শিশিরভেজা বকুল ফুল রোদ চিকচিক ভোর

46

মাহবুব জন

দৈনিক ‘গৌড় বাংলা’ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার দৈনিক পত্রিকাগুলোর অন্যতম একটি পত্রিকা যা ভোরের আলোর মতো প্রতিদিন ভোর হলেই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় দুনিয়ার তাবৎ খবর সাথে নিয়ে। আমি প্রথমেই পত্রিকার সম্পাদক হাসিব হোসেনকে অভিনন্দন জানাই এই জন্য যে, তিনি তাঁর শত ব্যস্ততার ভিড়ে এই পত্রিকাটিকে অতি যত্নের সাথে লালন করে যাচ্ছেন, ধারণ করে যাচ্ছেন সেই শুরু থেকে। আজ থেকে সপ্তম বছরে পা রাখল এই পত্রিকাটি। বয়সটি শিশু হলেও মানের দিক থেকে নিঃসন্দেহে গৌড় বাংলা একটি মানসম্মত বয়স্ক বটের ঝিলিমিলি পাতা।
সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের দর্পণ। একটি দেশের বা জাতির সংস্কৃতি তখনই শক্তিশালী হয় যখন সেই সমাজের বা রাষ্ট্রের মানুষ তার চারপাশের খবর রাখে এবং তা থেকে ভালো-মন্দ বিচার করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার প্রয়াস পায়। আর এই খবর জানার উৎস হিসেবে বর্তমানে আমাদের সামনে অনেক মাধ্যম বিরাজমান। যেমন টিভি, খবরের কাগজ, ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্টারনেট, গুগল ইত্যাদি নানা মাধ্যমে আমরা নানা অজানা বিষয়ের খবর হাতের নাগালে পেয়ে যাই এই আধুনিক পৃথিবীতে। বাংলাদেশের মালিকানাধীন প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রযুক্তির উন্নয়নে একধাপ এগিয়ে নিয়েছে আমাদের। এটি আমাদের প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ। এ উপগ্রহটি ১১ মে, ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় যোগ হয় বাংলাদেশের নাম। এটি ফ্যালকন ৯ ব্লক ৫ রকেটের প্রথম পেলোড উৎক্ষেপণ ছিল।
প্রযুক্তির এ উন্নয়নের ধারায় আমাদের গোটা বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। পৃথিবীর দেশগুলো যেন আজ একটি গ্রামের মতো, যেখানে দেশগুলো সব এক একটি বাড়ির মতো সহাবস্থানে থেকে একে অপরের সুখে-দুঃখে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। আজকের অনলাইন যোগাযোগ তার চাক্ষুস প্রমাণ। আজকাল ঘরে বসেই সব কাজ সেরে নেয়া যায়। এক সেকেন্ডের এক ক্লিকে সমস্ত তথ্য নিয়ে হাজির হয়ে যায় পৃথিবীর এপার-ওপার।
এতকিছুর পরও তথ্য সংগ্রহ ও জানার জন্য খবরের কাগজ এক অপরিহার্য উপাদান, যেটি পাঠকের মনে স্থিরচিত্র হিসেবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। সেই প্রস্তর যুগের তা¤্রলিপি, শিলালিপি, গাছের পাতা, বাকল, চামড়ায় লেখা থেকে শুরু করে আজকের এই নানা ফরমায়েশের কাগজ আমাদের দোরগোড়ায় এসে হাজির। যেমন কাগজের বৈচিত্র্য তেমনি লেখার উপাদান বা কলমের আবার ছাপাখানারও। আগের দিনের লেখার উপকরণ যেমন কষ্টসাধ্য ছিল তেমনি ছাপাখানায় প্রিন্টিংয়ের কাজটিও কিন্তু বেশ কঠিন ছিল। আজকের এই ডিজিটাল যুগে সবকিছুই খুব সহজসাধ্য হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নও ঘটেছে এবং ঘটছে। এটি বিশ্বায়নের ফলাফলও বটে।
সমাজে একটি খবরের কাগজেরও ভূমিকা অপরিসীম। আজকের দুনিয়া হচ্ছে প্রতিযেগিতার দুনিয়া। বর্তমানে সাধারণ জ্ঞান অর্জন না করলে বা নিয়মিত তথ্যের আপডেট না থাকলে কোথাও ভালো কিছু অর্জন সম্ভব নয়। কী দেশে কী বিদেশে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি যে কোনো ক্ষেত্রে চাকরি পেতে অবশ্যই সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। এইরকম বিবিধ ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য প্রতিদিনের খবরের কাগজের ওপর চোখ না রাখলে বর্তমান বা সমসাময়িক বিষয় জানা বা বোঝা কোনোটায় সম্ভবপর হয়ে উঠে না। তাই খবরের কাগজ আমাদের নিত্যদিনের সাথী যা প্রতিনিয়ত বিষয়-আশয়ের মতো জীবনের সাথে জড়িত।
বর্তমানে পৃথিবী একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে চলেছে। এটি হচ্ছে করোনা অতিমারি বা মহামারি। ইতিমধ্যে বিশ লাখের অধিক মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আর এক কোটির উপর আক্রান্ত। এমতাবস্থায় রোজকার খবরের কাগজ আমাদের প্রতিদিনের করোনা মহামারির আপডেট দিয়েছে এবং শুধু আপডেট নয় অনেক প্রখ্যাত ডাক্তার এবং প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ আমাদের এই করোনা থেকে বেঁচে থাকার নানা পথ দেখিয়েছে, যা অনস্বীকার্য।
এই মুহূর্তে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘শ্মশান’ কবিতার কয়েকটা লাইন খুব মনে পড়ে যায়,
‘বাড়াই তৃষ্ণার হাত ফিরে আসে শূন্যতাকে ছুঁয়ে-
তুমি নেই, নিষ্প্রদীপ মহড়ায় জ্ব’লে থাকে একা
পাথরের মতো ঠান্ডা এক জোড়া মানবিক চোখ,
তৃষ্ণার্ত শরীর জুড়ে জেগে থাকে এক ব্যথিত রোদন।’

