জেলহত্যা দিবস : জাতীয় রাজনীতিতে চার নেতার ভূমিকা

34

মোস্তাক হোসেন

বাংলাদেশ সৃষ্টিতে যাঁদের ঐকান্তিক পরিশ্রম রয়েছে, যাঁদের নেতৃত্বে নয় মাসের যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল, যুদ্ধকালীন স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যাঁদের সুযোগ্য নেতৃত্ব দ্বারা বাঙালিকে শোষকগোষ্ঠী পাকিস্তানিদের কবল থেকে স্বাধীনতা অর্জন করাতে সক্ষম হয়েছিল তাঁরা বাংলার বরণীয় ও স্মরণীয় নেতা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম জাতীয় চার নেতা।
বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের কর্ণধার ও জাতীয় এই চার নেতা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মুনসুর রহমান। আজকের এইদিনে কুচক্রী মহল তাঁদের জেলের ভিতরে হত্যার মাধ্যমে ইতিহাসে এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা সৃষ্টি করেছে। তাই ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে সংঘটিত নৃশংস ও বেদনাদায়ক হত্যাকা-কে ‘জেলহত্যা দিবস’ হিসেবে বাংলাদেশিরা তথা বাঙালি জাতি তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে থাকে। হত্যাকারীদের কাপুরুষোচিত কর্মকা- বাংলাদেশিদের মনে বেদনার্ত স্মৃতি অঙ্কিত করেছে।
ঐতিহাসিক ১৯৭০ সালের নির্বাচনের জয় বাঙালিদের শোষণের কবল থেকে মুক্তি পাবার এক মাইলফলক ঘটনা হবার পারেও, শাসকগোষ্ঠীরা বাঙালিদের এই বিজয় মেনে নিতে পারেনি। নির্বাচনে বিজয় পেলেও বাঙালি প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অজুহাতের আশ্রয় নেয়। বাঙালির প্রতিনিধিরা বুঝতে পারে যে শাসকগোষ্ঠী সহজে ক্ষমতা ছেড়ে দিবে না। এই অবস্থায় বাঙালির রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ মনঃস্থির করে ফেলেছে আন্দোলন ছাড়া এইদেশের মানুষের অধিকার আদায় করা সম্ভব না। ৭ই মার্চের ভাষণে তেমন অনুমানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি দ্ব্যার্থ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

সেইরূপ চিন্তা-ভাবনায় রয়েছিল বাঙালির অন্যান্য নেতা-কর্মীদের মাঝে। পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ২৫ মার্চ গভীর রাতে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির উপর অতর্কিত হামলা চালায়। যেন বাঙালির মুক্তির দিশারী ১৯৭০ সালের নির্বাচনের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ক্ষমতা চায়তে না পারে। যা অনুমান করেছিল ঠিক তেমনটিই ঘটাতে লাগলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ২৫ মার্চ দ্বিপ্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। এমন পরিস্থিতিতে নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে গিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং নয় মাস যুদ্ধ করে বাংলার স্বাধীনতা অর্জন করে। এই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সাংগঠনিক দক্ষতার সহিত সম্পূর্ণ করেছিলেন এই জাতীয় চার নেতাসহ অন্য নেতাকর্মীরা।

কূটনৈতিক তৎপরতার উদ্দেশ্যে বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি আদায় ও সহযোগিতা এবং যুদ্ধ পরিচালনার দিকনির্দেশনা প্রদানের লক্ষ্যে একটি সরকার আবশ্যক হয়ে পড়ে। সেই আবশ্যকতা থেকে সত্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সরকার গঠন করা হয়। যাকে অস্থায়ী সরকার বা প্রবাসী সরকার বলা হয়। এই সরকার গঠন করা হয় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। রাষ্ট্রপতির অনুস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, কৃষি, ত্রাণ ও পূনর্বাসন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
অস্থায়ী সরকার বা প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ বেতারে ১১ এপ্রিল ভাষণে মন্ত্রী পরিষদের ঘোষণা দেন। সেই মন্ত্রী পরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে অনুষ্ঠিত হয়। এই শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে বিদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ বিশ্ববাসীর কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম, বিশ্বের আর কোন জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোন জাতি আমাদের চাইতে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি। অধিকতর ত্যাগ স্বীকার করেনি। জয় বাংলা’ (তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া)। তাঁদের দক্ষ নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় এবং এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার জন্য ভারতের সাথে সাংগঠনিক সম্পর্ক রক্ষা সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যার ফলস্বরূপ নয় মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

