ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি এভারটন উইকস আর নেই

3

ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি স্যার এভারটন উইকস আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থতায় ভুগে বুধবার বারবাডোজে নিজ বাড়িতে মারা গেছেন সাবেক এই ব্যাটসম্যান। ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর জানায়। উইকসের বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। গত বছরের জুনে হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল তার। এরপর থেকেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। উইকস ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিখ্যাত ‘থ্রি ডব্লিউ’-এর শেষ জীবিত সদস্য। অন্য দুজন, স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেল ও স্যার ক্লাইড ওয়ালকট পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন আগেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় তুলে নিতে বড় ভূমিকা ছিল এই তিনজনের। এই ত্রয়ী মিলে গড়েছিলেন অসাধারণ ব্যাটিং লাইন আপ। শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটেই নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেই তারা হয়ে আছেন মহানায়ক। অনেকের মতে, তিনজনের মধ্যে ব্যাটিংয়ে এগিয়ে ছিলেন উইকস।

এই তিনজনের জন্ম ও এগিয়ে চলাও অদ্ভূতভাবে যেন এক সুতোয় গাঁথা। বারবাডোজে দেড় বছরের মধ্যে এই তিনজনের জন্ম দুই মাইল এলাকার মধ্যেই। কথিত আছে, তিনজনেরই জন্ম একই ধাত্রীর হাতে! ১৯৪৮ সালে তিন সপ্তাহের মধ্যে টেস্ট অভিষেক তিনজনের। উইকসের জন্ম ১৯২৫ সালে হতদরিদ্র এক পরিবারে। ত্রিনিদাদে হাড়ভাঙা খাটুনিতে যে সামান্য আয় করতেন তার বাবা, তা দিয়ে কোনোরকমে চলত সংসার। ইংলিশ ফুটবল ক্লাব এভারটনের ভক্ত ছিলেন বাবা, ছেলের নাম রেখেছিলেন প্রিয় ক্লাবের নামে। ফুটবলও দারুণ খেলতেন এভারটন উইকস, এতটাই ভালো যে বারবাডোজের হয়ে খেলেছেন। তবে ক্রিকেটের প্রেমেই মজেছিলেন বেশি। ১৪ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন উইকস। স্থানীয় ক্লাব থেকেও তাকে বের করে দেওয়া হয়, কারণ সেখানে শুধু শেতাঙ্গদের খেলার অনুমতি ছিল। তার পরও তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, নিজের প্রতিভার প্রমাণ রেখেছেন। বারবাডোজের কেনসিংটন ওভালে মাঠকর্মী হিসেবে বড় ক্রিকেটারদের কাছ থেকে দেখে শিখেছেন। পরে বারবোডোজের ডিফেন্স সার্ভিসে যোগ দেওয়ার সুবাদে খেলতে পেরেছেন ক্লাব ক্রিকেট। ১৯ বছর বয়সে উইকস সুযোগ পান প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পা রাখার, ২৩ ছুঁইছুঁই বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে। টেস্টে শুরুটা খুব ভালো ছিল না তার।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে প্রথম তিন টেস্টের পাঁচ ইনিংসে ফিফটি করতে না পারায় বাদ পড়ে যান। কিন্তু ভাগ্য তাকে আবার ফিরিয়ে আনে। আরেক কিংবদন্তি জর্জ হেডলির চোটে উইকস আরেকটি সুযোগ পেয়ে যান সিরিজের শেষ টেস্টে। জ্যামাইকায় সেই ম্যাচে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামার পর থেকেই তাকে ক্রমাগত দুয়ো দিয়ে গেছেন দর্শকেরা। তারা একাদশে দেখতে চেয়েছিলেন স্থানীয় ক্রিকেটার জন হল্টকে। কিন্তু সেই দুয়োকে তালিতে পরিণত করেন উইকস ১৪১ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরের ভারত সফরে টানা চার ইনিংসে করেন সেঞ্চুরি। টানা পাঁচ ইনিংসে সেঞ্চুরির সেই বিশ্বরেকর্ড টিকে আছে এখনও। টানা ছয়টিও করতে পারতেন। ষষ্ঠ ইনিংসে ৯০ রানে আর আউট হয়ে যান। তিনি আজীবনই বলে গেছেন, আম্পায়ার ভুল সিদ্ধান্তে আউট দিয়েছিলেন তাকে। টেস্টে হাজার রান ছুঁতে উইকসের লেগেছিল মোটে ১২ ইনিংস। দ্রুততম ১ হাজার রানের সেই রেকর্ডও (যৌথভাবে হার্বাট সাটক্লিফের সঙ্গে) এখনও টিকে আছে বহাল তবিয়তে। ১৯৫১ সালে ইংল্যান্ড সফরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর পান উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি।

অসাধারণ সেই ধারাবাহিকতায় ভাটার টান আসে ১৯৫৭ সালে। একের পর এক চোট ক্রমাগত ভোগাতে থাকে তাকে, সেরা ছন্দ পেতে লড়তে থাকেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে ১৯৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন, দ্বিতীয় টেস্টে ৭৮। কিন্তু উরুর চোট এমন ভোগাচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই নিয়ে ফেলেন অবসর। মাত্র ৪৮ টেস্টেই করেছেন ১৫ সেঞ্চুরি ও ১৯ ফিফটি। ৫৮.৬১ গড়ে রান করেছেন ৪ হাজার ৪৫৫। এমন সমৃদ্ধ রেকর্ড যেমন চোখধাঁধানো, তেমনি হাহাকারও জাগিয়ে তোলে। আরও কয়েক বছর খেলতে পারলে হয়তো আরও সমৃদ্ধ হতো ক্যারিয়ার! তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দিলেও ক্রিকেট তখনই ছাড়েননি। ক্লাব ক্রিকেট খেলে গেছেন ইংল্যান্ডে। কমনওয়েলথ দলগুলির হয়ে সফর করেছেন অনেক দেশে। পরে কোচিংয়ে নাম লিখিয়েও দারুণ সফল হয়েছেন বারবাডোজে। ১৯৭৯ বিশ্বকাপে কানাডা দলের কোচও ছিলেন তিনিই। পাশাপাশি ব্রিজ খেলেও দারুণ নাম কামিয়েছিলেন।

নব্বইয়ের দশকে আইসিসির ম্যাচ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৫ সালে পান ‘নাইটহুড’, থ্রি ডব্লিউয়ের শেষজন হিসেবে। পৃথিবীও ছাড়লেন তিনি তিনজনের সবার পরে। ১৯৬৭ সালে ৪২ বছর বয়সে মারা যান ওরেল। ২০০৬ সালে ওয়ালকট মারা যান ৮০ বছর বয়সে। তিনজনের শেষ ঠিকানাও হতে পারে একই। ব্রিজটাউনের থ্রি ডব্লিউ সমাহিত আছেন ওরেল ও ওয়ালকট। সেখানে একটি জায়গা অনেক বছর ধরেই খালি রাখা আছে উইকসের জন্য। দুই সতীর্থের পাশেই হতে পারে তার শেষ ঠিকানা। এখনও অবশ্য উইকসের পরিবারের ইচ্ছে জানা যায়নি। উইকসের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এক ছেলে ডেভিড মারি ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলেন ১৯ টেস্ট। কিপার হিসেবে মারি ছিলেন দুর্দান্ত।