মৃত্যুর এক মহাযজ্ঞ এই করোনার মোড়ক। এই মহামারিতে কত মানুষ যে স্বজনহারা হলেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। স্বজনহারা মানুষগুলো চোখের সামনে শূন্যতাকে ঘিরে চলেছেন পথ। করার কিছুই নেই। করোনা মহামারিতে মানুষের কাতারে কাতারে মৃত্যু দেখে মনে হয় আমরাও বুঝি সেই মৃত মানুষের দলে। সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানাই, তিনি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং সুস্থ রেখেছেন। কিন্তু আমাদের ব্যথিত মন সর্বদায় কেঁদে ফেরে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় দুই হাত তুলে প্রার্থনা করে, তাঁরা যেন ওপারে ভালো থাকেন।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিভাবে ভালো থাকা যায় তার জন্য নানাবিধ টিপস, বিজ্ঞানভিত্তিক নানা তথ্য, পড়াশোনার পাতাসহ ইসলামী জীবনধারার নানা আলোচনায় ভরা থাকে একটি খবরের কাগজ যা প্রতিনিয়ত পাঠের মাধ্যমে একজন মানুষ পূর্ণাঙ্গ সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারে। এছাড়াও সপ্তাহের বিশেষ দিনে সাহিত্যের পাতায় সেজে উঠে খবরের কাগজ যা পাঠকের মনের তৃষ্ণা মেটায় বৈকি। একজন লেখকের লেখা প্রকাশ করা এবং তা পাঠকের সামনে তুলা ধরার এ এক অনন্য মাধ্যম।
পৃথিবীটা ভালোবাসার এক মায়াজাল। এ মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে আমরা গড়েছি আমাদের আপন সমাজ-সংসার। এখানে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই যে আমরা এক একটা ভালোবাসার পাখি বাতাসে ভাসছি ভালোবাসার পাখায় ভর করে। কিন্তু এই ভালোবাসা কখনো কখনো ফিকে হয়ে আসে যখন আমরা বন্দি হয়ে পড়ি সময় আর ব্যস্ততার ঘেরটোপে। তাই তো বিখ্যাত সেই ধনাঢ্য ব্যক্তিত্ব অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা ঝঃবাব ঔড়নং-এর মৃত্যুর আগে চিরস্মরণীয় সেই কথাগুলো সবার জন্য খুব স্পর্শকাতর। তিনি বলেন,

In other eyes, my life is the essence of success, but aside from work, I have a little joy. And in the end, wealth just a fact of life to which I am accustomed,”

He uttered, “At this moment, lying on the bed, sick and remembering all my life, I realize that all my recognition and wealth that I have is meaningless in the face of imminent death, you can hire someone to drive a car for you- but you cannot someone to carry the disease for you. One can find material things, but there is one thing that cannot be found when it is lost-life.

“Your true inner happiness does not come from the material things of this world. Where you’re flying first class, or economy class- if the plane crashes, you crash with it.” And his final words were, “Oh wow, oh wow, oh wow.”

