ও মঞ্চায়নের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। শিল্পীদের কাছে তাই এটি কেবল একটি সংগঠন নয়, বরং তাদের সৃজনশীল সত্তার বিকাশক্ষেত্র ও একটি ভালোবাসার পরিবার। এখানে প্রতিটি পরিবেশনা কেবল বিনোদন নয়, হয়ে ওঠে শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শৈল্পিক মাধ্যম এবং জনশিক্ষার এক মুক্ত মঞ্চ।
উনিশটি বসন্ত পেরিয়ে দুই দশকে পদার্পণের এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ স্পষ্ট বোঝা যায়, পিএফটিআই লোকঐতিহ্যকে জাদুঘরের কাচঘেরা প্রকোষ্ঠে বন্দি না রেখে মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে পেরেছে। মাটি ও মানুষের প্রতি এই অকৃত্রিম দায়বদ্ধতাই প্রতিষ্ঠানটিকে আজ অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা স্মরণ করি, সেইসব নিষ্ঠাবান শিল্পী, সংগঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের, যাঁদের নিরলস শ্রম ও ভালোবাসায় পিএফটিআই আজ লোকসংস্কৃতির এক বিশ্বস্ত বাতিঘরে পরিণত হয়েছে। নতুন শতাব্দীতে পা রেখে এই প্রতিষ্ঠানটি শিকড়সন্ধানী প্রজন্ম গড়ে তুলতে এবং বাংলার লোকঐতিহ্যের জয়গানকে বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে দিতে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে— দুই দশকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আজ এই আমাদের প্রত্যাশা। লোকসংস্কৃতির জয় হোক, জয় হোক মানুষের। সকলের সহযোগিতায় এই উদ্যোগ বেঁচে থাকুক হাজার বছর।
হাসিব হোসেন : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক সংগঠক