করোনার ধাক্কা সামলে উঠছে পোশাক খাত

24

করোনাভাইরাস একেবারে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পকে। একদিকে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, অন্যদিকে পূর্বের দেওয়া রফতানি আদেশ বাতিল হয়ে যায়। এভাবে মহামারি করোনায় দেশের গার্মেন্টস শিল্প মালিকরা পড়ে যান মহাবিপাকে। তবে করোনার প্রভাব এখনও থাকলেও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে রফতানি খাত। বিশেষ করে করোনার ধাক্কা সামলে উঠছে তৈরি পোশাক শিল্প। বিদেশি ক্রেতারা আবার ফিরছে বাংলাদেশের বাজারে। ফিরে আসছে বাতিল হওয়া রফতানি আদেশ। ফলে ধীরে ধীরে বাড়ছে রফতানি আয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কিছু তথ্যের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে পরিস্থিতি কীভাবে পাল্টাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগীর সন্ধান মেলে ৮ মার্চ। আর ২৫ মার্চ থেকে টানা ৬৬ দিন দেশে লকডাউন শুরু হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায় এপ্রিল মাস থেকেই। করোনার কারণে এপ্রিলে পোশাক রফতানি কমে আয় হয় মাত্র ৩৭ কোটি ডলারের। যা গত বছরের এপ্রিলের চেয়ে ৮৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ কম।
বিধিনিষেধ শিথিল করে মে মাসে স্বল্প পরিসরে কল-কারখানা চালু করা হয়। ওই মাসে পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি কমেছিল ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে প্রবৃদ্ধি কমেছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
ইপিবি সম্প্রতি রফতানি আয়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে ৩৯১ কোটি (৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত বছরের জুলাই মাসের চেয়ে দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। জুলাই মাসে রফতানি আয়ের লক্ষ্য ছিল ৩৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, জুলাই মাসে পোশাক রফতানি থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি আয় দেশে আসে। তবে গত বছরের জুলাই মাসের চেয়ে আয় কম হয় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম হয়। জুলাইয়ে ৩২৪ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি হয়। গত বছরের জুলাইয়ে হয়েছিল ৩৩১ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৮৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। তা ছাড়া চলতি আগস্ট মাসের ১৫ দিনেই ১৫০ কোটি ৭০ লাখ (১.৫০ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত বছরের আগস্ট মাসের একই সময়ের চেয়ে ২৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি।
সুতরাং এপ্রিল ও মে মাসে যেখানে পোশাক রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি কমে ৮৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং ৬১ দশমিক ৫৭ সেখানে জুলাই মাসে প্রবৃদ্ধি কম হয় মাত্র ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। শুধু তাই নয়, এ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি হয় ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে বেশ খানিকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প।
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে পোশাক খাত থেকে ৩ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫০ লাখ (৩৩.৭৮ বিলিয়ন) ডলার আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই খাত থেকে ২৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, দেশে পোশাক শিল্পের পথ চলা শুরু হওয়ার পর থেকে রানা প্লাজা ধস, তাজরীন অগ্নিকাÐ এবং স্পেকট্রাম কারখানা ধসের মতো অনেক সঙ্কটেই পড়তে হয়েছে। কিন্তু এবার করোনার কারণে যে ভয়াবহ সঙ্কটে পড়ে পোশাক শিল্প তা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। যখন চারদিক থেকে রফতানি আদেশ বাতিল হচ্ছিল এবং নতুন আদেশ আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন এ খাতের আমরা যারা উদ্যোক্তা তারা তো মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম এই সঙ্কটেই হয়তো পোশাক শিল্প একেবারে বসে যাবে। তবে আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে সে অবস্থায় পড়তে হয়নি। মাস তিনেক পরেই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে এ শিল্প। যেভাবে বিদেশি ক্রেতারা নতুন অর্ডার নিয়ে আসছে এবং বাতিল হওয়া অর্ডার পুনরায় দিচ্ছে তাতে আমরা চরম আশাবাদী হয়ে উঠছি। করোনা পরিস্থিতি যদি আরও জটিল না হয় তাহলে আমাদের প্রত্যাশা এ শিল্পের সঙ্কটে সহসায় কেটে যাবে।
