সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের

43

মাহবুব জন

আমাদের জীবনে স্বাধীনতা শব্দটি তার স্বকীয় মর্যাদায় ভাস্বর। স্বাধীনতার সুখ-দুঃখ অন্যরকম। আমরা বাঙালি জাতি। আমাদের নিজস্ব পরিচয় আছে, নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, আমাদের একটা জীবনধারা আছে। বহু যুগের সাধনার ধন আমাদের কৃষ্টি-কালচার। আমরা ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে যে ভাষা অর্জন করি তা শাশ্বত-চিরায়ত। আমাদের সবুজ মাঠ আছে, কৃষকের গান আছে। বিশাল চারণ ভূমি আছে। রাখালের গান আছে। নদ-নদীর এ দেশ। এক সময় নদীর ¯্রােতে বয়ে চলত নৌকা। মাঝির সুরে সুরে ভরে উঠত নদীর একুল-ওকুল। আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সাথে গড়ে উঠেছিল সখ্যতা। নকশিকাঁথা আর মসলিনের কাপড় আমাদের নন্দিত এক শিল্প ছিল। বাঙালির সুখ-দুঃখ, আনন্দের একটা নিজস্ব জায়গা ছিল। আজও আছে। তবে কতক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এ ধারা। সবকিছুই চিরদিন এক রকম চলে না। সময়ের পরম্পরায় এর পরিবর্তন হয়।
সবকিছু ঠিক থাকার পর দেশ ভাগ হলে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি দেশের সৃষ্টি হয়। আমরা রইলাম পূর্ব ভাগে, আরেকটি অংশ পশ্চিম ভাগে। মাঝখানে বিরাট এক ছেদ। ভারত দেশ। পাকিস্তানের দুটি ভাগের মধ্যে পশ্চিম অংশের ভাগ যেহেতু বড়, তাই তদানীন্তন ক্ষুদ্র এ জনগোষ্ঠীর পূর্ব ভাগের প্রতি কোনো গুরুত্ব ছিল না পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের। এ দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি সবকিছু পশ্চিমারা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। এ কথা আজ আমাদের সবার জানা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর প্রথম যে জায়গাটায় আমাদের আঘাত করল তা হচ্ছে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের মায়ের ভাষা। যে ভাষা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া যায় তা কোনো দিন হারাবার নয়।
বৈজ্ঞানিকভাবে বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, মায়ের ভাষা বাদ দিয়ে কোনো দিন অন্য কোনো ভাষা ভাবা যায় না। এমনকি আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছেন, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন।’ কথাটি হয়ত তিনি বলেছিলেন ইংরেজি শেখা নিয়ে বাড়াবাড়ির উদ্দেশ্যে। এ কথার দ্বারা এও বোঝা যায়, বাংলা ভাষা যেহেতু আমাদের শিকড়ে গাঁথা তাই এই ভাষা দিয়ে আমরা অনেক ভাষা শিক্ষা অর্জন করতে পারি; কিন্তু তার আগে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে।
আমাদের দেশে নানা গোষ্ঠী ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করে। যেমন সাঁওতাল, মগ, মুরং, চাকমা ইত্যাদি। এদেরও আবার নিজস্ব ভাষা আছে। যদিও তারা বাংলা ভাষায় বাঙালি হিসেবে সবার সাথে খোলামেলা কথা বলে তবু তাদের আপন এবং অতি কাছের ভাষা হিসেবে তারা নিজেরা তাদের আপন ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। আমাদের বাঙালি সমাজের বেশির ভাগ মানুষের জীবন কেটেছে মাঠে, ঘাটে, বাটে। কৃষক, রাখাল, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশাজীবী মানুষের জীবনের আদি-অন্ত কেটেছে এ ভাষায় কথা বলে। জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার মিলিত এক বন্ধনে কেটেছে বাঙালির জীবন। কত হাজার বছরের এ সাধনার ধন পাকিস্তানি সরকার হঠাৎ এক ঘোষণায় বলে দেয় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। যে ভূভাগের প্রায় শতভাগ মানুষ কথা বলে বাংলায়, তার ওপর এমন একটা জুলুম চাপিয়ে দেয়া পৃথিবীর কোনো জাতি তা মেনে নিতে পারে না। আমাদের দেশের সমস্ত আয় উপার্জনের অর্থ চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। এ ভাগের মানুষের অভাব-অনটনে অথবা শিক্ষা, কৃষি কিংবা শিল্প- কোনো খাতেই সেই অর্থ ব্যয় করা হতো না। মানুষ অর্থ সংকটে ভুগেছে, নিরাপত্তা সংকটে ভুগেছে, যোগাযোগ সংকটে ভুগেছে ইত্যাদি নানা সংকটে এই পূর্ব ভাগের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এ এলাকার মানুষের কোনো অধিকারের প্রতি কোনো কর্ণপাত ছিল না তাদের। মানুষ হয়ে পড়েছিল দিশেহারা।