এই ‘ওহ’ শব্দটির সাথেই প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারে স্টিভ জবস ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে চিরবিদায় নেন পৃথিবী থেকে। বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থসম্পদের মালিক এই ব্যক্তিটি মৃত্যুশয্যায় জীবনের এই উপলব্ধিতে পৌঁছান যে, মানুষের সাথে পারস্পরিক ভালোবাসা-শ্রদ্ধা অপরিহার্য। যদি তা না থাকে তাহলে শুধু এই অর্থবিত্তের কোনোই কাজ নেই আসলে। বস্তুবাদের জীবনের চেয়ে একে অপরের সাথে ভালোবাসা, শান্তিময় ও সুস্থ জীবন অনেক মূল্যবান। আমরা এর কতটুকু মনে রাখি এ চলার পথে?
মৃত্যুর সময় জীবনের সব জানা-অজানা, পাওয়া-না পাওয়া, স্বপ্ন-সাধনার কামনা-বাসনা ম্লান হয়ে যায়। চোখের সামনে তখন শুধু ভাসে চলে যাবার কষ্টে ভরা দু’ফোঁটা জল। আর নিরন্তর এক ভালোবাসার মহিমায় দীর্ঘশ্বাস পড়তে থাকে। পৃথিবী যে মায়ার বাঁধনে বাঁধা। কিন্তু ছেড়ে যেতে তো হবেই।
তবু আমাদের ঘুম ভাঙে না। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বালাই নেই কোথাও কোথাও। মানুষের জীবন নিয়ে খেলতেও দ্বিধা হয় না। এই মহামারিতেও যখন দেখি সরকারের আর্থিক সাহায্যগুলো তৃণমূল পর্যন্ত সঠিকভাবে না পৌঁছায়, যখন দেখি সাবরিনা আর সাহেদের মতো মহত্বের দুয়ার খুলে মানুষের জীবন নিয়ে খেলাধুলা করে, ভুয়া করোনা রেজাল্ট দিয়ে টাকার পাহাড় গড়ে তখন ভাবতে গেলে সত্যি আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসে।
এইসব নচ্ছারদের কালো তালিকা কবে মুছা যাবে? এই ক্ষত বুকে ধারণ করে আরো কত পথ চলতে হবে আমাদের? সেই ব্রিটিশদের হাতে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করায় আমরা পিছিয়েছি দুইশ বছর। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে পা দিয়ে আমরা তবু বুকভরা আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ত্যাগী মনোভাব এবং উন্œয়নমূলক পরিকল্পনা নিয়ে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে তিনি যে অবিরাম কাজ করে চলেছেন তাঁর সেই গৌরবোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে আমরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছি।
আত্মার প্রকৃত উপলব্ধি ছাড়া কখনো ভালো কিছু পাবার আশা করা ব্যর্থতার নামান্তর মাত্র। তাই তো বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে আমরা চিরকাল এক হয়ে গেয়ে যাব আমাদের বিজয়ের গান। যে বিজয়ের জন্য শহীদ হয়েছেন ত্রিশ লাখ প্রাণ এবং সম্ভ্রম হারিয়েছেন দুই লাখের অধিক নারী। বিশ্বের ইতিহাসে এত মানুষের প্রাণ বিসর্জনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন খুব বিরল। আমাদের এত কষ্টে অর্জিত এ দেশকে ভালোবাসার আলোয় ভরে তুলব। সোনার ফসলে ভরে উঠবে আমাদের আঙিনা। সেই রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘উল্টো ঘুড়ি’ কবিতাটির দুটি চরণ স্মরণ করে শেষ করতে চাই –
“এতো সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন!
বুঝি না আমার রক্তে কি আছে নেশা-”

এ সহজ ভালোবাসার কোমল ছোঁয়ায় ভরে উঠুক বাংলার মাঠ-প্রকৃতি আর মানুষের মন। আমাদের সেই মলিন মুখের হাসির ওপর ঠিকরে পড়–ক উজ্জ্বল আলো- ভরে উঠুক আমাদের শরীর ও মন।
এ শুভ ক্ষণে পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আজিজুর রহমান শিশির এবং বার্তা সম্পাদক সাজিদ তৌহিদসহ দৈনিক ‘গৌড় বাংলা’ পত্রিকার অন্য সদস্যদের প্রতি রইল আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। প্রাণের ছোঁয়ার প্রতিক্ষণ ভরে থাক প্রাণ।

মাহবুব জন : কবি ও লেখক এবং সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি), হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