মহারাজপুরের পঁয়ষট্টি-ঊর্ধ্ব তহমিনা না বয়স্ক, না বিধবা ভাতা কোনো কার্ডই জুটেনি

17

মানুষের বয়স ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার কর্মশক্তি হ্রাস পেতে থাকে- এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আর বাংলাদেশের সমাজে দুস্থ ও স্বল্প উপার্জনক্ষম অথবা উপার্জনে অক্ষম বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সাল থেকে বয়স্ক ভাতা কার্যক্রম শুরু করে সরকার। দুস্থ ও অসহায় ৬৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং ৬২ বছর বয়সী মহিলারা এই ভাতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদন গৃহীত হলে মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা পাবেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তবে এই বয়স্ক ভাতা এখনো ভাগ্যে জোটেনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মহারাজপুর মুন্সিমন্ডলটোলা গ্রামের বিধবা তহমিনা বেগমের। বয়স ৬২ পেরিয়ে গেছে সেই তিন বছর আগে। কিন্তু এখনো পাননি বয়স্ক কিংবা বিধবা ভাতার কার্ড।
পঁচিশ বছর আগে কৃষক স্বামীকে হারিয়েছেন তহমিনা বেগম। সহায় সম্বল বলতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু। এরপর কৃষিকাজ করে কোনোরকমে দিনাতিপাত করা দুই ছেলের সংসারে ভাগাভাগি করে দিন পার করেন তিনি। বয়স ৬২ পেরিয়ে যাওয়ার পর পরই বয়স্ক ভাতা কার্ডের আশায় ঘুরেছেন মানুষের মানুষের দ্বারে দ্বারে। তিন বছরে প্রতি দশ দিন পর পর গিয়েছেন জনপ্রতিনিধিদের কাছেও। জমা দিয়েছেন ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি ও নিজের পাসপোর্ট সাইজের ছবিও। কিন্তু কার্ড যেন এখনো সোনার হরিণ! তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ধরা দেয়নি না বয়স্ক ভাতা, না বিধবা ভাতার কার্ড।
তহমিনার বেগমের সহজ সরল বক্তব্য, “বাবারে, ২৫ বছর আমার উনি (স্বামী) মারা গেছেন। গত তিন বছর থেকে একটা বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য ঘুরছি। কিন্তু কেউ বয়স্ক ভাতার কার্ডও করে দেয়নি। বিধবা ভাতারও কেউ কার্ড করে দেয়নি।” তিনি বলেন, “স্থানীয় এক মহিলা মেম্বারের কাছে ৩ বছর ধরে ঘুরছি। প্রতি ১০ দিন পর পর তার কাছে গিয়েছি একটা কার্ডের জন্য। শুধু বলে, করে দেব। এই বলেই তিন বছর পার করে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত কার্ড করে দেয়নি।”
তহমিনা বেগম বলেন, “বয়স্ক ভাতার কার্ডটা হলে খুব উপকার হতো। আমার দুই সন্তান কৃষিকাজ করে কোনোরকমে তাদের সংসার চালায়। তাদের সংসারেই আমাকে ভাগাবাগি করে থাকতে হয়। কার্ডটা হলে অন্তত নিজেই ওষুধটা কিনে খেতে পারতাম। মন চাইলে একটু ফলমূলও কিনে খেতে পারতাম।” আক্ষেপ নিয়ে বলেন, “জানি না আরো কত বয়স হলে বয়স্ক ভাতার কার্ড পাবো!”
তহমিনা বেগমের কার্ড করে দেয়ার জন্য দাবি তার পাড়া-প্রতিবেশীদেরও। কথা হয় তার ছেলের বউ নাজরিনের সঙ্গে। তিনি জানান, আমার শাশুড়ি একজন বয়স্ক মহিলা। শ্বশুর নাই। আমার স্বামী কৃষক, তাই সব সময় সবকিছু আমার শাশুড়িকে দেয়া সম্ভব হয় না ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও।
নাজরিন বলেন, প্রতি মাসে আমার শাশুড়ির জন্য প্রচুর ওষুধ কিনতে হয়। এছাড়া এ বয়সে ভালোমন্দ খেতেও চান তিনি। কিন্তু এসব আমরা পূরণ করতে পারি না। তিনি বলেন, সরকার তো বিধাবা, বয়স্কদের কার্ড করে দিচ্ছে ভাতা দেয়ার জন্য। আমার শাশুড়িকে একটা কার্ড করে দিলে তো ভালোই হতো। ওই ভাতা দিয়ে শাশুড়ি অন্তত ওষুধটা হলেও কিনে খেতে পারতেন।
প্রতিবেশী সহরী বেগম জানান, তারই সামনে কমপক্ষে ২০ বার আইডি কার্ডের ফটোকপি, ছবি দিয়েছে তহমিনা বেগম। তবুও তাকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্ড করে দেয়া হয়নি।
এ বিষয়ে ৫নং মহারাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ অধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তহমিনা বেগমের বয়স্ক ভাতার বিষয়ে কেউ অবহিত করলে কার্ড করে দিবেন।
তিনি তার এলাকার বিভিন্ন ভাতার কার্ড সম্পর্কে বলেন, “বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডের জন্য আগে আমরা নিজেরাই বাছাই করতাম। এরপর তালিকা পাঠাতাম। কিন্তু এবার সরকার বলেছে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে। সমাজসেবা অফিস কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যারা আছে তাদের মাধ্যমে আমাদের উপস্থিতিতে সরাসরি বাছাই করা হয়।”
এজাবুল হক বুলি বলেন, বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বয়স এবং গরিব এ দুটো বিষয়কে মূল্যায়ন করা হয়। অর্থাৎ যার বয়স বেশি হয়ে গেছে তাকে মূল্যায়নটা আগে করা হয়। তিনি বলেন, আমরা তো আগে ব্যাংকে থেকে টাকা তুলতে যাওয়ার জন্য তাদের অটো ভাড়াও করে দিয়েছি। এছাড়া ব্যাংকে টাকা তুলতে গেলে ভোটার আইডি কার্ড দেখাতে হয়। কিন্তু অনেকেই আইডি কার্ড হারিয়ে ফেলায় তাদেরকে আমরাই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সার্চ কপি বের করে দেই। “কিন্তু এই সার্চ কপি নির্বাচন অফিস থেকে তুলতে গেলে ২৩৬ টাকা খরচ হতো তাদের,” বলেন তিনি। তিনি আরো জানান, মহারাজপুর ইউনিয়নে ৫২৭ জন বিধাব ভাতা, ৪০৮ জন বয়স্ক ভাতা এবং ২৮৮ জন প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে।
‘বয়স্ক, বিধবা কিংবা প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করতে কোনো টাকা লাগে কিনা’ এমন প্রশ্নের জবাবে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, কোনো টাকাপয়সা লাগে না। কেউ যদি কার্ড পাইয়ে দেয়ার নামে টাকা নিয়েও থাকে, তবে সেটা বেআইনি। তিনি জানান, কার্ড করার ক্ষেত্রে দু’একজন ছুটে যেতেই পারে, তবে সেটা অনিচ্ছাকৃত। তারা যদি সরাসরি আমার সঙ্গে এসে যোগাযোগ করে নিশ্চয়ই তাদের কার্ড করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। যারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বা হচ্ছে তাদের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যেটুকু ব্যবস্থা নেয়ার, তাই নেয়া হবে।

আজিম আলী : ফেলো, রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