এতো অল্প সময়ের ব্যবধানে পরাধীনতার কবল থেকে এবং একটি ভাষাগত ভূখন্ড মুক্ত হবার ইতিহাস বিরল। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে চুড়ান্ত বিজয় অর্জন করলে প্রবাসী সরকার কলকাতা হতে ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করে নবসৃষ্ট রাষ্ট্র বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার হতে মুক্তি পেয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে প্রত্যাবর্তন করলে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে তাজউদ্দীন আহমেদ সরে দাঁড়ান এবং পরবর্তীতে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা মুজিবনগর সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে অর্পন করা হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত রাষ্ট্র বাংলাদেশকে বিনির্মাণ ও পরিচালনা বঙ্গবন্ধুৃর নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে। স্বার্থান্বেষী মহল ও কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার সমন্বয়ে ১৫ আগস্ট এক সেনা অভ্যূত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের ১৭ জনকে হত্যা করে। এই হত্যাযজ্ঞের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে এবং তার অন্তরালে কিছু সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে নতুন সরকার পরিচালিত হতে থাকে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও খন্দকার মোশতাকের রাষ্ট্রপতি ঘোষণার পর থেকে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের গৃহবন্দী ও পরবর্তীতে গ্রেফতার করা হয় এবং অনেক নেতা আত্মগোপন করেন। জাতীয় চার নেতাকে ১৫ আগস্টের পর গৃহবন্দী করা হয় এবং ২৩ আগস্ট গ্রেফতার করে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঠায়। ১৫ আগস্টের পর গঠিত সরকার পুরোপুরি সামরিক সরকার নয় আবার প্রজাতান্ত্রিকও নয়, তা ছিল আধাসামরিক সরকার। খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হিসেবে থাকলেও কর্নেল ফারুক, মেজর রশিদসহ কয়েকজন বঙ্গভবনে থেকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতো। এতে সেনাবাহিনীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং সেনাকর্মকর্তাদের মাঝে প্রবল ক্ষমতার লোভ দৃশ্যত হয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আড়াই মাসের ব্যবধানে আরেকটি ব্যর্থ সেনা অভ্যূত্থান হলে কর্নেল ফারুক কয়েকজন জুনিয়র সেনা কর্মকর্তার মনে চিন্তার উদয় ঘটলো যে, এই অভ্যূত্থান সফল হলে পুনরায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসবে।

আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে এই বিচক্ষণ সিনিয়র চার নেতা ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। তাই মেজর রশিদ ও রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্যাপ্টেন মোসলেমকে পাঠিয়ে তাদের নির্দেশানুসারে চার নেতাকে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ জেলখানায় নির্মম ও পাশবিকভাবে হত্যা করে (সেই রাতে জেলখানায় কী ঘটেছিল-প্রথম আলো-৩ নভেম্বর ২০১৭)। এই হত্যাকা-ের জন্য ৩ নভেম্বর তারিখকে ‘জেলহত্যা দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আজকের এইদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান সংগঠকদের হারিয়েছি। তাঁদের অবদান এইদেশের জনগণ কখন ভুলেনি বা ভুলবে না। তাঁদের আত্মা পরোপারে শান্তিতে থাক এই কামনা করি।
মোহা. মোস্তক হোসেন : লেখক ও শিক্ষক, আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।