রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১২ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৪ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: September 27, 2026
September 27, 2026
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর

অভাবকে পেছনে ফেলে তুরি জনগোষ্ঠীর কাজল বিচারক হওয়ার পথে

Published: September 27, 2026 at 01:54 PM
অভাবকে পেছনে ফেলে  তুরি জনগোষ্ঠীর কাজল বিচারক হওয়ার পথে

একসময় অভাব ছিল পরিবারের নিত্যসঙ্গী। কখনো কখনো পান্তা ভাত খেয়ে দিন পার করতে হয়েছে। ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কৃষক বাবাকে ছুটতে হয়েছে দূর-দূরান্তে শ্রমিকের কাজের সন্ধানে। তাতেও যখন সংসার ও পড়াশোনার ব্যয় সামলানো কঠিন হয়েছে, তখন বিক্রি করতে হয়েছে গরু। সেই ভূমিহীন কৃষক পরিবারের খাস পুকুরপাড়ের ঘর থেকে উঠে আসা কাজল পাঁড়ে এখন বিচারক হওয়ার পথে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাইপুর গ্রামের ২৯ বছর বয়সী কাজল পাঁড়ে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ (সহকারী জজ) হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ২০০ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর মধ্যে তার অবস্থান ১৪০তম। 

কাজলের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মাধাইপুরে নেমে আসে আনন্দের ঢেউ। রাজশাহী থেকে বাড়ি ফেরার সময় গ্রামের শিক্ষার্থীরা ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। মা পঞ্চমী জেড়ি ও বড় বোনসহ পরিবারের সদস্যরা তখন আনন্দে আপ্লুত। প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও ছুটে আসছেন তাকে অভিনন্দন জানাতে। 

তবে কাজলের কাছে এই সাফল্য কেবল একটি চাকরি পাওয়ার ঘটনা নয়। তার নিজের ভাষায়, এটি আট বছরের স্বপ্নপূরণ। আর সেই স্বপ্নের পেছনে জমে আছে দারিদ্র্য, হতাশা, কান্না, বাবা-মায়ের ত্যাগ এবং নিজের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

আমার আট বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে

গত বুধবার সন্ধ্যায় এক বন্ধুর ফোনে বিজেএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের খবর পান কাজল। পরে ওয়েবসাইটে ফল দেখে নিজের সাফল্য নিশ্চিত করেন। ২০০ জনের তালিকায় ১৪০তম অবস্থানে নিজের নাম দেখে থমকে যান তিনি। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর পূরণ হয় স্বপ্ন।

কাজল পাঁড়ে বলেন, “আমার আট বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার দিনই স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমি বিচার বিভাগের ক্যাডার হবো। প্রথমেই আমার মনে হয়েছে, এর পেছনে অনেক ত্যাগ, হতাশা জমা হয়ে আছে। অনেক কান্না জমা হয়ে আছে। সেই সব কঠিন দিনের কথাই মনে পড়েছে সবার আগে।” 

এই একটি স্বপ্নকে সামনে রেখেই চলেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ চালিয়েছেন টিউশনি করে। পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় পরিবারকেও সহায়তা করেছেন।

স্কুলে গিয়েই প্রথম বাধা ভাষা

কাজল তুরি জনগোষ্ঠীর ‘পাঁড়ে’ পদবির মানুষ। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট এবং পরিবারের একমাত্র ছেলে। ছোটবেলায় পরিবার ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে নিজস্ব মাতৃভাষায় কথা বলেই অভ্যস্ত ছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই তার সামনে আসে নতুন বাস্তবতা। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীদের ভাষা ছিল বাংলা। ফলে শুরুতে অনেক কথাই বুঝতে পারতেন না।

কাজল বলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি সবাই বাংলা কথা বলছে। আমার মাতৃভাষায় কথা বলেই আমি অভ্যস্ত ছিলাম। শিক্ষক ও সহপাঠীরা বাংলায় কথা বলায় শুরুতে তাদের কথা বুঝতে সমস্যা হতো।” 

ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা আয়ত্ত করেন তিনি। ভাষার বাধা পেরিয়ে মনোযোগ দেন পড়াশোনায়। কিন্তু ভাষার প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠলেও সামনে ছিল আরো কঠিন বাধা— দারিদ্র্য।

ছেলের পড়াশোনার জন্য বাবার দূর-দূরান্তে ছুটে চলা

কাজলের বাবা নরেশ পাঁড়ে কৃষিকাজ করেন। কিন্তু এলাকায় সারা বছর কাজ থাকে না। বছরের একটি সময়ে কাজের অভাবে তাকে নড়াইল, খুলনা ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় গিয়ে শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে। কাজলের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে কখনো গরুও বিক্রি করেছেন তিনি।  

