দৈনিক গৌড় বাংলা এবং উন্নয়ন সাংবাদিকতা

66

আজমাল হোসেন মামুন

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের পয়লা ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে ‘গৌড় বাংলা’ আত্মপ্রকাশ করে। বিশিষ্ট উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিক হাসিব হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকায় একঝাঁক তরুণ সাংবাদিক যুক্ত হয়ে অতিদ্রুত পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।
বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে ৪টি দৈনিক, ৩টি সাপ্তাহিক এবং অসংখ্য অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। এসব পত্রিকাগুলোর মধ্যে দৈনিক গৌড় বাংলা অন্যতম নিয়মিত প্রকাশনা। স্থানীয় লেখক, পাঠক ও সাংবাদিকদের সহযোগিতায় প্রতিনিয়ত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে স্থানীয় সকল ধরনের পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে বলে আমি মনে করি। একজন তরুণ লেখক হিসেবে আমিও মাঝেমধ্যে লেখালেখি করি। দৈনিক গৌড় বাংলা আমি নিয়মিত পড়ি। পড়ার একটা কারণ হচ্ছে, এর সংবাদ পরিবেশনের বৈশিষ্ট্য একটু আলাদা। কখনোই তা একপেশে হয় না। যে ঘটনা ঘটে, সেটাই বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে তুলে ধরে। সংবাদ পরিবেশনও উন্নতমানের এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। এজন্য এ পত্রিকাটি আমার ভালো লাগে।
উপসম্পাদকীয় থেকে শুরু করে ফিচার, প্রতিবেদন ও সাহিত্য পাতা আমি মনোযোগ দিয়ে পড়ি। এখানে বিভিন্ন মত আসে। অন্য পত্রিকার মতো একপেশে নয়। আর সাহিত্য সাময়িকীতে তো আমি অনেক লিখেছি। এখনো লেখালেখি করছি। তবে চোখের সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা কমে গেছে। দৈনিক গৌড় বাংলার সঙ্গে এটাও আমার যোগসূত্র বলা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পত্রিকাটির জন্য শুভকামনা রইল।
দৈনিক গৌড় বাংলা স্থানীয় পত্রিকা হলেও একঝাঁক তরুণ সাংবাদিকদের নিরলস পরিশ্রমের জন্য পাঠক সমাদৃত ও আধুনিক দৈনিক পত্রিকা হতে পেরেছে। পত্রিকাটির প্রচার ও প্রকাশিত বিষয়বস্তু বেশ বস্তুনিষ্ঠ ও উন্নতমানের। দৈনিক গৌড় বাংলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- উপসম্পাদকীয় বিভাগটি বিভিন্ন মতের ব্যক্তিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া, যা অন্য কোনো স্থানীয় পাঠকপ্রিয় পত্রিকায় তেমন একটা দেখা যায় না বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। ইতোমধ্যে পত্রিকাটির প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়েছে।
৬ বছর আগে যখন দৈনিক গৌড় বাংলা নামের একটি নতুন বাংলা দৈনিকের প্রকাশের কথা জানতে পারি, তখন প্রথম প্রশ্ন ছিল- চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো ছোট্ট একটি জেলায় ৩টি দৈনিক পত্রিকা দৈনিক চাঁপাই দৃষ্টি, চাঁপাই দর্পণ ও চাঁপাই চিত্রের ভিড়ে হঠাৎ কেন আরেকটি পত্রিকা? প্রশ্নটি আমার প্রজন্মের জন্য স্বাভাবিক। বর্তমান প্রজন্মের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পত্রপত্রিকা পড়ার অভ্যাস নেই বললেই চলে। স্থানীয় পত্রিকার নামগুলো হয়তো অনেক শিক্ষার্থী বলতেও পারবে না। তাদের ভয়ঙ্কর নেশা সেলফোন আর ইদানীংকালে ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
ধারণা হয়েছিল, এটি আরেকটি বিজ্ঞাপন ব্যবসার মতলব, যা ব্যবহার করে একশ্রেণির স্বঘোষিত সাংবাদিক মানুষকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারে। দীর্ঘ ৬ বছর পর এখন বলতে পারি, দৈনিক গৌড় বাংলা দীর্ঘ ৬ বছরে একটি পাঠযোগ্য, পাঠক সমাদৃত ও আধুনিক স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা হতে পেরেছে, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিজ্ঞাপনের অভাব, বিজ্ঞাপনের হার কম, পত্রিকা প্রকাশনার খরচ বৃদ্ধি, করোনা সংকটসহ বিভিন্ন কারণে পত্রিকা চালানো খুবই চ্যালেঞ্জিং। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাচ্ছে দৈনিক গৌড় বাংলা।
পত্রিকার প্রগতিশীল চিন্তাধারা গণমানুষের চেতনায় নানা আলো ফেলেছে। বিভিন্ন খবর প্রকাশে নিরপেক্ষ দৃষ্টি, তথ্য যাচাইয়ের পদক্ষেপ এবং সেবা সঠিকভাবে তুলে ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আনাচে-কানাচে পৌঁছে দিয়েছে। এভাবে তৃণমূল পর্যায় থেকে শহরের দ্বারপ্রান্তে বিভিন্ন খবর প্রকাশ করে মানুষের সচেতনতার জায়গা তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশে উন্নয়ন সাংবাদিকতা যুগের চাহিদা, সময়ের চাহিদা। একসময় দেশে বিশেষায়িত সাংবাদিকতা ছিল না। বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষায়িত সাংবাদিকতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। কৃষি সাংবাদিকতাও বিশেষায়িত সাংবাদিকতা হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। স্থানীয় পত্রিকা হিসেবে দৈনিক গৌড় বাংলা উন্নয়ন সাংবাদিকতাকে লালন করছে, যা পাঠকের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জনে ভূমিকা পালন করছে। দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে গণমাধ্যমের কাজ করার অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে দৈনিক গৌড় বাংলা। চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেই চলেছে। নতুন জাতের আমের উদ্ভব, মাল্টা ও পেয়ারা চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, মৎস্য খামার ও পশুপালনের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেকার তরুণ-তরুণীরা স্বাবলম্বী তথা আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এসবের ওপর দৈনিক গৌড় বাংলার ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ করে পত্রিকার কিছু তরুণ প্রজন্মের সাংবাদিক তা তুলে ধরে থাকেন। এর মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতা করা হয়েছে। দৈনিক গৌড় বাংলা উন্নয়ন সাংবাদিকতার আওতায় গণমানুষ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পযঃনিষ্কাশন, চিকিৎসা ও ওষুধ, শিক্ষা ও সাক্ষরতা, তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রাম-শহরের উন্নয়ন, নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অভিবাসন সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- জনগণের কাছে তুলে ধরেছে যা দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর বিশেষ নজর দেয়া হয় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে। আমার মনে হয়েছে, তারা সব সংবাদই নিরপেক্ষভাবে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। আগ্রহ রয়েছে উন্নয়ন সাংবাদিকতার।
আশা করি, আগামীতে সংবাদের ধারা আরও তীক্ষè হবে। দৈনিক গৌড় বাংলা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষীকি উপলক্ষে পত্রিকার সম্পাদক, সাংবাদিক, লেখক, পত্রিকা বিক্রেতা এবং পাঠক সকলকে জানাই আন্তরিক ভালোবাসা এবং সম্মান। দৈনিক গৌড় বাংলা অবিরাম গতিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গণমানুষের কথা তুলে ধরতে পিছপা হবে না- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আজমাল হোসেন মামুন : কলাম লেখক ও সহকারী শিক্ষক, হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