ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৩২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবের মৃত্যুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে এটি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাবে পরিণত হয়েছে। গত রোববার প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে ডিআর কঙ্গোর ন্যাশনাল পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, দেশটিতে ইবোলায় আক্রান্তের নিশ্চিত সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ৯৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে নতুন ১০১ জন।
জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাব। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই দ্রুত ও ব্যাপক পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা জরুরি। এটি ডিআর কঙ্গোয় ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকেও এটি ইতোমধ্যে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাবে পরিণত হয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে আক্রান্তের সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৩২৫ জনে পৌঁছেছে। ২০১৮-২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবে মারা গিয়েছিলেন ২ হাজার ২৯৯ জন। টম ফ্লেচার বলেন, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় ইবোলার সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে আমাদের প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। গত বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস সতর্ক করে বলেন, বর্তমান গতিতে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে এবারের প্রাদুর্ভাব ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা মহামারিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ওই মহামারিতে ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। ওই সংকটের পরই ইবোলার টিকা উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়। বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ইবোলা ভাইরাসের বান্দিবুগিও প্রজাতি। এই প্রজাতির বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা চিকিৎসা নেই। গত ১৫ মে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, দুর্গম অঞ্চল এবং দক্ষিণ সুদান, উগান্ডা ও রুয়ান্ডার সীমান্তবর্তী এলাকায় চলমান সংঘাত ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সংক্রমণের শুরুর দিকে জুনের প্রথম দিকে এই হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত প্রতি দুইজনের মধ্যে প্রায় একজনের মৃত্যু হচ্ছে। ডিআর কঙ্গোয় কাজ করা আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের (এমএসএফ) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থমাস পারিশ বলেন, সাধারণত কোনো প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতা বাড়ায় মৃত্যুর হার কমে আসার কথা। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক রোগীকে খুব দেরিতে শনাক্ত করা হচ্ছে। ফলে চিকিৎসায় তাদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে। এমনকি অনেকে কমিউনিটিতেই মারা যাওয়ার পর তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে অল্পসংখ্যক পরীক্ষামূলক টিকা ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ইবোলা চিকিৎসা এই ভাইরাসের বান্দিবুগিও প্রজাতির বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে কি না, তা যাচাই করছে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রাপ্ত প্রমাণ মূলত প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণার মধ্যেই সীমিত।