নরেশ পাঁড়ে বলেন, “হামাদের কী যে আনন্দ হোইছে, কহিতে পারব না। হামাদের বেটা জানি অনেক বড় হইয়া, গরিবের উপকারে লাগে। বেটার জন্যি বুক গর্বে ফুলে উঠিছে।” ছেলের সাফল্যের খবর পেয়ে এই বাবার চোখে এখন আনন্দের জল। যে ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তাকে একসময় দূর জেলায় শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে, সেই ছেলে আজ বিচারক হওয়ার পথে— এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

কত দিন পান্তা ভাত খেয়ে দিন পার করেছি

কাজলের ছোট বোন স্বপ্নার কাছে পরিবারের সেই কষ্টের দিনগুলো এখনো স্পষ্ট। উচ্চ মাধ্যমিকের পর কাজল যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা জানান, তখন পরিবার চিন্তায় পড়ে যায়। এত দরিদ্র পরিবারের পক্ষে রাজশাহী শহরে রেখে পড়াশোনা করানোর খরচ জোগানো সহজ ছিল না।

স্বপ্না বলেন, “আমরা ভাইকে বলেছিলাম, আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাবো? রাজশাহী গিয়ে পড়তে হবে না। তখন ভাই বলেছিল, ‘দিদি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে আমার টাকা লাগবে না।’” 

কাজল কথা রেখেছেন। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। অভাবের সংসারে কখনো কখনো পান্তা ভাত খেয়েই দিন পার করতে হয়েছে তাদের। স্বপ্না বলেন, “কত দিন আমরা পান্তা ভাত খেয়ে দিন পার করেছি। আজ আমার ভাই জজ হওয়ার পথে। এতে আমরা খুব খুশি।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জুডিশিয়াল সার্ভিস

দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা থামাননি কাজল। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ২০১৭ সালে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। সেখানে আইন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বিচার বিভাগে যাওয়ার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন। টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। দীর্ঘ আট বছর পর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।

মাধাইপুরে উৎসবের আমেজ

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজশাহী থেকে মাধাইপুর ফেরেন কাজল। তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয় গ্রামের শিক্ষার্থীরা। সঙ্গে ছিলেন মা পঞ্চমী জেড়ি ও বড় বোন কল্পনা পাঁড়ে। গ্রামের প্রবীণ জরাধন পাঁড়ে (৭০) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আনন্দেতে কান্দন আসছে রে ভাই। এ রকম জাগাতে হামাদের জাতিগোষ্ঠীর আর কেহু যাইতে পারিনি।” 

কাজলের সাফল্য যে শুধু তার পরিবারের আনন্দ নয়, পুরো গ্রামের গর্ব— জরাধন পাঁড়ের কথাতেই তা স্পষ্ট। মাধাইপুর গ্রামের মোড়ল নিরঞ্জন তিরকি বলেন, কাজল পাঁড়েকে দেখে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় উৎসাহ পাবে।

তুরি জনগোষ্ঠীতে নতুন দৃষ্টান্ত

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতো বলেন, তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজল পাঁড়েই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও কাজলই প্রথম জুডিশিয়াল সার্ভিসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তুরি জনগোষ্ঠীর এই তরুণের সাফল্য তাই তার পরিবারের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর একটি জনগোষ্ঠীর তরুণদের মধ্যেও নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। যে সমাজের অনেক পরিবার এখনো দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমিত সুযোগ ও নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করছে, সেখানে কাজলের সাফল্য দেখাচ্ছে— প্রতিকূলতার মধ্যেও উচ্চশিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন সম্ভব।

স্বপ্ন এখন মানুষের জন্য কাজ করা

কাজলের সামনে এখন নতুন দায়িত্বের অপেক্ষা। বিচারক হওয়ার পথে দাঁড়িয়ে তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা— মানুষের জন্য কাজ করা। যে বাবা ছেলের পড়াশোনার জন্য দূর জেলায় শ্রমিকের কাজ করেছেন, যে মা অভাবের সংসারে ছেলের শিক্ষার খরচ জুগিয়েছেন, যে পরিবার কখনো পান্তা ভাত খেয়ে দিন পার করেছে— সেই পরিবারের সন্তান এখন বিচার বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার অপেক্ষায়। 

মাধাইপুর গ্রামের খাস পুকুরপাড়ের সেই ঘর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে জুডিশিয়াল সার্ভিস— কাজল পাঁড়ের এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি ত্যাগ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প। আর সেই গল্প এখন মাধাইপুর গ্রামের ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের সামনে একটি নতুন প্রশ্ন রেখে গেছে— যদি কাজল পারেন, তবে তারা কেন পারবেন না?