বাতিল ও স্থগিতাদেশ হওয়া পোশাকের ক্রয়াদেশের পণ্য নিতে শুরু করেছেন বিদেশি ক্রেতারা। আবার নতুন করে আসছে ক্রয়াদেশও। এরই মধ্যে অনেক কারখানাতেই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ করার মতো পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ চলে এসেছে। বর্তমানে যে পরিমাণ ক্রয়াদেশ আসছে, সেটিকে অবশ্য মন্দের ভালো বলছেন পোশাক শিল্পের মালিকেরা। কারখানার মালিকরা জানান, গতবারের তুলনায় বর্তমানে ৭০-৮০ শতাংশ ক্রয়াদেশ আসছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সাহস জোগাচ্ছে। অনেকগুলো বড় ব্র্যান্ড স্থগিত ও বাতিল করা ক্রয়াদেশের পণ্য আবার নিতে শুরু করায় পোশাক রফতানি গত জুন-জুলাইয়ে বেশ খানিকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে গত মার্চে সেখানকার বড় ক্রেতারা একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করতে থাকেন। এদিকে দেশেও ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে ২৫ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর মাসখানেক পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। তাতে এপ্রিলে মাত্র ৩৭ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রফতানি হয়, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরের মাসে রফতানি হয় ১২৩ কোটি ডলারের পোশাক। জুনে সেটি বেড়ে ২২৫ কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। জুলাইয়ে ৩২৪ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি হয়। তারপরও বিদায়ি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ হাজার ৭৯৫ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়, যা তার আগের বছরের চেয়ে ৬১৮ কোটি ডলার কম।
বিজিএমইএ’র তথ্যানুযায়ী, করোনায় ৩১৮ কোটি ডলারের পোশাক রফতানির ক্রয়াদেশ প্রাথমিকভাবে বাতিল ও স্থগিত হয়েছিল। তার মধ্যে প্রাইমার্ক ৩৩ কোটি, ইন্ডিটেক্স ৮ কোটি ৭০, বেস্টসেলার ৮ কোটি ৩০ লাখ, মাদারকেয়ার ৫ কোটি ৬০ লাখ, কোহলস ৫ কোটি ৪০ লাখ, গ্যাপ ৩ কোটি ৮০ লাখ, জেসি পেনি সাড়ে ৩ কোটি, ওয়ালমার্ট ১ কোটি ৯০ লাখ, ডেবেনহাম ১ কোটি ৮০ লাখ ও রালফ লরেন ১ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ২৪৭ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এটি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৯.৭৩ শতাংশ কম। অথচ ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ২০২০ সাল শুরু হয়েছিল। পরের মাসেও প্রবৃদ্ধি হয় ১১ শতাংশ। মার্চ ও এপ্রিলেও রফতানি নেতিবাচক হয়নি। তবে মে মাসে গিয়ে রফতানি ১২ শতাংশ কমে যায়। এদিকে করোনার কারণে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২ হাজার ৭৮৮ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০.৩৭ শতাংশ কম। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ৮ হাজার ৩৮১ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে।
এদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডবিøউটিও) ‘ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২০’ অনুযায়ী, পোশাক রফতানিতে একক দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। পরিমাণের বিচারে অনেক পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানটি এতদিন ছিল বাংলাদেশের। দেশের মোট রফতানির ৮৫ শতাংশের মতো আসে তৈরি পোশাক শিল্প খাত থেকে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। আর ভিয়েতনাম ৩ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে বলে তথ্য দিয়েছে দেশটির পরিসংখ্যান দফতর।
চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে চীনের পোশাক রফতানি কমেছে ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশের কমেছে ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে যে ভিয়েতনাম দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে, তাদেরও এই ছয় মাসে পোশাক রফতানি কমেছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।
পোশক শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত তিন-চারটি মাস আমরা যে শঙ্কার মধ্য দিয়ে সময় পার করেছি, সে অবস্থা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ মিলছে এখন। শিল্প মালিকদের ধৈর্য্য এবং সাহসিকতা ও সরকারের তরফ থেকে প্রণোদনাসহ নানা উদ্যোগে এ শিল্প প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। এসব উদ্যোগের কারণেই জুলাই মাসে ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করা সম্ভব হয়েছে। এই রফতানি গত বছরের জুলাই মাসের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ কম হলেও আগের তিন মাসের (এপ্রিল, মে ও জুন) চেয়ে বেশ ভালো ছিল। খুব বেশি হলে এক বছরের মধ্যেই আমরা আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারব। আমাদের সবচেয়ে বেশি আশার আলো দেখাচ্ছেন বিদেশি ক্রেতারা। তারা যে হারে বাংলাদেশের বাজারের দিকে ফিরে আসছে তাতে আমরা নতুনভাবে উজ্জীবিত হচ্ছি। এখন দরকার দেশের মধ্যে সার্বিক পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক থাকে। তাহলেই আমরা সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে করোনার ক্ষত কাটিয়ে উঠব।