চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমনের ঘ্রাণ নিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না ৮ ধানকাটা শ্রমিকের

65

বারিকবাজারের ভাঙা সাঁকো এলাকায় ভুটভুটি উল্টে খাদে

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সোনামসজিদ স্থলবন্দরের অদূরেই বালিয়াদিঘী গ্রাম। ঐতিহ্যবাহী ‘বালিয়াদিঘী’র পাড়েই গড়ে উঠেছে গ্রামটি। গত ২০-২২ দিন আগে এ গ্রামেরই ১৫ জন শ্রমিক গিয়েছিলেন নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে ধান কাটতে। বৃহস্পতিবার আমনের ঘ্রাণের সঙ্গে ফুরফুরে মেজাজে শ্যালোমেশিনচালিত ভুটভুটি বোঝাই ধানের বস্তার উপরে চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। কিন্তু বাড়ি ফেরা হলো না ৮ ধানকাটা শ্রমিকের। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে বাড়ি থেকে কিলো দেড়েক আগেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তারা। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার ফজরের সময় জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের বারিকবাজার ভাঙা সাঁকো নামক এলাকায়। ‘ভাঙা সাঁকো’ এলাকায় ভেঙে গেল ৮ শ্রমিকের জীবন। এদের মধ্যে বাবা-ছেলেও রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪ জন। মর্মান্তিক এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ভয়াবহ এ দুর্ঘটনাটি বিগত কয়েক বছরের মধ্যে বড় দুর্ঘটনা। এর আগে কানসাট-সোনামসজিদ সড়কের ধোবড়া বাজারে একটি চায়ের দোকানে ট্রাক ঢুকে গেলে ১০ জন প্রাণ হারান।
নিহত শ্রমিকরা হলেন- বালিয়াদিঘী গ্রামের নওশাদের ছেলে আবুল কাশেদ (৪২), এরফানের ছেলে বাবু (২৬), তাজামুল (৪৮) ও তার ছেলে মিঠুন (২২), কাবিলের ছেলে কারিম (২৭), আমানুরের ছেলে মিনু, আজিজুল হকের ছেলে আহাদ আলী (২২) ও লাউঘাটা গ্রামের রেহমানের ছেলে আতাউর রহমান (২২)। এদের মধ্যে তাজামুলের বাড়ি ভোলাহাট উপজেলায় হলেও তিনি বালিয়াদিঘী গ্রামেই বসবাস করতেন বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে একজন হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান।
এ ঘটনায় গুরুতর আহতরা হলেন- হযরত আলীর ছেলে মো. আ. লতিফ (৬০), মৃত আজিজুলের ছেলে মো. আকাশ (২৩), মৃত রবিউলের ছেলে মো. হামদুল (৬০) ও নুরু ইসলাম (৫০)। সবারই বাড়ি বালিয়াদিঘী গ্রামে। উন্নত চিকিৎসার জন্য এদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ সুপার এএইচএম আবদুর রকিব, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এ.কে.এম তাজকির-উজ-জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান, শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাকিব-আল-রাব্বিসহ অন্যরা।
বারিকবাজার এলাকার স্থানীয় সেতাউর রহমান জানান, ফজরের আজানের সময় ভাঙা সাঁকো এলাকায় ধানবোঝাই ভুটভুটিটি রাস্তা খারাপের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে খাদে পড়ে যায়। এতে ভুটভুটিতে থাকা শ্রমিকরা চাপা পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই ৭ জন প্রাণ হারান। খবর পেয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা নিহতদের উদ্ধার করে এবং আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
শিবগঞ্জ থানার ওসি ফরিদ হোসেন ও শিবগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন অফিসার সিরাজ উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বরেন্দ্র এলাকায় ধানকাটা শেষে একটি ভুটভুটিতে করে মজুরি হিসেবে পাওয়া ধান নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন ১৫ জন শ্রমিক। পথে শিবগঞ্জ উপজেলার বারিকবাজার আঞ্চলিক সড়কের ভাঙা সাঁকো এলাকায় এলে ভুটভুটিটি উল্টে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ৭ জন এবং হাসপাতালে নেয়ার পথে ১ জন মারা যান। আহতদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তারা জানান, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিহত ও আহতদেরকে উদ্ধার করেন। নিহতদের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাকিব-আল-রাব্বি জানান, খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক মৃতের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। টাকা তুলে দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এ.কে.এম তাজকির-উজ-জামান মহোদয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটায় নিহত ৭ জনের জানাজার নামাজ বালিয়াদিঘী গণকবর বধ্যভূমিতে অনুষ্ঠিত হয়।
৯৯৯ ফোন করায় উদ্ধার কাজ দ্রুত শুরু
স্থানীয়রা জানান, ৯৯৯ নম্বরে ফোন করার জন্য ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে। ০১৭০৫২৫০৯২২ নম্বর থেকে ফোনকারী ইয়াসিন আলী জানান, তিনি ঘটনাটি ঘটনার খবর পাওয়া সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ফোন না দিয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেন।
উপার্জনক্ষম দুজনকে হারিয়ে এক পরিবারে শোকের মাতম
দুর্ঘটনায় নিহত ৮ শ্রমিকের মধ্যে বাবা ও ছেলে রয়েছেন। এরা হলেন- তাজামুল ও তার ছেলে মিঠুন। নিহত দুজনই ছিলেন পরিবারের অবলম্বন। অবলম্বন হারিয়ে পরিবারটি এখন অন্ধকার দেখছে। বাবা-ছেলের মৃত্যুতে পরিবারটি চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
সরেজমিন বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে শোকের মাতম। দুই বছর আগে বিয়ে করে এই পরিবারে আসেন আশা। এই দুজনের মৃত্যতে একই পরিবারে শাশুড়ি ও পুত্রবধূ বিধবা হলেন, যে কষ্ট গ্রামবাসীদের মধ্যেও ছুঁয়ে গেছে।
মাত্র ২ বছরের মাথায় স্বামী ও শ্বশুরকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি। মাঝে মধ্যেই চিৎকার করে কেঁদে উঠছেন। আবার শোকে পাথর হয়ে নিশ্চুপ থাকছেন। আর শাশুড়িও বিলাপ করছেন। মাছে মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন তিনি।
দুই সদস্যকে হারিয়ে পরিবারের উপার্জনও বন্ধ হয়ে গেল। মিঠুনের ২ সন্তানের একজন ৮ মাস এবং আরেকজজন ৩ বছর বয়সী।