করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষা প্রেক্ষাপট চাঁপাইনবাবগঞ্জ

143

মজিদুল ইসলাম

“শিখিবার কালে, বাড়িয়া উঠিবার সময়ে, প্রকৃতির সহায়তা নিতান্তই চাই। গাছপালা, স্বচ্ছ আকাশ, মুক্ত বায়ু, নির্মল জলাশয়, উদার দৃশ্য- ইহারা বেঞ্চি এবং বোর্ড, পুঁথি এবং পরীক্ষার চেয়ে কম আবশ্যক নয়”- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
অতিমারি করোনাকালীন নতুন বাস্তবতায় আমাদের জীবনমান পাল্টে গেছে। ২০২০ সালের মধ্য মার্চ থেকে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় কোমলমতি শিশুরা শিখছে প্রকৃতির কাছে থেকে। পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা, পুনর্ভবা বিধৌত আম্রকাননের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ইতিহাসের প্রক্রিয়ায় নিরন্তর উৎকর্ষতা বিকাশের ধারা বহন করে শিক্ষা-দীক্ষায় দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলা যেতে পারে।
আম, কাঁসা, পিতল, নকশিকাঁথা, কালাই রুটি, রেশম, লাক্ষার জন্য বিখ্যাত ঐতিহাসিক এই জেলায় ৭৯টি মহাবিদ্যালয়, ২৪১টি মাধ্যমিক-নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৩৩টি মাদরাসা, ৭০৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৮টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্থবির শিক্ষা কার্যক্রম বেগবান করতে বাংলাদেশ সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধীনে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশনের (এটুআই) মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখার জন্য ওঈঞ৪ঊ জেলা অ্যাম্বাসেডর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২০২০ সালের ১৩ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনলাইন স্কুল এবং ১ জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনলাইন প্রাইমারি স্কুলের যাত্রা শুরু করে। সেই ২০০৬ সালে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে। সেই মহাসড়কের দ্বার আরো অবারিত করতে ওঈঞ৪ঊ জেলা অ্যাম্বাসেডরগণ অঙ্গীকারবদ্ধ।
মাতৃগর্ভের ভ্রণ পলে পলে পরিণত হয়ে ভূমিষ্ঠ হয় শিশু। ক্ষুদ্র বীজ থেকে অঙ্কুরিত চারা তিলে তিলে বেড়ে হয় মহীরুহ। সেই মহীরুহ হওয়ার আড়ালে থাকে ইতিহাস। চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনলাইন স্কুল এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনলাইন প্রাইমারি স্কুলের সফলতার পেছনেও রয়েছে অনেক গুণী শিক্ষকবৃন্দের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট ওঈঞ৪ঊ জেলা অ্যাম্বাসেডর ৩৭ জন। তন্মধ্যে সদরে ১১ জন, নাচোলে ৮ জন, শিবগেেঞ্জ ৮ জন, গোমস্তাপুরে ৬ জন এবং ভোলাহাটে ৪ জন। এই ৩৭ জনের পরিবার শিক্ষা ক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে দেশের শ্রেষ্ঠতম করে গড়ে তুলতে শিক্ষকবৃন্দের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম শিক্ষক বাতায়নকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। শিক্ষক বাতায়নে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বড় অর্জন শিক্ষক বাতায়নের জন্মলগ্নে সর্বপ্রথম সেরা কনটেন্ট নির্মাতা এই জেলারই একজন গুণী শিক্ষক- ভোলাহাটের জাহাঙ্গীর রেজা, যিনি সফলতার সাথে ICT4E জেলা অ্যাম্বাসেডর চাঁপাইনবাবগঞ্জের সভাপতির দায়িত্ব পালনে রত আছেন। জেলার সর্বপ্রথম ICT4E জেলা অ্যাম্বাসেডর হওয়ার গৌরব অর্জন করেন নাচোল উপজেলার আব্দুল্লাহ আল মেহেদী, সদরের কাওসার আলী এবং শিবগঞ্জের রাসেল আলী, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
ডিজিটাল কনটেন্ট প্রতিযোগিতায় সেরা ৩৫ জনে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেন ভোলাহাটের জাহাঙ্গীর রেজা ২০১৩ সালে, ভোলাহাটের নূর আলম ২০১৫ সালে, নাচোলের আব্দুল্লাহ আল মেহেদী ২০১৭ সালে। এ যাবৎ মোট এগার জন সেরা কনটেন্ট নির্মাতা হয়েছেন- জাহাঙ্গীর রেজা (ভোলাহাট), আজাদী আখতার খানম (সদর), কাওসার আলী (সদর), আব্দুল্লাহ আল মেহেদী (নাচোল), ফরিদা পারভীন (সদর), আসাদুল্লাহ গালিব (নাচোল), তাসকিনা খাতুন (শিবগঞ্জ), আবুল কালাম আজাদ (শিবগঞ্জ), সাইফুল ইসলাম (নাচোল), সাদিকুল ইসলাম (শিবগঞ্জ) ও ইউসুফ আলী (সদর)।