১৯৫৪ সালে নির্বাচন হলো। জনগণ নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করল। কিন্তু শাসনভার দেয়া হয়নি আমাদের এ ভাগের জনপ্রতিনিধিদের। আমাদের এই পূর্ব ভাগের তখন একমাত্র নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে দিনের পর দিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে। জীবনের ভয় দূর করে তিনি নেমেছিলেন জনগনের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। তাঁর এ অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে রহিত করার জন্য ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি করা হয়। কোনো মিটিং-মিছিল যেন না হয়, জনগন যেন তাদের অধিকারের কথা বলতে না পারে সেই জন্য পাকবাহিনী যত কৌশল লাগে দমিয়ে রাখার জন্য, তার কোনোটাই বাদ দেয়নি।
মানুষ যখন বেঁচে থাকার জন্য তার মৌলিক অধিকারগুলো হারায় তখন সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। মানুষের জীবন-জীবিকা বসবাস সবকিছু জটিল আকার ধারণ করেছিল। মিথ্যার প্রলোভন দেখিয়ে সবকিছু হরণ করার এক জাল পেতে বসেছিল। বাংলার মানুষ তখন মুক্তি খুঁজছিল। শেখ মুজিবুর রহমান খুব ভালোই বুঝতেন মানুষের ভেতরের কথা। তিনি দেখলেন এ এলাকার মানুষের কষ্ট থেকে কোনো মুক্তি নেই যতক্ষণ পর্যন্ত না এ দেশ স্বাধীন হয়। যতদিন যাবে মানুষেরা ধীরে ধীরে আরো শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চনার শিকার হবে। মানুষেরা না খেয়ে মরবে। তাই ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর একটি জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পরিপূর্ণরূপ ফুটে উঠে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আর কিছু করার থাকে না। আমাদের কোনো দাবি তারা মেনে নেয়নি।
অবশেষে ১৯৭০ সালে নির্বাচন হলো। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাশ করল। কিন্তু সেই নির্বাচনও প- করে দিল পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান। গোপনে বৈঠক করে ষড়যন্ত্র আটল। শেখ মুজিবকে ক্ষমতায় বসানো হলো না। বাঙালি মরিয়া হয়ে উঠল। তাদের সামনে তখন স্বাধীনতার আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এ আমাদের মুক্তির ডাক, স্বাধীনতার ডাক সাথে সাথে বাঙালি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে লাগল। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি বাঙালি জাতির জীবনে গেঁথে গেল।
তারপর হঠাৎ ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাত। বলা নেই, কওয়া নেই এই রাতে হঠাৎ পাকবাহিনী আমাদের নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর চড়াও হয়। সেই রাতের আঁধারে হাজার হাজার নিরীহ জনগণকে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে সেই বর্বর পাকিস্তানিরা। আজও আমাদের শরীর শিউরে উঠে সেই রাতের বর্বরতার ইতিহাসে। এ গণহত্যাকে বিশ্ব গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। কারণ এ রকম নির্মম গণহত্যা পৃথিবীর আর কোথাও সংঘটিত হয়নি।
রাতের আঁধারে নিরস্ত্র বাঙালি নিধনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আদেশে স্বাধীনতার ঘোষণা এলো। সারা বাংলায় শুরু হলো একযোগে মরণপণ যুদ্ধ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হলো স্বাধীনতা। আমরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হলাম। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা পরিপূর্ণ স্বাধীন এক দেশ পেলাম। আমাদের জীবনে স্বস্তি নেমে এলো। কিন্তু আজও রয়ে গেছে আমাদের সেই হানাদার আর রাজাকারের বংশধর, যাদের বিরুদ্ধে এখনো আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু যাদের দয়া করে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন তারাই আবার মাথাচাড়া দিয়ে এ দেশকে ঘুনে ধরা দেশ বানিয়েছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই রাজাকার, আলবদরের বিচার চলছে। আশা করি, আমাদের অর্জিত স্বাধীনতার কলঙ্ক অনেকটাই মুছে যাবে। প্রতিনিয়ত সংগ্রামের হাত যেন আমাদের আলোকিত করে। এ সংগ্রাম আমাদের অস্তিত্বের, আমাদের সম্মানের। স্বাধীনতার উনপঞ্চাশ বছর পর আজও কোথায় যেন আমাদের একটা আদর্শের গ-গোল রয়েই গেল। নাবিকের সেই অ্যালবেট্রস পাখিটাকে হত্যার জন্য দিনের পর দিন বহু কষ্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের আর বাঁচা-মরা নয়। সেই মুক্তির স্বাধীনতায় আজও আমরা অবিচল সংগ্রাম চালিয়ে যাই।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের সাথে সাথেই আমরা স্বাধীনতার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমরা আমাদের ভূখ- পেয়েছি। মুক্তির আনন্দে আন্দোলিত হয়েছি। আমরা সেই মুক্তির লড়াই আজও লড়ে চলেছি।

লেখক : সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি), হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