রবিবার ১৮ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২রা কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: October 18, 2026
October 18, 2026
গল্প
গল্প

আব্দল্লাহ্ সাহেদের রম্য রচনা : মূল্যোন্নতির নন্দনতত্ত্ব

Published: October 18, 2026 at 12:48 PM
আব্দল্লাহ্ সাহেদের রম্য রচনা : মূল্যোন্নতির নন্দনতত্ত্ব

বাজারে গিয়ে ইদানীং একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার বুঝতে পারছি, জিনিসপত্রের দাম শুধু বাড়ছে না, তারা যেন দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কে কার আগে বাড়বে, কে কতদূর উঠবে, এই নিয়ে পণ্যের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। আগে বাজারে গেলে দোকানদার বলতেন, “ভাই, দাম একটু বেড়েছে।” এখন সেই ‘একটু’ শব্দটাও বাজার থেকে উধাও। কারণ বাজারে ‘একটু’ বলে আর কিছু নেই, আছে শুধু ‘আগের চেয়ে বেশি’।  

মানুষ ডাব খায় শরীর ঠাণ্ডা করার জন্য। কিন্তু এখন ডাবের দামের তাপে ডাবের কাছেই যাওয়া যাচ্ছে না। ডাব দেখে মনে হয়, এটা পানীয় নয়, শেয়ারবাজারের কোনো ব্লু-চিপ সম্পদ! এসি ব্যবহার করা হয় ঘর ঠাণ্ডা করার জন্য, অথচ এসির দামের তাপে এসি বিক্রির দোকানের আশেপাশে গেলেই ঘাম শুরু হয়ে যায়। মনে হয় এসি কিনতে গেলে আগে নিজের শরীরের তাপমাত্রা নয়, ব্যাংক ব্যালান্স ঠাণ্ডা রাখতে হবে। আর সফট ড্রিংকস? নাম শুনে মনে হয় খুব নরম, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ব্যাপার। কিন্তু বোতল হাতে নিয়ে দাম জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যায়, তারা আর সফট বা কোল্ড লাইনে নেই, একেবারে হার্ড লাইনে ব্যাটিং করছে। 

জিনিসপত্রের দাম এমনভাবে নড়েচড়ে বসেছে যে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে এমন একটা পণ্য পাওয়া যাবে না, যার দাম একটু নড়েচড়ে নিচের দিকে গেছে। সবাই ওপরে উঠছে। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ লিফটে, কেউ আবার রকেটের গতিতে। শুধু মানুষের আয়টাই মনে হয় সিঁড়ির নিচে বসে আছে। মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসে, আর বাজারের দামের তালিকা দেখে বেতন সাহেব মাঝপথেই হাঁপিয়ে ওঠেন। 

ছেলের বায়না, রেস্টুরেন্টে খেতে হবে। আমিও ভাবলাম, বাচ্চার আবদার বলে কথা, মাঝে মাঝে বাইরে খাওয়া যেতেই পারে। রেস্টুরেন্টে গিয়ে মেনু হাতে নিয়ে দেখি, কয়েক সপ্তাহ আগে যে খাবারের দাম ছিল, এখন সেটা বেশ স্বাস্থ্যবান হয়ে গেছে। দাম যেন খেয়ে-দেয়ে মোটাতাজা হয়েছে। ম্যানেজারকে ডেকে বললাম, “ভাই, হঠাৎ দাম এত বাড়ালেন কেন?” তিনি মুচকি হেসে বললেন, “স্যার, গ্যাস, তেল, বিদ্যুতের কারণে দামটা রিভাইজ হয়েছে।” আহা! কী চমৎকার শব্দ! দাম বাড়ানো হয়নি, ‘রিভাইজ’ করা হয়েছে। দাম বাড়ানোর কথা সরাসরি বললে মনে হয় একটু রূঢ় শোনায়, তাই শিল্পীর তুলিতে শব্দের গায়ে রং লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল হয়তো ভাড়া বাড়বে না, ‘ভাড়াটা পুনর্মূল্যায়িত’ হবে। বাজারে দাম বাড়বে না, ‘মূল্য কাঠামো আধুনিকায়িত’ হবে। আর আমাদের পকেট? সেটি ‘শূন্যায়িত’ হবে! 

একদিন লন্ড্রিতে আয়রন করা কাপড় নিতে গিয়ে বিল হাতে নিয়ে মনে হলো, কাপড়গুলো বুঝি আয়রন করতে গিয়ে ব্যাংক ঋণ নিয়েছে। বিল প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, “এত বেশি কেন?” তারা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, “বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, তাই আয়রনের বিলও বেড়েছে।” কথাটা শুনে মনে হলো, কাপড় শুধু আয়রন করাই হয়নি, সঙ্গে অর্থনীতিরও একটা কোর্স করানো হয়েছে। আগে জামা আয়রন করতাম, এখন বিল দেখে নিজের কপাল আয়রন করতে ইচ্ছে করে। 

বাজারের মজাটা হলো, কোথাও দাম বাড়লে কেউ নিজের দোষ স্বীকার করে না। এক জায়গায় গেলে বলে, “ওমুকের কারণে দাম বেড়েছে।” আরেক জায়গায় গেলে বলে, “তমুকের কারণে দাম বেড়েছে।” তৃতীয় জায়গায় গেলে ওমুক-তমুক দুজনের সঙ্গে আরও কয়েকজন আত্মীয়স্বজন যোগ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়, দাম বাড়ার পেছনে সবাই দায়ী, শুধু দাম বাড়ানো ব্যক্তি ছাড়া! বাজারে এখন ‘দোষ’ নামের জিনিসটারও বোধহয় সরবরাহ কমে গেছে। 

সামনে আসছে শীতকাল। ভাবছিলাম গরম না হয় ডাব আর এসি ছাড়া কেটে গেল, শীতে অন্তত একটু জ্যাকেট-কম্বল গায়ে দিয়ে আরামে থাকব। কিন্তু কিসের কী! শীতের গরম কাপড়ের দামের পারদ শীত আসার আগেই একশো ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে ফেলেছে! গরমের জিনিসের দামে তাপ আর শীতের জিনিসের দামে আগুন! ফলাফল—এই শীতে কাঁপুনির বদলে সবারই দরদর করে ঘাম হওয়ার বিরাট সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

আসলে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জ্বালানি, পরিবহন, বিদ্যুৎ, উৎপাদন খরচ, ডলার, আমদানি, বাজারব্যবস্থা, সবকিছুরই কোনো না কোনো প্রভাব থাকতে পারে। কোনো পণ্যের দাম সত্যিই তিল পরিমাণ বাড়তে পারে। কিন্তু সেই তিল যখন উৎপাদক থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা বিক্রেতা, আর খুচরা বিক্রেতা থেকে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়, তখন সেটি আর তিল থেকে তাল না হলেও কমসে কম কদবেল হয়ে যায়। কোথাও কোথাও তো মনে হয় কদবেলও পেরিয়ে পিয়ারার দিকে রওনা দিয়েছে! 

এই তিল থেকে কদবেল হয়ে ওঠার সাইন্সটা যারা আবিষ্কার করেছেন, তাদের নোবেল দেওয়া উচিত। আর এই তিল-কদবেলের প্রবল থাপ্পড় আর ধাক্কা সামলাতে গিয়ে সাধারণ জনগণ এখন দিশেহারা। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই—কারণ কান্নার জল শুকিয়েও এখন দামের তাপে বাষ্প হয়ে যাচ্ছে।


লেখকঃ আব্দুল্লাহ সাহেদ, ব্যাংকার, কলাম ও রম্য লেখক