এবার আসি সমসাময়িক করোনাকালীন গুণী শিক্ষকবৃন্দের কথকতা নিয়ে। জেলায় ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীরা যাতে যথাযথ সামাজিক দূরত্বে থেকে টিভি, রেডিও, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনলাইন স্কুল এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনলাইন প্রাইমারি স্কুলের যাত্রা শুরু। এই উদ্যোগ অংশগ্রহণমূলক, এতে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ওপর নজর রাখা হচ্ছে, সাথে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখতে পারছে তার মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন, সমৃদ্ধির পথে কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। তাঁর অমীয় বাণীকে ধারণ করে জেলার শিক্ষকবৃন্দ এগিয়ে চলেছেন দুর্বার গতিতে। এ যাবৎ অনলাইন ক্লাসে একশত, তার অধিক ক্লাসের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বেশ কয়েকজন। তন্মধ্যে নিবন্ধ লেখক পাঁচ শতাধিক ক্লাসের মাইলফলক ছুঁয়ে শিক্ষক বাতায়নে সপ্তাহের সর্বাধিক ক্লাসের সেরা দশে ছিলেন একাধিকবার। এছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে ঘরে বসে শিখির নিয়মিত মুখ সদরের রুহুল আমিন, নাচোলের ফরিদা ইয়াসমিন, গোমস্তাপুরের ইয়াসমিন আখতার সিমা, মাধ্যমিক পর্যায়ে নাচোলের আসাদুল্লাহ গালিব, সদরের ইউসুফ আলী, সদরের দেশব্যাপী পরিচিত মুখ রাফিয়া ম্যাম খ্যাত অতিসম্প্রতি যিনি সেরা উদ্ভাবক হয়ে জেলাকে সম্মানিত করেছেন রাফিয়া খাতুন, মাদরাসা পর্যায়ে শিবগঞ্জের আবুল কালাম আজাদ, কলেজ পর্যায়ে নাচোলের হুমায়ুন কবির আজম, সদরের কিশোর বাতায়নের পরিচিত মুখ আলাপন আপা খ্যাত নওসাবাহ নওরীন নেহা উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক ক্লাস পরিচালনা করেছেন।
জেলা সদর থেকে পরিচালিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনলাইন স্কুলে এ যাবৎ ৪১৫টি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনলাইন প্রাইমারি স্কুলে ৬৯২টি লাইভ ক্লাস পরিচালিত হয়েছে। অপরদিকে উপজেলা পর্যায়ে শিবগঞ্জ অনলাইন স্কুল ২০২০ সালের ১৭ অক্টোবর চালু হয়ে ৪৮টি লাইভ ক্লাস পরিচালনা করেছে। এক্ষেত্রে জেলার সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগটি ছিল নাচোল ও শিবগঞ্জ উপজেলার। নাচোল মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় গুণী শিক্ষকবৃন্দের ক্লাস স্থানীয় ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক বরেন্দ্র স্যাটেলাইটে প্রচারের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক কালে নাচোলের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে জেলা প্রশাসন পুরো জেলাব্যাপী স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে ক্লাস পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
পরিশেষে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো শিক্ষার্থীদের ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যত বেশি সময় স্কুল থেকে দূরে থাকে তাদের স্কুলে ফেরার সম্ভাবনা ততটাই কমে যায়। তাই কোভিড-১৯ মোকাবেলায় শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিকল্প পদ্ধতি তৈরি করা আমাদের কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমরা স্বপ্ন দেখি, একদিন আসবে করোনামুক্ত বিশ্বে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একটি আইডি পাসওয়ার্ড থাকবে যেখানে শিক্ষার্থীর নম্বর, পুরো সিলেবাস, লেকচার সিট, বছরের শুরুতেই পেয়ে যাবে। সময়মত ফলাফল প্রকাশিত হবে। মেধাবীরা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হবে। শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে।
সবশেষে যে উপলক্ষে ঘিরে এ লেখার প্রয়াস, সেই ঐতিহাসিক নবাবদের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্যতম দৈনিক গৌড় বাংলার ৬ষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একরাশ শুভেচ্ছা।

মজিদুল ইসলাম : সহকারী শিক্ষক, নাচোল উপজেলা স্কুল ও ICT4E জেলা আ্যাম্বাসেডর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