শ্রদ্ধাঞ্জলি : নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

14

আজমাল হোসেন মামুন

আজ ২ জুন, দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নাট্যকার ও নাট্যাভিনেতা হিসেবে বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব তিনি।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ পশ্চিবঙ্গের মালদহ জেলার হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। দেশ বিভাগের পর তার পরিবার তদানীন্তন পূর্ববঙ্গে চলে আসে। তার পিতার নাম কলিমুদদীন আহমদ ও মাতার নাম সখিনা বেগম।
তিনি মালদহ আইহো জুনিয়র স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে ভোলাহাট রামেশ্বর পাইলট মডেল ইনস্টিটিউশন থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বি.এ (অনার্স) ও এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি সুদীর্ঘ ৩২ বছরের বেশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ইউরোপীয় নাট্যকলায় সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করে ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের খÐকালীন অধ্যাপক হিসেবেও শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ১৯৭৬-৭৮ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তিনি জাতিসংঘের বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলা নাটকের শিকড় সন্ধানী এ প্রখ্যাত নাট্যকার ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের বিষয় ও আঙ্গিক নিজ নাট্যে প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলা নাটকের আপন বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবে।
এক অঙ্কের নাটক লেখায় বিশেষ পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। তার লেখা নাটক ‘কী চাহ শঙ্খচিল’ এবং ‘রাজার অনুস্বারের পালা’ কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকাভুক্ত হয়েছিল। নাট্যচর্চায় অবদানের জন্য তিনি স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে একুশে পদক পান। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, শিশু একাডেমি পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। তার রচিত নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘নাট্যত্রয়ী’, ‘হৃদয়ঘটিত ব্যাপার স্যাপার’, ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘জমিদার দর্পণ’, ‘সাত ঘাটের কানাকড়ি’। নিয়মিত চিত্রনাট্য রচনা ছাড়াও তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘বাংলাদেশের নাটকের ইতিবৃত্ত’, ‘বাংলাদেশের থিয়েটারের ইতিবৃত্ত’, ‘নীলদর্পণ’ (সম্পাদনা), ‘সিরাজউদ্দৌলা’ (সম্পাদনা)।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মমতাজউদদীন আহমদ যেসব নাটক রচনা করেছেন তা নিঃসন্দেহে তাকে চির অমর করে রেখেছে। তার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চারটি নাটক হচ্ছে ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ (১৯৭১), ‘এবারের সংগ্রাম’ (১৯৭১), ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ (১৯৭১) এবং ‘বর্ণচোর’ (১৯৭২)। পরবর্তীকালে এসব নাটক নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তার ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ (১৯৭৬) নামক নাট্যগ্রন্থ। কিশোরদের জন্য মমতাজউদদীন আহমদ লিখেছেন ‘বকুলপুরের স্বাধীনতা’ (১৯৮৬) নামক একটি নাটক।
পাকিস্তানি শাসকের শাসন-শোষণের ফলে এ দেশের হতদরিদ্র জনগণের মধ্যে যে আবেগ ও ক্ষোভের তরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল তারই সফল নাট্যচিত্র ফুটে উঠেছে মমতাজউদদীনের ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ নাটকে।
বাংলার খোকা নামে একটি শিশুদের জন্য প্রবন্ধ লিখেছেন। চতুর্থ শ্রেণির ‘আমার বাঙলা’ বাংলা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে ‘সুখী মানুষ’ নাটিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ নাটকটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আজমাল হোসেন মামুন : কলাম লেখক ও সহকারী শিক্ষক, হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাপাইনবাবগঞ্জ