চামড়া ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে এখন অন্যের আড়তের শ্রমিক

33

এ কে এস রোকন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের চামড়া ব্যবসায়ীরা কয়েক বছর ধরে চামড়ার দাম না পেয়ে এবং বিভিন্ন ট্যানারিগুলোতে পুঁজি আটকে যাওয়ায় অনেকে এখন নিঃস্ব। বেশ কয়েক বছর লোকসানের কারণে অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। আবার কয়েকজন পুঁজি উদ্ধারে অন্যের চামড়ার আড়তে এখন শ্রমিকের কাজ করছেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, জেলার সবচেয়ে চামড়ার বড় মোকাম শিবগঞ্জ উপজেলার সত্রাজিতপুর। এখানকার অন্তত ৫০ জন চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলেও বর্তমানে এ পেশায় রয়েছেন মাত্র ৪ জন। বাকিদের সবাই পুঁজি হারিয়ে কেউ অন্য ব্যবসা বেছে নিয়েছেন, আবার কেউ অন্যের আড়তের শ্রমিক হয়ে হারানো টাকা উদ্ধারের স্বপ্ন দেখছেন।
এমনই এক ব্যক্তি ৪০ বছরের পুরোনো চামড়া ব্যবসায়ী নিবারন রবিদাস। তার ব্যবসায়ীক জীবনে তিনি এক মৌসুমেই ১৩ লাখ টাকার চামড়া কেনাবেচা করেছেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ লস খেয়েছেন ৯০ হাজার টাকা। ভালোই চলছিল তার ব্যবসা। কিন্তু এরপর থেকেই তার পুঁজি ঢাকা ও নাটোরের ট্যানারি ও মোকামগুলোতে আটকে যেতে লাগল। এখনো ৬ লাখ টাকা আটকে আছে। তিন বছরে ১০ লাখ টাকা লোকসানের কারনে তিনি এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। সংসার চালাতে এবং হারানো পুঁজি উদ্ধার করতে কাজ করছেন তার এক ব্যবসায়ীক বন্ধুর চামড়ার আড়তে, একজন শ্রমিক হিসেবে। অনেকে আবার পুঁজি হারিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
নিবারন রবিদাস বলেন, অনিল রবি দাশ, তৌফিকুল ইসলামসহ আরো ৬ জন ব্যবসায়ী তার মতো লেবারের কাজে জড়িত। তারাও তার মতো স্বপ্ন দেখছেন শ্রমিকের কাজের পাশাপাশি আটকেপড়া টাকা উদ্ধারের।
চামড়া ক্রেতা আব্দুর রাজিব রাজু জানান, তিনি ও তার বন্ধু গতবছর লোকসানের কারণে এবং এ বছর করোনা পরিস্থিতিতে চামড়া কিনতে অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের চাপে পরে মূল্য পরিশোধসাপেক্ষে কিছু চামড়া কিনেছেন। করোনার এ পরিস্থিতিতে পরিবহন ব্যবস্থা সমস্যা হওয়ায় তাদের বেশ কিছু চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। এরপরও বাকি চামড়া নাটোরে পাঠানোর পর এর মূল্য পাওয়া নিয়ে রয়েছেন সংশয়ে।
রেকর্ড পরিমাণ চামড়া ক্রেতা জেম চামড়া আড়তের মালিক জেম বিশ্বাস ক্ষোভের সাথে জানান, অধিকাংশ ব্যবসায়ী চামড়া না কেনায় তিনি এ বছর গরু সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা দরে ২ হাজার ৬০০ পিস এবং খাসি ৩৫ টাকা দরে ১২ হাজার পিস কিনেও সংশয়ে আছেন। তিনি আরো জানান, দিন দিন চামড়া রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মোকামগুলোতে টাকা বাকি পড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের বেঁধে দেয়া রেটে ট্যানারিগুলো চামড়া না কেনায় জেলার সকল চামড়া ব্যবসায়ী বিপাকে পড়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রবিউল ইসলাম রবি জানান, তাদের গ্রামীণ জামায়াতের চামড়াগুলোর মধ্যে গরুর চামড়া ২৫০ টাকা ও খাসির চামড়া ২০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে নাচোলের বাসিন্দা তৌহিদ জানান, তাদের কোরবানির খাসির চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ১০ টাকায়। শিবগঞ্জের যুক্ত রাধাকান্তপুর গ্রামের মজিবুর রহমান জানান, তাদের জামায়াতের গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন ৫০০ টাকা, খাসির চামড়া ৫০ টাকা ও ভেড়ার চামড়া ৯০ টাকা দরে। তবে তারা বাকিতে বিক্রি করেছেন। শেষ পর্যন্ত কত টাকা করে পাবেন তা এখনই বলা যাবে না বলে তিনি জানান।
এদিকে জেলার সদর, শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুরে অনেক ব্যক্তি ও মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়ার মূল্য এবং কোনো ক্রেতা না পেয়ে কেউ মাটিতে পুঁতে ফেলেছে আবার অনেকে নদীতে ফেলে দিয়েছে। রবিবার বিকেলে কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ীকে গরু-ছাগলের চামড়া পুনর্ভবা নদীতে ফেলে দিতে দেখা গেছে। আড়তগুলোতে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ক্ষোভে তারা নদীতে ফেলে দেন।
গোমস্তাপুরের বোয়ালিয়া গ্রামের সামিউল জানান, তার বাড়ির গরুসহ ৩টি পশুর চামড়া ঈদের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়িতে রেখেও কোনো ক্রেতা না পেয়ে নদীতে ফেলে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে রহনপুর শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি ফারুক হোসেন জানান, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে চামড়া কিনেছেন। কিন্তু ক্রয়কৃত চামড়া আড়তে বিক্রি করতে না পেরে সেই চামড়া নদীতে ফেলে দিতে হয়েছে।
অন্যদিকে শিবগঞ্জের কাপড় ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলী রিপন জানান, চামড়া বিক্রি করতে না পেরে সোমবার সকালে তার ও তার প্রতিবেশীর ৭টি চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন।
এ ব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মঞ্জুর হোসেন ক্ষোভের সাথে জানান, গত ৬ বছরে নাটোর ও ঢাকার ট্যানারিগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীদের চামড়া বিক্রি বাবদ পাওনা প্রায় ২ কোটি টাকা। প্রতিবছরই তাদের পাওনা টাকা কিস্তি আকারে দেয়ার আশ্বাস দিলেও টাকা না দেয়ায় জেলার সব মিলিয়ে ২ শতাধিক চামড়া ব্যবসায়ীর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। প্রায় দেড়শ ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। যারা ব্যবসাটি ধরে রেখেছে তারাও ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তাই জেলার চামড়া ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে তিনি সরকারকে চামড়ার উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করে সে মূল্যে চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ের নিশ্চয়তার পাশাপাশি বিদেশে কাঁচা চামড়া রপ্তানির মাধ্যমে চামড়ার মূল্য বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।